০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ প্রিয়নবী (সা)-এর মহান মর্যাদা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

বিশ্ব জগত আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর কুদরতের এক অপূর্ব নিদর্শন। নূরে মুহম্মদী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ব জগত সৃষ্টির সূচনা করেন। তিনি প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করে তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর খ্যাতি ও আলোচনাকে সমুন্নত করেছেন। তিনি একমাত্র তাঁকেই নিজের হাবীব অর্থাৎ প্রেমাস্পদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নিজের নাম মুবারকের পাশে তাঁর হাবীবের নাম যুক্ত করেছেন এভাবে : লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তাঁর হাবীবকে উদ্দেশ করে ইরশাদ করেছেন : আমি কি আপনার বক্ষ আপনার কল্যাণে প্রশস্ত করে দেইনি? আমি আপনার বোঝা দূর করে দিয়েছি এবং আপনার খ্যাতিকে সুমহান মর্যাদায় উন্নীত করেছি (সূরা ইন্িশরাহ্ : আয়াত ১-৪)।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর প্রেমাস্পদ এবং আল্লাহ্ তাঁর প্রেমিক- এমন মহান মর্যাদা আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু কেবল তাঁকেই দিয়েছেন। আল্লাহ্ তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করেন, ফেরেশতারাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করেন এবং মুমিনদের আল্লাহ্ তায়ালা দরুদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে : নিশ্চয়ই আল্লাহ্ এবং তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও (সূরা আহযাব : আয়াত ৫৬)।

এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টির পটভূমি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খাতিরেই বিরাট বিশ্ব জগত সৃষ্টি করেছেন এবং একে করেছেন সুশোভিত ও সুসজ্জিত। আল্লাহ্ হচ্ছেন রাব্বুল আলামীন অর্থাৎ বিশ্ব জগতের রব্ আর তাঁর হাবীব হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে তিনি করেছেন রহমাতুল্লিল আলামীন- বিশ্ব জগতের জন্য রহমত। এর মধ্যেই প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুমহান মর্যাদা নিহিত রয়েছে। রউফুর রহীম আল্লাহর দু’খানি মুবারক গুণবাচক নাম। আল্লাহ্ তাঁর এই দুটি গুণবাচক নামে তাঁর হাবীবেরও পরিচিত করেছেন। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট এক রসূল এসেছেন। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি রউফুর রহীম- দয়ার্দ্র পরম দয়ালু (সূরা তওবা : আয়াত ১২৮)।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হযরত আদম আলায়হিস্ সালামের বহু পূর্বে উর্ধ জগতে নবুওয়তের অভিষেকে অভিষিক্ত হন। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তাঁরই মাধ্যমে নবুওয়তের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সূচনা করেন এবং তাঁর দ্বারাই পৃথিবীতে নবী আগমন ধারার সমাপ্তি ঘটান। তিনিই সর্বপ্রথম এবং তিনিই সর্বশেষ। তিনি সাইয়েদুল মুরসালিন আবার তিনিই খাতামুন্নাবিয়িন। তিনি বলেছেন, আমি রসূলগণের ভূমিকা, আমি নবীদের উপসংহার- এতে আমার কোন ফখর (অহঙ্কার) নেই।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন আল ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমরা জানি প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে যারপরনেই জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন সইতে হয়েছে। তাঁর প্রাণনাশেরও চেষ্টা করা হয়েছে বহুবার। তিনি এক পর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করেছেন। এখানে গড়ে তুলেছেন এক আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র। কিন্তু শত্রুরা বসে থাকেনি। মক্কার কাফির-মুশরিকরা মদিনায় ইহুদী ও মোনাফেকদের সঙ্গে জোট বেঁধে মদিনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। যুদ্ধের পর যুদ্ধ হয়েছে। সব যুদ্ধই ছিল শত্রু বাহিনীর আক্রমণকে প্রতিহত করার। সব যুদ্ধে শত্রু বাহিনী পরাজিত হয়েছে। অতঃপর মক্কা বিজয় হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে : সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত, নিশ্চয়ই মিথ্যা দূর হওয়ার।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৯ জিলহজ ইন্তেকালের মাত্র ৯০ দিন পূর্বে তিনি হজ করতে আসেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে। বিদায় হজ নামে পরিচিত এই হজকে হুজ্জাতুল ইসলাম, হুজ্জাতুল বালাগ নামেও অভিহিত করা হয়। তিনি সেদিন আরাফাত ময়দানের সেই বিশাল জনতাকে উদ্দেশ করে যে ভাষণ দেন তা বিদায় হজের ভাষণ বা খুতবা নামে পরিচিত। এই খুতবায় তিনি বললেন : আজ আমার পায়ের তলায় অন্ধকার যুগের সকল অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, শিরক, কুফর দলিত-মথিত হলো। তিনি বললেন : আজকের এই দিনটির মতো, এই মাসটির মতো এই জনপদটির মতো, তোমাদের একের ধনসম্পদ, মান-ইজ্জত, জান-প্রাণ-রক্ত অপরের নিকট পবিত্র।

তিনি সেদিন এই দীর্ঘ ভাষণ শেষে সবাইকে আল বিদা জানান। আর তখন নাজিল হয় : আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, আমার সব নিয়ামত তোমাদের ওপর সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে সানন্দে অনুমোদন দান করলাম (সূরা মায়িদা : আয়াত ৩)।

চলবে...

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