১৪ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোনাল্ডো একাই এক শ’

  • টি ইসলাম তারিক

আবারও পার্থক্যটা পরিষ্কার করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। সময়ের আরেক সুপারস্টার লিওনেল মেসির সঙ্গে ‘আসল’ জায়গায় পার্থক্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন পর্তুগাল অধিনায়ক। সি আর সেভেন যেখানে কি ক্লাব, কি জাতীয় দল সবখানেই অপ্রতিরোধ্য, দুর্বার সেখানে বার্সিলোনার আর্জেন্টাইন তারকা মেসির দাপট শুধু ক্লাবের হয়েই!

জাতীয় দলের হয়ে একটা ট্রফির জন্য মেসির সে কি হা পিত্যেশ। অথচ রোনাল্ডো ইদানিং বলে-কয়ে ট্রফি জিতছেন। শুধু তাই নয়, জাতীয় দলের হয়ে যা করে চলেছেন অদূর ভবিষ্যতে হয়ত সেদিকে দু’চোখ মেলে তাকানোর দুঃসাহস করবেন না কেউ! ১৪ নবেম্বর রাতে ইউরো বাছাই ফুটবলে লিথুনিয়ার বিরুদ্ধে ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচে পর্র্তুগাল জয় পায় ৬-০ গোলে। অসাধারণ এই জয়ে রোনাল্ডো করেন রেকর্ডগড়া হ্যাটট্রিক। এর মধ্য দিয়ে একাধিক গৌরবময় রেকর্ডের মালিক বনে গেছেন ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে খেলা এই তারকা ফরোয়ার্ড। মজার বিষয় হচ্ছে, গত সেপ্টেম্বরে একই স্টেজে প্রথম লেগের ম্যাচে লিথুনিয়াকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল পর্তুগীজরা। ওই ম্যাচে সি আর সেভেন ছিলেন আরও দুর্বার। দলের পাঁচটির মধ্যে একাই তিনি করেছিলেন চার গোল।

এরপর ১৭ নবেম্বর লুক্সেমবার্গকে ২-০ গোলে হারিয়ে ২০২০ ইউরোর মূলপর্বে পৌঁছে গেছে পর্তুগাল। এই ম্যাচেও এক গোল করেন রোনাল্ডো। দুই ম্যাচের একটিতে চোখ ধাঁধানো হ্যাটট্রিক ও এক গোল করে রোনাল্ডোর দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা হয়েছে ৯৯। ১৬৪ ম্যাচ খেলে গোলগুলো করেছেন পর্তুগাল অধিনায়ক। আর মাত্র এক গোল করলেই ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ১০০ গোল করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করবেন রোনাল্ডো। ১০৯ গোল করে সর্বকালের সেরা গোলের রেকর্ডটি বর্তমানে দখল করে রেখেছেন ইরানের ফুটবল কিংবদন্তি আলি দাইয়ে। এই নিয়ে দেশের হয়ে শেষ আট ম্যাচে ১৪ গোল করলেন জুভেন্টাস ফরোয়ার্ড।

অনেক আগে থেকেই পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনাল্ডো বিশ্বরেকর্ডের পথে ছুটে চলেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা ইরানের আলি দাইয়ের (১০৯টি) থেকে আর মাত্র ১০ গোল দূরে তিনি। ১১ গোল করলে দাইয়েকে টপকে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন সি আর সেভেন। অনন্য অর্জনের পথে থাকা এই কিংবদন্তি ফুটবলার ভবিষ্যতে সব রেকর্ড নিজের করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত পর্তুগালের হয়ে রোনাল্ডো হ্যাটট্রিক করেছেন ৯। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ক্যারিয়ারে তার মোট হ্যাটট্রিক ৫৫। এর মধ্যে ৪৬ হ্যাটট্রিক পেয়েছেন ক্লাব ক্যারিয়ারে। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির ক্লাব ক্যারিয়ারে হ্যাটট্রিক সংখ্যাও ৪৬। দেশের হয়ে ৬ হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়েছেন মেসি। তবে বয়স ত্রিশ পার করার পর দেশের হয়ে রোনাল্ডো যেন আর বেশি করে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন। জাতীয় দলের হয়ে নয় হ্যাটট্রিকের মধ্যে ৩০তম জন্মদিনের পরই করেছেন সাতটি।

