১২ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আর্থ-সামাজিক অসমতা ও বিশ্ব সংসদীয় নেটওয়ার্ক- ২০১৯

  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

২০১৯ এর ১৫ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিশ্বসংসদীয় নেটওয়ার্ক বা সম্মিলনীর সভায় আলোচ্য বিষয় ছিল বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনশীল পটভূমিকায় আর্থ-সামাজিক অসমতা প্রতিরোধকরণ। সারা বিশ্বের প্রায় শ’খানেক দেশের সাংসদ এই আলোচনায় উপস্থিত হয়েছিলেন ও অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে বরাবরের মতো আমি উপস্থিত ছিলাম। উল্লেখ্য, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ব সংসদীয় নেটওয়ার্কের পরিচালনা পর্ষদের আমি একজন নির্বাচিত সদস্য। এই নেটওয়ার্কের কার্যাবলী বিষয়ে আমি এর আগে এদেশের জনগণকে বিদিত করেছিলাম (দ্রষ্টব্য, দৈনিক জনকণ্ঠ, ৬ নবেম্বর, ২০১৮)।

গত ১৫ অক্টোবরের এই আলোচনা সভায় পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (১) কার্যক্রমের সমকালীন অগ্রাধিকার ও কৌশলীয় দিকসমূহের তথ্যাবলী পর্যালোচনা, (২) তাদের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সদস্য দেশসমূহের সাংসদের ফলদায়ক সংশ্লিষ্টতা প্রসারণ এবং (৩) পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়মূলক ভিত্তি বা পাটাতনের মাধ্যমে অধিকতর ফলপ্রসূ উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে সংসদীয় সমর্থন বাড়ানোর প্রচেষ্টা বীক্ষণ করা হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইন প্রণয়ন, বাজেট তৈরিকরণ ও সরকারের নির্বাচিত অঙ্গের তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক কর্তৃক সমকালে অনুসৃত টেকসই উন্নয়ন বিস্তৃত ও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সাংসদরা তাদের স্ব স্ব দেশে কিভাবে অধিকতর সমর্থন ও সহযোগিতা করতে সক্ষম করবেন, তা এই আলোচনায় স্থান পায়।

আলোচনায় প্রতিভাত হয় যে, গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী আয়ভিত্তিক অসমতা দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেলেও আঞ্চলিক পর্যায়ে ও দেশ ভেদে অসমতা বেড়েছে। ফলত সামাজিক সংহতিতে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নি¤œগামী বা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ ও নি¤œ আয় শ্রেণীর আয়ের ব্যবধানের ক্রম বৃদ্ধি। এরূপ ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, টেকসই উন্নয়ন অর্জনের পথে বড় ব্যত্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সকল আলোচক মত প্রকাশ করেন। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্যের আলোকে সমর্থন দেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তাও ঝাং। এই প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী যুৎসই জাতীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে যুব কর্মসংস্থান বাড়ানো, শ্রম শক্তিতে অধিকতর লিঙ্গ সমতা অর্জন, সরকার কর্তৃক আদায়কৃত কর- রাজস্বের ব্যয় ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অধিকতর ফলপ্রসূ পুনর্বণ্টন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সৃজিতব্য অসমতা রোধকরণ বিষয়ে সাংসদগণ ঐকমত্য প্রকাশ করেন। আলোচকদের মতে এসব হবে সব দেশে অন্তর্ভুক্তিয় উন্নয়নের অপরিহার্য উপকরণ। এই আলোচনায় প্রধান বক্তার ভূমিকায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরিচালক মার্টিন মুহলেসিন আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও দেশীয় সমর্থনের বলে এক্ষেত্রে ও প্রেক্ষিতে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আর্থ-সামাজিক অসমতা হ্রাসকরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভূমিকার কথা আলোচনার আরেক অধিবেশনে প্রতিভাত হয়। উন্নয়নশীল দেশে নিবিড়তর বাণিজ্য সংস্কার, উন্নত দেশে বাণিজ্য উদার ও বাণিজ্য যুদ্ধ পরিহারকরণ, সকল দেশে উন্নয়নের হার বাড়িয়ে আর্থ-সামাজিক অসমতা দূরীকরণের ভিত অধিকতর মজবুত করতে ও রাখতে পারে বলে সকলে একমত হন। আমি এই প্রেক্ষিতে প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, আঁতেল সম্পত্তির ক্ষেত্রে উন্নত দেশসমূহের রক্ষণশীল আইনাবলী শিথিলকরণ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অনুসৃত আন্তঃদেশ দেনা-পাওনা ও মুদ্রা বিনিময়হার বিষয়ক নীতি ও কার্যক্রমের সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ফলপ্রসূ সমন্বয়ের ওপর জোর দেই। বিস্তারিত আলোচনার পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাঝে অধিকতর সমন্বয় সাধনের পরিধি বিস্তৃত বলে সবাই ঐকমত্য প্রকাশ করেন। এই বিষয়ক আলোচনার পর্যায়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপনা করেন বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ব্যবস্থাপক ভারত উদ্ভূত আদিত্য মাতু। বিশ্বব্যাংকের পরিচালক বুথেনিয়া গুয়ারমাজি প্রযুক্তির উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও প্রসার প্রসূত সম্ভাব্য আর্থ-সামাজিক অসমতা রোধ করার লক্ষ্যে প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, শাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দ্রুততা, সার্বিক সেবা ক্ষেত্রে নিপুণতা এবং সর্বোপরি প্রযুক্তিয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিস্তারের ওপর জোর দেন। উপস্থিত সাংসদগণ সরকারী ব্যয় ও বিনিয়োগের মাধ্যমে জনগণের প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারকরণের পরিধি বিস্তার সমীচীন বলে একমত হন। আমি বাংলাদেশে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো ও কল্যাণমুখী বিতরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রসারণের বলে সকল শ্রেণীর জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মই খুলে দেয়া ও তাই বেয়ে উঠে সমতাশ্রয়ী সমাজ স্থাপনের অগ্রগতি তুলে ধরি। আলোচনার এই ক্রমে দক্ষিণ আফ্রিকার সাংসদ ইউনুস কারিম এই লক্ষ্যে সকল দেশকে অধিকতর সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

