১০ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যমজ কারাতেকা হাসান-হোসেনের স্বর্ণজয়ের স্বপ্ন ...

যমজ কারাতেকা হাসান-হোসেনের স্বর্ণজয়ের স্বপ্ন ...

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ যমজ দুই ভাই। তখন তাদের বয়স ৮ কি ৯। বাসায় বড় বোনকে পড়াতে এসেছেন নতুন প্রাইভেট টিউটর। সে স্যারকে তার ভাইদের কথা বলেনি। দুই ভাই একটু পর পর পালাক্রমে এসে সালাম দিলেন স্যারকে। স্যার বিরক্ত হয়ে বললেন, একটু আগে না সালাম দিলে, আবার দিচ্ছ কেন? আমি তো একবারই দিলাম। আমার যমজ ভাই আগে সালাম দিয়েছিল। শুনে তো স্যার থ!

ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রাপুর নিবাসী যমজ ভাইদের গল্প এটি। একজনের নাম হাসান খান। অন্যজনের হোসেন খান। হাসানের ডাকনাম সান। হোসেনের মুন। তাদের বয়স ৩১। উভয়েই এখনও অবিবাহিত। কারণ? ক্যারিয়ারটা আরেকটি গুছিয়ে নিই, তারপর ... কথাগুলো মুনের। ঢাকার পল্টনের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ ইনডোর স্টেডিয়ামে সাউথ এশিয়া কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে স্বাগতিক বাংলাদেশ দল লাভ করে ৭ স্বর্ণ, ২৮ রৌপ্য ও ২৪ তাম্রপদক। প্রতিযোগিতার সমাপনী দিনে সিনিয়র পুরুষ দলগত কুমিতে ইভেন্টে স্বর্ণ পান হোসেন। আর সিনিয়র পুরুষ একক কাতায় স্বর্ণ পান হাসান। মুক্তিযোদ্ধা বাবার দুই সন্তানই নিজ নিজ ইভেন্টে ২০১০ এসএ গেমসে জিতেছিলেন স্বর্ণপদক। ২০১৯ এসএ গেমসেও জিততে চান স্বর্ণ।

হাসান-হোসেনের কারাতে ক্যারিয়ার শুরু একই সঙ্গে, ২০০৩ সালে। ২০০৫ সালে ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন। কারাতে খেলায় কেন ও কিভাবে এলেন? জনকণ্ঠকে হাসান জানান, বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনেছি। তখন মনে হতো আমিও যদি মুক্তিযুদ্ধ করতে পারতাম! কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়। তবে মনের মধ্যে সবসময়ই অনুভব করতাম আমি দেশের জন্য, দেশের পতাকার জন্য কিছু একটা করবো। পরে উপলব্ধি করলাম খেলাধুলার মাধ্যমেও তো দেশের সুনাম বৃদ্ধি করা যায়। এভাবেই কারাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।

হাসান ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসারের হয়ে খেলছেন। ২০১৬ সাল থেকে বিকেএসপিতে জুনিয়র কারাতে কোচ হিসেবে আছেন হোসেন। ২০১০ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় এসএ গেমসে দলগত কাতা ইভেন্টে স্বর্ণ, ২০১৪ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে একই ইভেন্টে রৌপ্য জেতেন হাসান। এসএ গেমসের সাফল্যই এখন পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্য। হোসেনও জিতেছেন ২০১০ এসএ গেমসে পদক। তবে হাসানের চেয়ে ১টি বেশি। স্বর্ণ জেতেন দলগত কাতায়, মাইনাস ৭৫ কেজি কুমিতে তাম্রপদক।

এ পর্যন্ত হাসানের আন্তর্জাতিক স্বর্ণসংখ্যা ৩০টি। এর মধ্যে এককেই স্বর্ণ ১৬টি। হোসেনের মোট আন্তর্জাতিক স্বর্ণসংখ্যা ২৭টি, এর মধ্যে এককই ১৮টি।

দুই ভাইয়ের বাবা আলী হোসেন খান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন (৩ নং সেক্টর, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার)। তিনি মারা যান ২০১০ এসএ গেমস শুরুর মাত্র সাত মাস আগে (২০০৯ সালের ২৫ মে)। সন্তানদের সাফল্যটা তিনি দেখে যেতে পারেননি, এই আক্ষেপ দুই ভাইয়ের রয়ে যাবে সারা জীবন!

