০৬ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন বছরের শুরুতে আসছে নমুনা মেট্রোরেল

 নতুন বছরের শুরুতে আসছে নমুনা মেট্রোরেল
  • আগামী সপ্তাহ থেকে বসবে রেললাইন ॥ জাপান থেকে বগি আসবে জুনে

রাজন ভট্টাচার্য ॥ নতুন বছরের শুরুতে দেশে আসবে মেট্রোরেলের নমুনা। মেট্রোরেল নিয়ে নগরবাসীকে ধারণা দিতে উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মেট্রোরেল ডিপোতে স্থাপন করা হবে এ নমুনা। এদিকে রাজধানীর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের পাত বসানো শুরু হচ্ছে আগামী সপ্তাহ থেকে। প্রকল্পের উল্লেখিত অংশজুড়ে চলছে পাত বসানোরই পূর্ব প্রস্তুতি। মেট্রোরেল প্রকল্পের হিসাবে এ অংশের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের আশা দিন দিন বাড়ছে। এরমধ্য দিয়ে রাজধানীতে যোগ হচ্ছে বিশ্বমানের নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা। যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এদিন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করা হবে। মূলত দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই মেট্রোরেলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক জানিয়েছেন, মেট্রোরেল-৬ এর জন্য ট্র্যাক বসানোর প্রস্তুতি চলছে। আমাদের রেলওয়ে ট্র্যাক ইতোমধ্যে চলে এসেছে। ট্র্যাক বসানোর জন্য কিছু পূর্ব প্রস্তুতি লাগে। এখন পূর্ব প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। নবেম্বরের শেষদিকে এসব ট্র্যাক বসানোর কাজ শুরু হয়ে যাবে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে ভায়াডাক্টের ওপরে রেললাইন বসে যাবে। বাহ্যিকভাবে ডিসেম্বরে এটা দৃশ্যমান হবে।

উত্তরার দিয়াবাড়ীতে প্রকল্পের ডিপোতে নিয়োজিত কর্মীরা জানিয়েছেন, পাথর-বালুর মিশ্রণে সাববেইজ এর কাজ শেষ। সাব বেইজের ওপর থাকবে পাথর, পাথরের ওপর সিøপার আর পাত বসবে। মেট্রোরেলের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পরিচালনা হবে ডিপো এলাকা থেকে। সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে। ডিপোর ছাউনির জন্য ইস্পাতের কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। এখানে রেলের টেস্ট ট্র্যাক বেড, কোচ আনলোডিং এরিয়া, জ্যাক পিট, বগি টার্ন টেবল, বগি ওয়াশ প্লান্টসহ অন্যান্য অংশের ভিত্তি নির্মাণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রস্তুতি বেশ ভালই বলা চলে।

ঢাকায় প্রথম মেট্রো চলবে বিদ্যুতে। এক ঘণ্টায় দু’পাশ থেকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে নতুন এই যোগাযোগ খাতের প্রকল্পে। তাই বিদ্যুত উপকেন্দ্র ও বিদ্যুত সঞ্চালন ব্যবস্থা, জলাধার, প্রশাসনিক ভবন, মসজিদ, মেডিক্যাল সেন্টারসহ অন্যান্য স্থাপনাও নির্মাণ হচ্ছে। মেট্রোরেল প্রকল্পের হিসাবে এ অংশের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক জানিয়েছেন, রেল কোচ ও ডিপোর যন্ত্রাংশ সংগ্রহের কাজ দৃশ্যমান হতে দেরি হবে। প্যাকেজ আটের আওতায় রোলিং স্টক এবং ডিপো ইকুইপমেন্ট আসবে। এটা তেমন দৃশ্যমান হচ্ছে না। কারণ বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি বিদেশে তৈরি হচ্ছে। এগুলো তৈরির পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জাহাজীকরণ করা হবে। এগুলো আসতে শুরু করলে খুব কম সময়ে বিষয়গুলো দৃশ্যমান হবে।

মেট্রোরেল সম্পর্কে যাত্রীদের ধারণা দিতে একটি ট্রেনের একটি নমুনাও জাপানে তৈরি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মেট্রোরেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ট্রেনের প্রথম ‘মকআপটা’ তৈরি হয়ে গেছে, দেশে আসবে জানুয়ারি মাসে। আমরা এটা ডিপোতে বসাব। কারণ বাংলাদেশে ইতোপূর্বে কোন মেট্রোরেল ছিল না। টিকেট কাটা, ট্রেনে চড়া, দাঁড়ান, নামা, ট্রেনের ভেতরে এবং স্টেশনের নির্দেশিকাগুলো কেমন থাকবে- এসব বিষয়ে মানুষকে ধারণা দিতেই এমআরটি তথ্য ও প্রদর্শন কেন্দ্রে এটা থাকবে।

এম এ এন সিদ্দিক জানান, ২০২০ সালের ১৫ জুনে মূল ট্রেনের প্রথম সেট আসবে। তারপরে ট্রেনগুলো পর্যায়ক্রমে আসতেই থাকবে।

ডিএমটিসিএলের হিসাবে, মেট্রোরেল-৬ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৩৫ ভাগ। এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের আগারগাঁও থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর অংশের অগ্রগতি ২৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। প্রকল্পের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক ও ডিপো যন্ত্রপাতি সংগ্রহ কাজের অগ্রগতি ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