আর্থ-সামাজিক অসমতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ও ক্ষেত্রে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহের কর-ব্যবস্থার ভূমিকা এই পর্যায়ে আলোচনায় স্থান পায়। এই বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের করনীতি বিভাগের পরিচালক ভিক্টোরিয়া পেরী। ব্যক্তি উদ্যোগভিত্তিক বিনিয়োগ না কমিয়ে লাগসই প্রগতিশীলতা কর-ব্যবস্থায় প্রযুক্ত করে, কর-লব্ধ আয় উন্নয়নধর্মী অবকাঠামো সৃজন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার মাধ্যমে সকলের জন্য ওপরে ওঠার সিঁড়ি বিস্তৃত করার কার্যক্রম গ্রহণ করে সার্বিকভাবে কর ব্যবস্থাকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অর্জন ও অসমতা দূরীকরণে প্রয়োগ করা ঈপ্সিত বলে আলোচকরা মত প্রকাশ করেন। আমি এই প্রক্রিয়ায় কর-ফাঁকি রোধকরণ এবং বহুজাতিক কোম্পানির ওপর সমহারে কর আরোপণের ওপর অধিকতর দৃষ্টি দেয়া কর্মানুগ হবে বলে মত প্রকাশ করি। বহুজাতিক কোম্পানির ওপর কর আরোপণে ফাঁকি রোধকরণ ও আদায়ে নিপুণতা অর্জনের ওপর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের অধিকতর ও সমন্বিত মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন বলে আলোচকরা মত প্রকাশ করেন এবং তাদের সাথে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশেষজ্ঞরা একমত হন।