এই নিয়ে টানা সপ্তমবারের মতো ইউরোর মূলপর্বে জায়গা করে নিয়েছে পর্তুগাল। আর ২০২০ ইউরো রোনাল্ডোর জন্য টানা পঞ্চম। পর্তুগালের ২০১৬ ইউরো জয়ী দলের অধিনায়ক তাই গর্বিত। রোনাল্ডো এ প্রসঙ্গে বলেন, শেষ দুটি ম্যাচ আমাদের জিততেই হতো। আমি খুশি যে আমরা জিতেছি এবং আমি পঞ্চমবারের মতো ইউরো খেলতে যাচ্ছি। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারাটা গর্বের। আর আমি গোল করে দলকে বাছাই পর্ব উতরাতে সাহায্য করতে পেরেছি এজন্য খুব ভাল লাগছে। ইরানের আলি দাইয়ে ২০০৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়েছেন। এ কারণে রোনাল্ডোকে টেক্কা দেয়ার মতো আর কেউ বর্তমানে নেই। এখন যারা খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে রোনাল্ডোর পরে তৃতীয় স্থানে আছেন ভারতীয় অধিনায়ক সুনিল ছেত্রী। জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা ৭২। ৬৮ গোল করে এর পরের অবস্থানে আছেন রোনাল্ডোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি। সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটা তাই হাতের মধ্যেই রোনাল্ডোর। বিষয়টি তিনিও বুঝতে পারছেন।

তাইতো এ বিষয়ে জানতে চাইলে পর্তুগাল অধিনায়ক সোজাসাপ্টা বলেন, ‘সব রেকর্ডই এক সময় ভাঙ্গবে। আর রেকর্ডগুলো আমিই ভাঙ্গব।’ তবে ৯৯তম গোল করার ম্যাচটি খুব একটা ভাল কাটেনি রোনাল্ডোর। কেননা লুক্সেমবার্গের মাঠে স্বাগতিক দর্শকরা ম্যাচের বেশিরভাগ সময়ই তাকে মেসি মেসি বলে খেপিয়েছেন! যতবারই বল নিয়ে রোনাল্ডো বিপজ্জনক জায়গায় ঢুকে পড়েছেন, দর্শকরা ‘মেসি, মেসি’ বলে চিৎকার করেছেন। শট মিস করার পরও সেই একই চিৎকার-‘মেসি, মেসি, মেসি! তবে দর্শকদের এই ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ সহ্য করে রোনাল্ডো জবাবটা ঠিকই দিয়েছেন গোল করে।

অথচ চোটের কারণে শেষ দুই ম্যাচ খেলারই কথা ছিল না রোনাল্ডোর। এ বিষয়ে পর্তুগাল জাতীয় দলের কোচ ফার্নান্ডো সান্টোস বলেন, আমি জানতাম রোনাল্ডো খেলতে পারবে। ওই খেলাই প্রমাণ করেছে রোনাল্ডোর শারীরিক কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। এই নিয়ে সবার সন্দেহের অবসান ঘটেছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন সন্দেহই ছিল না। আমি সেটি জানিয়েও দিয়েছি। জাতীয় দলের সতীর্থ মারিও রুই অধিনায়কের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এই লেফট ব্যাক বলেন, নিঃসন্দেহে রোনাল্ডো বিশ্বের সেরা ফুটবলার। জিততে কখনও সে ক্লান্ত হয় না, সবসময় আরও বেশি চায়। আর আজ সে যে অবস্থানে আছে তা এই ক্ষুধার কারণেই হয়েছে। আমরা তাকে দলে পেয়ে আনন্দিত। আশা করি, এতদিন পর্যন্ত সে যেভাবে আমাদের আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে, সেভাবেই সে খেলে যাবে।

অবশ্য রোনাল্ডো লুক্সেমবার্গের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থে তিনি শতভাগ ফিট না হয়েও খেলছেন। পর্তুগাল অধিনায়ক বলেন, গত তিন সপ্তাহে আমি কিছু শারীরিক সমস্যা নিয়ে খেলছি। তবে এটা নিয়ে কোন বিতর্ক হয়নি, আপনারা এটা তৈরি করেছেন। আমি জুভেন্টাসকে সাহায্য করতে চেষ্টা করেছিলাম। কেউই মাঠ ছাড়তে চায় না। তবে আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি কারণ আমি খুব একটা ভাল অবস্থায় ছিলাম না। ইউরো বাছাইয়ে পর্তুগালের শেষ দুটি ম্যাচেও তিনি পুরোপুরি ফিট ছিলেন না বলে জানিয়েছেন। সি আর সেভেন বলেন, আমি দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছি। আমরা ইউরোর মূল পর্বে যেতে নাও পারতাম। সৌভাগ্যবশত, ক্যারিয়ারে আমি খুব বেশি চোটে পড়িনি। তবে এটা যে কোন সময়ই হতে পারে। ব্যথার কারণে আমি নিজের শতভাগ দিতে পারছি না। তবে আমি সবসময়ই খেলার চেষ্টা করি। আশা করছি দ্রুত শতভাগ ছন্দে ফিরব।