প্যাকেজ-১ এর আওতায় ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন কাজের অগ্রগতি শতভাগ। ডিপো এলাকার পূর্ত কাজ হচ্ছে প্যাকেজ দুইয়ের আওতায়; এর অগ্রগতি ৬০ ভাগ। প্যাকেজ তিন ও চারের আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট এবং নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই কাজের অগ্রগতি ৫৭ ভাগ।

আগারগাঁ থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত তিন দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও তিনটি স্টেশন নির্মাণ হচ্ছে প্যাকেজ পাঁচের আওতায়। এ অংশের অগ্রগতি ২৩ দশমিক ৪৩ ভাগ। এ অংশের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের ১ অগাস্ট।

কাওরানবাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চার দশমিক ৯২২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও চারটি স্টেশন নির্মাণ হচ্ছে প্যাকেজ ছয়ের আওতায়। এই কাজের অগ্রগতি ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মেট্রোরেলের বিদ্যুতও যান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ হচ্ছে প্যাকেজ সাতের আওতায়। এই অংশের অগ্রগতি ২১ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর প্যাকেজ আটের আওতায় রেল কোচ ও ডিপো যন্ত্রপাতি সংগ্রহের অগ্রগতি ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ।

উত্তরার দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেলের ডিপোর ইস্পাতের কাঠামো, এর ওপরে বসবে ছাউনি। এখান থেকেই উড়ালপথে উঠবে মেট্রোরেল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মেট্রোরেল প্রকল্পের পুরো অংশ চালু করে দেয়া হবে জানান ঢাকা মাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

এই সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব বলেন, তারা নির্ধারিত সময়েই শেষ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, এমআরটির প্ল্যানিং স্টেজটা অনেক বড় থাকে। ২০১৬ সালে ২৬ জুন এ প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে ২০টার মতো স্টাডি করা হয়েছে। এরপর এর বেসিক ডিজাইন করা হয়েছে। তার সঙ্গে সঙ্গে এটার ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। মূল কাজ শুরুর আড়াই বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পর যে অগ্রগতি হয়েছে তা দেখলেই বোঝা যাবে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে কিনা।

আমরা এখন ২৪ ঘণ্টা প্রকল্পের কাজ চালু রাখার ব্যবস্থা করেছি। ঠিকাদার এবং পরামর্শকদের সঙ্গে চুক্তিতে এসেছি টানা ২৪ ঘণ্টা কাজ করার ব্যাপারে। নির্ধারিত সময়ের আগে যে প্রকল্পের কাজ হবে এতে কোন সন্দেহ নাই।

উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল-৬ বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এ প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ করে মেট্রোরেল চলাচল শুরুর জন্য কয়েক দফা সময় নির্ধারণ করা হয়। সবশেষ ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মেট্রোরেল চালুর কথা জানাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। গত ১১ ফেব্রুয়ারি জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা জানিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে।

প্রতি চার মিনিট পর এক হাজার ৮০০ যাত্রী

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্প চালু হলে প্রতি ৪ মিনিট পরপর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল। ঘণ্টায় চলাচল করবে প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী। প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিটের কম। ইতোমধ্যে প্রথম মেট্রোট্রেনের সামনের ও পেছনের নক্সা এবং বাইরের রং চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে লাল-সবুজের প্রাধান্য রয়েছে।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ইতোমধ্যেই মেট্রোরেলের লোকোমোটিভের ডিজাইন চূড়ান্ত করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ওই ডিজাইনের ভিত্তিতে জাপানের সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কারখানায় লোকোমোটিভের রেপ্লিকা তৈরি করা হয়েছে। রেপ্লিকার ছবিও আমরা পেয়েছি। মেট্রোরেলের লোকোমোটিভে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা রয়েছে সেগুলো ঠিক থাকলে চূড়ান্ত লোকোমোটিভ তৈরির জন্য বলা হবে।

১৭ স্টেশন

প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রকল্পের মধ্যে ১৭টি স্টেশন হচ্ছে- উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, আইএমটি, মিরপুর সেকশন-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কমলাপুর। তবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত নয়টি স্টেশন নির্মিত হবে।

মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) আবদুল বাকি মিয়া বলেন, দ্রুতগতিতে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু দিন নয় রাতেও চলছে স্প্যান বসানোর কাজ। উত্তরা দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁওয়ের দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। এরমধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কজুড়ে স্প্যান বসানো হয়েছে।

কয়েকস্থানে পিলারের গ্যাপ প্রসঙ্গে প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, এটা আমাদের টেকনিক্যাল কারণে। স্টেশন নির্মাণের স্থানে আগে দুই পাশে যাতায়াত ব্যবস্থা করব তার পরেই সড়কের মিডলে কাজ শুরু হবে। মেট্রোরেল পরিচালনার ঘণ্টায় দরকার হবে ১৩ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুত। এজন্য উত্তরা, পল্লবী, তালতলা, সোনারগাঁ ও বাংলা একাডেমি এলাকায় পাঁচটি বিদ্যুত উপকেন্দ্র থাকবে। ঘণ্টায় ১শ’ কিলোমিটার বেগে ছুটবে এই ট্রেন। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার মধ্যে সাহায্য হিসেবে জাইকা ঋণ দিচ্ছে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

নির্বাচিত সংবাদ