০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের নাম গুজব

  • তাপস হালদার

বর্তমান যুগ অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগ। ইন্টারনেটের কল্যাণে পৃথিবীর সব তথ্য ভা-ার আমাদের সকলের সামনে উন্মুক্ত। বাংলাদেশে এখন প্রায় ১০ কোটিও বেশি লোক মোবাইল ব্যবহার করে, প্রায় ৪ কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন ও যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ, অর্থনীতি, কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে মানুষ যেভাবে সুফল পাচ্ছে, ঠিক সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারও ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

বাঙালী জাতি অতি আবেগপ্রবণ। গুজব শুনে সহজেই বিশ্বাস করে। নেতিবাচক কোন সংবাদ শুনলে তা যাচাই না করে তার পেছনে ছুটতে থাকে এতে দেশের ক্ষতি হলো নাকি নিজের ক্ষতি হলো সেটা দেখার সময়ও তাদের থাকে না এবং নিজেকে জাহির করার জন্য জোরালো ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এতেই সমাজ, দেশে তৈরি হয় অরাজকতা অস্থিতিশীল পরিবেশ। এই মন মানসিকতার জন্য বাঙালীদের বলা হয় হুজুগে বাঙালী। আর এই সহজ সরল সুযোগটাই নেয় স্বাধীনতাবিরোধী বিএনপি-জামাত জোট চক্র। যারা বাংলাদেশটাকে ভালভাবে মেনে নিতে পারে না, দেশের ভাল চায়না, দেশের মানুষের সম্প্রীতি বিনষ্ট করাই তাদের মূল কাজ।

সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায়, গুজব হলো এমন কোন বিবৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে অথবা কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। অনেকের মতে গুজব হলো প্রচারণার একটি কৌশলমাত্র, ভুল তথ্য এবং অসংলগ্ন তথ্য বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে গুজবের আশ্রয় নেয়া হয়, এটি নেতিবাচক প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব থাকে। সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির এক মোক্ষম হাতিয়ারও বটে। ফেক নিউজ বা গুজব সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটি জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও সাম্প্রদায়িক হামলা, সন্ত্রাসবাদ, সরকারের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে বিভ্রান্তমূলক গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা দেওয়া হচ্ছে ভুয়া খবর।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুর বৌদ্ধপল্লী ও বৌদ্ধ মন্দিরে একযোগে হামলা করা হয়। তার পরের দিন ৩০ তারিখেও টেকনাফ পটিয়াতে হামলা করা হয়। রামুতে ১২টি ও ৩০টি বসত ঘরে হামলা করা হয়। উখিয়া, টেকনাফে ১৩টি বৌদ্ধবিহার ও অর্ধ শতাধিক বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হামলা করা হয়। রামুর শ্রীকুল এলাকার আব্দুল মুক্তাদির আলী ও হাফেজ আব্দুল হক নামের দুই ব্যক্তি ফকিরাবাজারে অবস্থিত ফারুক কম্পিউটার টেলিকম হতে ছবি প্রিন্ট করে বিতরণ করে। এর আগে বিতর্কিত ছবি উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুকে ট্যাগ করে মুক্তাদির। সে ছাত্রশিবিরের সক্রিয় ক্যাডার ছিল।

২০১৩ সালের ৩ মার্চ মধ্যরাতের পর জামায়াত সুকৌশলে বগুড়ার সর্বত্র একযোগে প্রচার চালিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেয়, যুদ্ধাপরাধের বিচারের সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে, ফেইসবুকে ফটো এডিট করে চাঁদের মধ্যে সাঈদীর ছবি দিয়ে তৈরি সে ছবি ভাইরাল করা হয়। সবাইকে ঘর থেকে বের হয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়, মোবাইল ফোনগুলো সচল হতে থাকে, একে অপরকে চাঁদে সাঈদীকে দেখতে বলে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানব মনে হ্যালুসিনেশনে মানুষ যা কল্পনা করে তাই দেখে। পরাজিত শক্তির দোসররা এই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে তা-ব চালিয়ে বগুড়া জেলার কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়ি পুড়িয়ে দেয়, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি মমতাজ উদ্দিন ও আবদুল মান্নান এমপির বাড়িতেও আগুন দেয়া হয়। শুধু বগুড়ায়ই ১৩ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। সারাদেশে ২৬জন মানুষ মারা যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

২০১৩ সালের ৫ মে ব্লগাররা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করছে এই অভিযোগে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকল হেফাজতে ইসলাম। সমাবেশ থেকে তারা যখন ঢাকা দখলের ঘোষণা দিল তখন সরকার তাদের কঠোর হস্তে দমন করে ঢাকা থেকে সরিয়ে দিল। হেফাজতে ইসলাম গুজব ছড়িয়ে দিল তাদের আড়াই হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে এবং লাশগুলো গুম করা হয়েছে। সিরিয়ায় হামলার ছবিগুলো ফেসবুকে পোস্ট করে বিভ্রান্ত ছড়িয়ে দিল, যা ছিল সর্বই মিথ্যা ও গুজব।

২০১৮ সালের মাসে জুলাই মাসে ঢাকায় বাসচাপায় দুই কলেজ ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি ছাত্রদের আন্দোলনকে প্রথমদিকে সকলের সমর্থন করেছিল। পরে দেখা গেল ছাত্রদল ও শিবির নেতাকর্মীরা স্কুলের পোশাক পরে ভিতরে ঢুকে নাশকতা শুরু করল। ফেসবুকে ভুয়া খবর, ছবি প্রচার করে গুজব রটাল যে ছাত্রদের আওয়ামী অফিসে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং ছাত্রীদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

এ বছরের শুরুতে গুজব ছড়াল পদ্মা সেতু তৈরিতে তিন লক্ষ মানুষের মাথা লাগবে। সরকার তিনদিন বিদ্যুত বন্ধ করে মানুষ হত্যা করে মাথা সংগ্রহ করবে। চারদিকে ছেলে ধরা সন্দেহে অপরিচিত লোকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা শুরু করল। কত বড় মিথ্যাচার। সরকার কঠোর হস্তে দমন করেছে।

সর্বশেষ এই অক্টোবরে ভোলার বোরহানউদ্দিনে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে একজন হিন্দু ছেলের আইডি হ্যাক করে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে পোস্ট দেয়া হয় এবং সেখানে চাঁদা দাবি করা হয়। শুভ নিজেই থানায় গিয়ে জিডি করে। তারপরও তৌহিদী জনতার ব্যানারে মাইকিং করে সমাবেশের ডাক দেয় পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়, হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করা হয়, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় কয়েকটি মন্দির। পুলিশের ওপর হামলায় ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় ছাত্রদল, যুবদল, শিবিরের উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ স্থানীয় নেতারাই এ ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছে।

প্রতিটি ঘটনায়ই দেখা যায় স্বাধীনতাবিরোধী বিএনপি জামায়ত চক্রই এদেশের সহজ সরল মানুষের ভাবাবেগকে পুঁজি করে এই অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এদের লক্ষ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন যাত্রাকে ব্যাহত করা, সর্বোপরি দেশকে অকার্যকর করে ব্যর্থ রাষ্ট্র করা।

এখন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও কেন গুজবের হলি খেলা চলবে। কেন একটু নিজে না জেনে আরেকজনের একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখেই সে বিশ্বাস করবে। এ সভ্য সমাজে তো এটা হওয়ার কথা নয়। দিন দিন এটা যেখাবে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে এর জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এটি একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক, ঘটছে একের পর এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পাশাপাশি জনগনের মধ্যেও সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হবে। সকল ধর্ম বর্ণের মধ্যে সম্প্রীতির সৌহার্দ্যরে বন্ধনই কেবল পারে এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ করতে। আসুন সকলে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এ সঙ্কট মোকাবেলা করি।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

Haldertapas80@gmail.com