১৪ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারতের পেস আক্রমণ এত ভয়ঙ্কর!

  • শাকিল আহমেদ মিরাজ

গ্রেট শচীন টেন্ডুলকরের আফসোস, দুর্ধর্ষ সব পেসারদের সঙ্গে বিশ্বসেরা সব ব্যাটসম্যানদের দ্বৈথের অভাবে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যটাই এখন অনেক কমে গেছে। খুব কি বাড়িয়ে বলেছেন? শচীন বনাম ওয়াসিম আকরাম, ব্রায়ান লারা বনাম ব্রেট লি, তারও আগে সুনীল গাভাস্কার বনাম ইমরান খান কিংবা ডেনিস লিলি। বিশ্বজুড়ে সেই দ্বৈরথটা না থাকলেও ভারতীয় পেসাররা কিন্তু দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশ-বিদেশে দলটির সাম্প্রতিক সাফল্যই প্রমাণ করে ইশান্ত শর্মা, মোহাম্মদ শামি, উমেশ যাদব, জাসপ্রিত বুমরাহ, ভুবনেশ্বর কুমারদে নিয়ে গড়া আক্রমণ কতটা ভয়ঙ্কর। বিশ্বকাপের পর উইন্ডিজ সফরে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করা সিরিজে সেরা পাঁচ বোলারের সেরা তিনজনই ছিলেন পেসার। বুমরাহ, ইশান্ত শামি নিয়েছিলেন ১৩, ১১ ও ৯টি করে উইকেট। কিছুদিন আগে ঘরের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়া সিরিজেও পেসাররা কম যাননি। সেখানে দু’দলের সেরা পাঁচ বোলারের মধ্যে চারজনই ছিলেন ভারতীয়, দু’জন পেসার। যুগের পর যুগ ঘরের মাটিতে ভারতীয় পেসাররা যেখানে কপাল খুড়ে মরেছেন সেখানে ওই সিরিজে শামি ১৩ ও যাদব নিয়েছিলেন ১১ উইকেট।

গত বছর নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয়ে বড় ভূমিকা দুই পেসার ছিল বুমরাহ ও শামির। দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুন ঝড়িয়েছিলেন বুমরাহ, ভুবনেশ্বর। এটাই কি ভারত ইতিহাসের সেরা পেস বোলিং আক্রমণ? প্রশ্নটা উস্কে দিচ্ছেন ইশান্ত, শামি, যাদব। অধিনায়ক বিরাট কোহলি সেই বিতর্কে না গিয়ে শুধু বলছেন, এটা আসলে স্বপ্নের কম্বিনেশন। ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে বুমরাহ ও ভুবনেশ্বর পেস বোলিং অলরাউন্ডার হারদিক পান্ডিয়াও নেই। তারপরও সমানে উড়ছে ভারত, ওড়াচ্ছেন শামি-যাদবরা। কোহলির নেতৃত্বে বদলে যাওয়া ভারত আসলে বদলে গেছে অনেক ক্ষেত্রেই। আগে যেখানে নিজেদের মাঠে স্পিন আক্রমণই ছিল মূল ভরসা, সেখানে এখন বিদেশের পাশাপশি স্বদেশেও ভয়ঙ্কর ভারতীয় পেসা আক্রমণ। ইন্দোরে মাত্র আড়াই দিনে বাংলাদেশকে উড়িয়ে দিয়েছে স্বাগতিকরা। প্রতিপক্ষের ২০ উইকেটের ১৪টিই নিয়েছেন তিন পেসার ইশান্ত, শামি ও যাদব। ৫ স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন। একটি রানআউট, ‘কী বলব, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।’ ইনিংস ও ১৩০ রানের জয়ের পর স্বপ্নের বোলিং কম্বিনেশন নিয়ে মন্তব্য অধিনায়ক কোহলির। ভারতের এই বোলিংয়ের প্রশংসায় সত্যি ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন!

কোহলি যেমন বলেন, ‘আমি সত্যিই জানি না কী বলব। এক কথায় সবদিক দিয়ে নিখুঁত পারফর্মেন্স। দল হিসেবে আমরা দারুণ ক্রিকেট খেলছি। টেলিভিশনের পর্দায় সবাই দেখছে, বাইরে গিয়ে আমার আর নতুন করে বলার কিছু নেই। পেসাররা ফর্মের শীর্ষে রয়েছে। ওরা যখন বল করে মনে হয় যেন ভারতের মাটিতে নয়, অন্য কোন পিচে খেলা হচ্ছে!’ টেস্টের বোলিং নিয়ে মুগ্ধ ভারত অধিনায়ক আরও যোগ করেন, ‘এই মুহূর্তে জাসপ্রিত (বুমরাহ) আমাদের সঙ্গে নেই। ও দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাদের বোলিং আক্রমণ সামলাতে যে কোন দল হিমশিম খাবে। যে কোন অধিনায়কের জন্য এটা স্বপ্নের বোলিং কম্বিনেশন। স্লিপ ফিল্ডাররা সবসময় তটস্থ থাকে এই বুঝি বল তাদের কাছে আসল! এমন বোলিং আক্রমণ যে কোন দলের কাছে সবচেয়ে গরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ভারতীয় ক্রিকেটকে আরও ওপরে নিয়ে যাওয়া। সব ঠিক পথে এগোচ্ছে, আমরা রেকর্ড বা নম্বর (রেটিং পয়েন্ট) নিয়ে ভাবছি না।’ কোহলি বলেন, ‘টেস্টে গত পাঁচ বছরে আমরা এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি, ম্যাচ জেতার জন্য প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট তুলে নিতে হবে, সেটা জোহানেসবার্গ, মুম্বাই, দিল্লী, অকল্যান্ড এমনকি মেলবোর্নে হোক। সেটা কিভাবে সম্ভব? অবশ্যই দুর্দান্ত পেস বোলিং এবং স্পিনের সমন্বিত কম্বিনেশনের মাধ্যমে।’

নিজেদের মাটিতে উপমহাদেশের দলগুলোর টেস্ট স্ট্র্যাটেজি এতদিন ছিল প্রায় একই রকম। স্লো উইকেটে স্পিনের ফাঁদ পেতে সফরকারীদের ঘায়েল করা। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এভাবেই ভারত তাদের মাঠে প্রতিপক্ষকে নাকানি-চুবানি খাইছে, আমিরাতকে হোম ভেন্যু বানিয়ে যেটি করেছে পাকিস্তান। এমনকি বাংলাদেশও সেই ধারায় ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তিকে ভড়কে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বাজে দিক ছিল ঘরের মাটিতে ‘বাঘ ভারত-পাকিস্তান বিদেশে গেলেই যেন বিড়ালে পরিণত হতো!’ কপিল দেব থেকে মহেন্দ্র সিং ধোনি, ইমরান খান থেকে মিসবাহ উল হকÑ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় গেলেই কেমন ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যেত! ২০১৫ বিশ্বকাপের ঠিক আগে টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর ভারতকে সেই ধারণা থেকে বের করে আনেন বিরাট কোহলি। কখনও কোচ কখনও ডিরেক্টর হয়ে তাতে পূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছেন রবি শাস্ত্রী। তারই ফল আসছে। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই এখন ভারতের পেস আক্রমণ প্রতিপক্ষের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। কোহলি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যটা ছিল পরিষ্কার। ঘরের মাটিতে এমন পিচ তৈরি করতে হবে যেখানে পেসার এবং স্পিনাররা সমান সুবিধা পাবে। ট্রু স্পোটিং বলতে যা বোঝায়। টেস্টে গত পাঁচ বছরে আমরা এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি, ম্যাচ জেতার জন্য প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট তুলে নিতে হবে, সেটা জোহানেসবার্গ, মুম্বাই, দিল্লী, অকল্যান্ড এমনকি মেলবোর্নে হোক। আপনি কিভাবে সেটা করতে পারেন? অবশ্যই পেস এবং স্পিনের কম্বিনেশনের মাধ্যমে।’

কোহলি যোগ করেন, ‘টানা তিন মৌসুম র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে আমাদের সেই সাহসী সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। টেস্টে ইশান্ত শর্মা, মোহাম্মদ শামি, জাসপ্রিত বুমরাহ, উমেশ যাদব, হারদিক পান্ডিয়াদের নিয়ে আমি খুশি। ইনজুরি পেসারদের একটা নিয়মিত সমস্যা। তাই ব্যাকআপ তৈরি রাখা জরুরী। দীপক চাহার, খলিল আহমেদ, শার্দুল ঠাকুরের মতো নবীন পেসার উঠে আসছে।’ পেস আক্রমণ নিয়ে খুশি কোচ রবি শাস্ত্রীও। তিনি বলেন, ‘ইশান্ত, শামি, বুমরাহ- ওরা এককথায় অসাধারণ। কয়েক বছর আগের কথা বাদ দিলে, শামি ইনজুরি প্রবণ পেসার ছিলেন। পুরো একটা সিরিজ ইনজুরি ছাড়া শেষ করাটাই তখন তার জন্য মুখ্য ব্যাপার ছিল। তার মতো বোলারের জন্য ফিটনেস নিয়ে কাজ করাটা অনেক উপকার হয়েছে। তার জন্য উপহার হয়ে এসেছে তার পারফর্মেন্স। এরই মধ্যে ফিটনেসের জন্য একটা বেঞ্চমার্ক তৈরি করা হয়েছে, যা খুব সাহায্য করছে দলকে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইশান্ত শর্মা অনেক পরিশ্রম করে, সে পেস আক্রমণে দলের মেরুদ । বুমের (বুমরাহ) কথা আর কী বলব, ও ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ট্যুরে ব্যাটসম্যানদের মতো ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল, যেটা অন্য বোলারদের কাজ সহজ করে দিয়েছে। আপনি যদি ইয়ান চ্যাপেলের কথা খেয়াল করেন, তিনি বলেছেন, ‘এটা হলো অস্ট্রেলিয়ায় সফর করা ভারতের সেরা পেস আক্রমণ সম্বলিত দল।’ এমনকি কপিল দেব পর্যন্ত বলেছেন ভারতের এই পেস আক্রমণ ‘অবিশ্বাস্যরকম সুন্দর’।

শুক্রবার কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে শুরু হতে ভারত-বাংলাদেশ সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। দু’দলই প্রথমবারের মতো ডে-নাইট টেস্ট খেলতে যাচ্ছে। গোলাপি বলে ফ্লাডলাইটের আলোয় মাঠে নামতে অধীর ইশান্ত কিছুটা মজা করে বলেন, ‘শামির পিঙ্ক বলে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওর থেকে কিছু টিপস নেব।’ আর শামি জানান, ‘আমরা যত বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ি, আমাদের আড্ডার মাত্রাটা তত বেড়ে যায়। আমরা একে অপরের সাফল্য ভাগ করে নেয়ার চেষ্টা করি। ইশান্ত ও উমেশকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া আমার কাজ আরও সহজ করেছে। আমি সবসময় লেংথের দিকে নজর দেয়ার চেষ্টা করি এবং সেটাকে ঠিকঠাক কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।’ ভয়ঙ্কর পেসত্রয়ীর আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যাদব বলেন, ‘আমরা একে অপরের সাফল্য উপভোগ করি। একে অপরের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের পরিকল্পনা ঠিক করি। শামির বোলিং রেনেসাঁস সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা করা খুবই কঠিন। তবে ৩২ বছর বয়সে এসে আমিও অনেক অভিজ্ঞ হয়েছি। ভিন্ন ভ্যারিয়েশন চেষ্টা করে নিজের বোলিং উপভোগ করার চেষ্টা করি। আমাদের লক্ষ্য একটাই, ভারতকে জেতানো।’