আর্থ-সামাজিক অসমতা দূরীকরনের আলোচনার শেষ পর্যায়ে উঠে আসে সরকারের ঋণ-দায়ের ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক ও তাৎপর্য। উচ্চ ও নিন্ম আয় বিশিষ্ট উভয় দেশের ক্ষেত্রেই নিপুনতর সরকারী ঋণ ব্যবস্থাপনা সমকালে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বিদিত করেন। আলোচনায় প্রতিভাত হয় যে, সরকারী ঋণের ফলপ্রসূ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থ-ব্যবস্থার আর্থিক ঝুঁকি কমানো, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বাড়ানো, ঋণের টেকসহিত্ব সংরক্ষণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রসারণ করা সম্ভব বলে আলোচকরা মত প্রকাশ করেন। বলা হয়, সরকারী ঋণের উঁচু পরিমাণ বা পর্যায় ব্যক্তি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, রাজস্বিক চাপ বাড়ায়, সামাজিক ব্যয়ের মাত্রা এবং সরকারের সংস্কারধর্মী কার্যক্রম গ্রহণ করার সামর্থ্য সীমিত করে। এসব মধ্য-আয়ের বিশেষত দরিদ্র- অর্থ ব্যবস্থাকে বিপদ সঙ্কুল করে তোলে। ফলত ঋণ দুর্দশা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮-১৯ সালে দরিদ্র দেশসমূহের ঋণ দুর্দশা ১৯৮০ এর দশকের তুলনায় উচ্চতর তথা উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই প্রেক্ষিতে এসব দেশের ঋণ-ব্যবস্থাপনা অধিকতর গুরুত্ব বা অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবিদার। এদিকে যথার্থ দৃষ্টি দিলে ও সংশোধনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করলে নতুন ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রবৃদ্ধির হার বাড়াবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ অনুকূল হবে। আলোচনার শেষ পর্যায়ে আমি বাংলাদেশের ঋণ-ব্যবস্থাপনার রূপরেখা দিয়ে এখন পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪% এর বেশি হয়নি বলে উল্লেখ করি। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় জাতীয় আয়ের এই পরিমাণ সন্তোষজনক ও প্রবৃদ্ধি সহায়ক বলে প্রতিভাত হয়। যুক্তরাজ্যের সাংসদ জেরেফী লিফরয়ের সঞ্চালনায় এই বিষয়ের আলোচনায় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কার্যক্রম ও উদ্বেগ তুলে ধরেন সামষ্টিক অর্থনীতির বিভাগের বৈশ্বিক পরিচালক মার্সেলো এন্টিভাও।

আলোচনার উপসংহারীয় পর্যায়ে বিশ্ব সংসদীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনার অধিকতর যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সমিতির (আইডিএ) ১৯তম পুনর্ভরণ করণে উন্নত দেশসমূহের তরফ থেকে যথা ঈপ্সিত বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ এবং বাণিজ্য যুদ্ধ পরিহার করে সকল দেশের জন্য অধিকতর মুক্ত বানিজ্যের নিশ্চিত পরিমন্ডল সৃষ্টির ওপর জোর দেয়া হয়। বিশেষত সংশ্লিষ্ট সকলে উপলব্দি করেন যে, আই ডি এ ১৯ এর পুনর্ভরন দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়িয়ে সকল দেশে স্থিতিশীল ও সমতা লক্ষ্যক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বাড়াতে সহায়ক হবে।

অংশগ্রহণকারীগণ জোর দিয়ে বলেন যে, সকল বিশেষত উন্নয়নশীল দেশসমূহে অধিকতর বিনিয়োগ উৎসারিত বর্ধিত ব্যয় যাতে অনাকাক্সিক্ষত আর্থ-সামাজিক অসমতা সৃষ্টি না করতে পারে, সেজন্য গণতান্ত্রিক সরকার ও শাসনব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে হবে। আলোচনায় স্বীকৃত হয় যে, জনপ্রতিনিধিত্ব দূরে সরিয়ে দিয়ে কোন স্বৈরতান্ত্রিকতা সময়ের ব্যপ্ত পরিসরে আর্থ-সামাজিক অসমতা দূরীকরণে সফল হতে পারে না। এই পটভূমিকায় কেবল মাত্র ব্যক্তি উদ্যোগভিত্তিক উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে এই ক্ষেত্রে ও লক্ষ্যে সাফল্যের কারণ, ধারক ও বাহক হিসেবে বিবেচনা বা গ্রহণ করা যায় না। এই পটভূমিকায় গণতান্ত্রিক ধনতন্ত্র সকল দেশে আর্থ-সামাজিক সমতা অর্জন ও প্রসারণের ভিত্তি বলে গ্রহণ ও সংরক্ষণ এবং প্রযুক্ত করতে হবেÑ এই প্রত্যয় নিয়ে বিশ্ব সংসদীয় নেটওয়ার্ক ২০১৯ সমাপণ হয়।

লেখক : সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী