০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যবসার দুর্বৃত্তায়ন

পেঁয়াজ নিয়ে গত কিছুদিন ধরে যা হচ্ছে দেশে তাকে এক কথায় তুঘলকি কান্ড বললেও কম বলা হয়। এ যেন রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে ব্যবসার দুর্বৃত্তায়ন- যার সঙ্গে জড়িত বহুকথিত সিন্ডিকেট অর্থাৎ অসৎ ও অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই দলে অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ পেঁয়াজ আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং মধ্যস্বত্বভোগী। এতে একদিকে যেমন সমূহ বিপাকে পড়েছেন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ, তেমনি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে সরকারকে। পেঁয়াজ একটি নিত্যপণ্য হলেও অতি অত্যাবশ্যকীয় ও অপরিহার্য নয়। পেঁয়াজ ছাড়াও অনেক রান্না সুস্বাদু ও মুখরোচক হয়ে উঠতে পারে। অথচ এই সামান্য পণ্যটিকে ঘিরে রীতিমতো অসৎ ও অনৈতিক ব্যবসায় আটঘাট বেঁধে নেমে পড়েছেন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা। তা না হলে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী সমাপনী ভাষণে অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে পেঁয়াজ নিয়ে কিছু বলার পরদিনই এক রাতের ব্যবধানে প্রতি কেজি ১৮০ টাকার পেঁয়াজের দাম এক লাফে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় উঠে যায় কি করে? এতে একদিকে যেমন জিম্মি করা হয়েছে ক্রেতাসাধারণকে, তেমনি সরকারকে বিপাকে ফেলার হীন চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। দেশে পেঁয়াজের অন্যতম জোগানদাতা ভারত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোসহ দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য গত সেপ্টেম্বরে রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পরই প্রকৃতপক্ষে কোমর বেঁধে মাঠে নামে আমদানিকারকসহ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। স্বীকার করতে হবে যে, বাণিজ্যমন্ত্রী, বাণিজ্য সচিব, এমনকি টিসিবি পর্যন্ত ব্যবসায়ী চক্রের এহেন হীন উদ্দেশ্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। তা না হলে তারা এখন যেমন উদ্যোগ নিয়েছেন, কারগো বিমানে করে তুরস্ক, মিসর, আফগানিস্তান থেকে জরুরীভিত্তিতে পেঁয়াজ আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে সারাদেশে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির, সেই উদ্যোগ আরও আগেই নিলেন না কেন? নাকি এর পেছনেও সরকার সংশ্লিষ্ট কোন মহলের কারসাজি আছে? টিসিবি ট্রাক সেলের মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রির সীমিত উদ্যোগ নিলেও এবং ভোক্তা অধিকারের পক্ষে বাজারে অভিযান চালালেও তা আদৌ যথেষ্ট নয়। জাতীয় সংসদে কোন কোন সদস্য পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের সদস্যদের ক্রসফায়ারে দেয়ার ভয় দেখিয়েছেন। অতদূর পর্যন্ত না গেলেও অন্তত অসৎ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিলসহ জেল-জরিমানা, অর্থদন্ড জরুরী ও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। যেমন কুকুর তেমন মুগুরের কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও হস্তক্ষেপ করতে পারে।

দেশে প্রতি মাসে পেঁয়াজের গড় চাহিদা এক লাখ ২০ হাজার টন। শীত মৌসুমে চাহিদা কিছু বেশি থাকে। রমজান ও কোরবানিতে পেঁয়াজের চাহিদা সর্বোচ্চ বেড়ে দাঁড়ায় আরও দেড়-দুই লাখ টনে। এর ৬০ শতাংশ মেটানো যায় স্থানীয় উৎপাদন থেকে। বাকি ৪০ শতাংশ পেঁয়াজের চাহিদা মেটানো হয় প্রধানত ভারত থেকে আমদানি করে। ব্যবসায়ীরা নানা কারসাজি করে থাকে প্রতিবছরই, যেমন এবার করছে পেঁয়াজ নিয়ে। অতিবৃষ্টি ও বন্যাকে পুঁজি করে সুযোগ নিতে চাইছে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকসহ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। আর জনগণ এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সামনে অনেকটা অসহায়, প্রায় জিম্মি হয়ে পড়েছে। এদের চক্রান্তে বুলবুলের কারণ দেখিয়ে একদিনের ব্যবধানে চালের দাম প্রতি কেজিতে বাড়ানো হয়েছে পাঁচ টাকা।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নানা কারণের মধ্যে অন্যতম হলো দুর্বল বাজার মনিটরিং, অসাধু আমদানিকারক, উৎপাদক, পরিবেশক, সরবরাহকারী, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, অকার্যকর টিসিবি, সর্বোপরি ট্যারিফ কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে আদৌ কোন সমন্বয় না থাকা। যে কারণে ভোক্তা ও ক্রেতাস্বার্থ অধিকার এবং সংরক্ষণ বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার, মেট্রো চেম্বারসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো খুবই শক্তিশালী এবং সরকারের ওপর তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তিও অস্বীকার করা যায় না। জাতীয় সংসদেও ব্যবসায়ীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে ভোক্তা ও ক্রেতাস্বার্থ এক রকম উপেক্ষিত এবং অনালোচিত থাকছে। সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে কঠোর মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হতে হবে বাজার মনিটরিং ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। এর পাশাপাশি দেশেই বাড়াতে হবে বেশি করে পেঁয়াজের আবাদ ও উৎপাদন।