০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নকল প্রসাধনীর বিপদ

মনুষ্যত্ব বিসর্জন না দিলে মানবধ্বংসী কর্মকা-ে নিয়োজিত হওয়া সম্ভব নয়। মানুষের জন্য ক্ষতিকর, এমনকি মানব মৃত্যুর কারণ হতে পারে এমন সব কাজে যারা নিযুক্ত থাকে তাদের মতো অপরাধী আর কে আছে! এক অর্থে তারা মহাঅপরাধী। জেনেশুনেই তারা মানুষকে ঠকিয়ে ব্যবসা করে, মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে। এভাবে অন্যকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের ও স্বজনদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা যারা করে থাকে তাদের জন্য সহানুভূতির জায়গা কোথায়? বলাবাহুল্য, এরা সমাজের জন্য বিপজ্জনক।

রাজধানীর ফুটপাথ থেকে শুরু করে অভিজাত বিপণিবিতানসহ সারাদেশে এখন প্রকাশ্যে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ সুগন্ধি এবং প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। কোন অনুমোদন ছাড়াই রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকায় যত্রতত্র কারখানা বসিয়ে নকল প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী দেদার উৎপাদন চলছে। তারা দেশী-বিদেশী মোড়কে বিভিন্ন ধরনের ক্রিম, লোশন, বিউটিসোপ, ফেসওয়াশ, শ্যাম্পুসহ হরেকরকম প্রসাধনী উৎপাদন করে তা ব্যাপকভাবে বাজারজাত করে চলেছে। সৌন্দর্যপিপাসু নারী ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন এসব প্রসাধনী কিনে। ভেজাল প্রসাধনীতে ব্যবহৃত কেমিক্যালে রয়েছে আর্সেনিক ও সিসা। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে নতুন কৌটা আমদানি করে ওইসব কৌটার মধ্যে নকল প্রসাধনী ভর্তি করে বিদেশী ব্র্যান্ডের মোড়ক লাগিয়ে বিদেশী পণ্য বলে বাজারজাত করে আসছে দীর্ঘদিন। গত এক বছরে প্রায় ৬০টি নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানার সন্ধান পায় র‌্যাবের মোবাইল কোর্ট। এসব কারখানায় বিপুল পরিমাণ বিদেশী ব্র্যান্ডের নকল প্রসাধনী জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্যান্সার, গাইনি, কিডনি, শিশু, লিভার, ডায়াবেটিস, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মরণব্যাধি ক্যান্সার, কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি নকল প্রসাধনী।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের রয়েছে প্রসাধনীর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ। নিজের দেহ ও মুখাবয়বকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা কেবল উচ্চশ্রেণীর মানুষেরই নয়, হতদরিদ্রদেরও ছিল। মিসরের বিখ্যাত ফারাও রানী নেফারতিতি গুলগুল মরিঙ্গা নামের গাছের রস হতে তৈরি প্রসাধনীর মাধ্যমে নিজের চোখের পাতা এবং ভ্রু সজ্জিত করতেন। মধ্যপ্রাচ্যে এখন পর্যন্ত ব্যবহার হয়ে আসছে সুরমা। প্রাচীনকাল থেকে প্রাক-শিল্পযুগ পর্যন্ত ব্যবহার হয়েছে দেশভেদে বিভিন্ন ধরনের খড়িমাটি হতে তৈরি ত্বকের সৌন্দর্যের এবং পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী, যা ছিল সাবানের বিকল্প। খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে চীনে নখের যত্ন ও সৌন্দর্যের জন্য ডিমের সঙ্গে বিশেষ গাছের নির্যাস ও ধাতুর গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি হতো নেইল পলিশ। সে সময় বাংলার নকলবাজদের জন্ম হয়নি, তাই রক্ষে।

নকল প্রসাধনের বিপদ থেকে মুক্ত হতে হলে কয়েকটি বিষয়ে তৎপরতা প্রয়োজন। প্রথমত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নকলবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখা চাই। দ্বিতীয়ত দোকান মালিক ও বিক্রেতাদের সতর্ক হতে হবে যাতে তাদের মাধ্যমে কোন নকল পণ্য গ্রাহকের হাতে না যেতে পারে। এজন্য যাচাই-বাছাই যেমন দরকার, তেমনি পণ্য সরবরাহকারীও বিশ্বস্ত হওয়া চাই। সবকিছুর ওপরে জনসচেতনতা জরুরী। জনগণ যথাযথভাবে সচেতন হলে এই অবৈধ ব্যবসা কূল পাবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। যে কোন প্রসাধনী কেনার আগে সেটি ভালভাবে লক্ষ্য করা ও বিক্রেতার কাছে এ সম্পর্কিত তথ্য জানতে চাওয়া হতে পারে আরেকটি রক্ষাকবচ।