কারাতেতে স্মরণীয় স্মৃতি? হাসানের স্মৃতিচারণ, ২০১০ এসএ গেমসে যখন স্বর্ণপদকের জন্য লড়াই করি, তখন আমার প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানের। তখন মনে হলো, আমার বাবা আমাদের জন্য যে স্বাধীন দেশের পতাকা এনে দিয়েছেন, এখন আমার জন্য যদি সেই পতাকার মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজবে। আর সেটা আমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কিছুতেই সহ্য করতে পারবো না এটা। তাহলে উপায়? উপায় একটিই-আমাদের জাতীয় সংগীত তাদের কানের কাছে বাজাতে হবে এবং সেজন্য আমাকে জিততেই হবে। আমি জিতেছিলাম! সেদিন মনে হয়েছিল আমি আমার দেশের পতাকা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পেরেছি।

হাসান প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেন ২০০৫ সালে, এশিয়া-ওশানিয়া প্যাসিফিক কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে। ওখানে দলগত তাম্রপদক জেতেন। আর প্রথম স্বর্ণজয় ২০০৯ সালে, ভারতে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে।

দুই ভাই-ই বর্তমানে এসএ গেমসের ক্যাম্পে আছেন। দুজনের লক্ষ্যই নেপালে স্বর্ণজয় করা। এ প্রসঙ্গে হাসানের ভাষ্য, স্বর্ণ ছাড়া আমি কখনই কিছু ভাবি না। ২০১৬ এসএ গেমসে কারাতে ইভেন্ট ছিল না। এ নিয়ে আক্ষেপ আছে। কেননা সেবার কারাতে থাকলে অবশ্যই দেশের জন্য স্বর্ণ জিততে পারতাম।

এবার ঢাকায় সদ্যসমাপ্ত সাউথ এশিয়া কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে সাফ অঞ্চলের যেসব কারাতেকা অংশ নিয়েছেন, আসন্ন এসএ গেমসে তারাই খেলবেন। ফলে তাদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পেয়েছেন হাসান। আশা করেন এসএ গেমসেও তাদের হারাতে পারবেন ঢাকার মতোই। এ ব্যাপারে তার আত্মবিশ্বাসের কোন কমতি নেই। তবে অনুযোগও আছে হাসানের, নেপালের কারাতেকারা ফ্রান্স ও মালয়েশিয়া গিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ নেয়, ভাল সুযোগ-সুবিধা পায়। আমরা সেটা পাই না। ওদের মতো ফ্যাসিলিটিজ পেলে আমাদের খেলার মান আরও উন্নত হতো।

এই যমজ ভাইদের চেহারা নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আছে। এ নিয়ে হোসেন বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ফুটবল খেলছি। বলে জোরে কিক মারলাম। সেটা গিয়ে পড়লো এক চা বিক্রেতার ফ্লাস্কে। সঙ্গে সঙ্গে আমি পালিয়ে যাই। দুর্ভাগ্যক্রমে তখনই হাসান মাঠে ঢোকে। চা-বিক্রেতা হাসানকে ধাওয়া করে বাসা পর্যন্ত চলে এল এবং মায়ের কাছে অভিযোগ করলো। মা ঘটনা আঁচ করতে পারলেন এবং তাকে ৩০০ টাকা জরিমানা দিয়ে বিদায় করলেন। আরেকবার এয়ারফোর্সে দুই ভাই পরীক্ষা দিলাম। আগেরদিন হাসান পরীক্ষা দিয়েছি। পরের দিন আমার পরীক্ষা। ভাইবা বোর্ডে যেতেই এক স্যার ক্ষেপে গেলেন, কি ব্যাপার, তুমি আবার এসেছ? কালই না তোমার পরীক্ষা নিলাম? তাকে অনেক কষ্টে বোঝালাম পুরো বিষয়টা।

এখন দেখার বিষয়, আগামী এই দুই যমজ ভাই দেশের সুনাম আরও কতটা বৃদ্ধি করতে পারেন।

নির্বাচিত সংবাদ