১৪ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ট্রেন নিয়ে নাশকতা হতে পারে, সাবধান!

  • মমতাজ লতিফ

ট্রেন বা রেলপথ যে কোন দেশের গণপরিবহন খাতে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ যান। কিন্তু আমাদের দেশে এ যানটি বাস-ট্রাক মালিকদের বাধার কারণে বিকশিত হতে পারেনি। আমাদের অত্যন্ত অদ্ভুত রাজনীতি, যেটি পৃথিবীর সব দেশে বিরল, অথচ আমাদের দেশে সহজলভ্য এবং যে কোন জাতির কাছে অগ্রহণযোগ্য, দেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠার ফলে দেশের প্রত্যেক ক্ষেত্রের উন্নয়নে এদের বাধাদানের অব্যাহত নাশকতামূলক ঘটনার কারণে আমরা অন্য জাতি ও দেশ যে কাজ বিনা বাধায় করতে পারে, সে কাজকে সফলভাবে করতে আমাদের দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধপন্থী সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। পাঠক, বুঝতেই পারছেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বঙ্গবন্ধু সরকার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যখন বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেলখানায় মুক্তিযুদ্ধে চার জাতীয় নেতা হত্যা এবং এর পর পরই ৭ নবেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়কদের হত্যার পর পর যে খুনী দলকে মুশতাক ও জিয়াউর রহমান পুরস্কৃত করে, বিচারের হাত থেকে তাদের সুরক্ষা দিয়ে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় আসীন করে এই দেশ বিরোধী শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করে। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক গ্রেফতারকৃত এগারো হাজার যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দেয় এবং তাদের বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিষিদ্ধ করা ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি’ চর্চার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয়। তখনই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মশত্রুরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। এই ইতিহাস এখন সবার জানা। সে জন্য, বাঙালী ও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম সময় থেকে যে রাহুর জন্ম হয়েছিল, তারা মুশতাক, জিয়া, খালেদা ও তারেকের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে ’৭৫-এর পর থেকে যে কাজটি অব্যাহতভাবে করে চলেছে তা হচ্ছে- সব ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে একে পাকিস্তানের মতো জঙ্গী-সন্ত্রাসীর দ্বারা মৃত্যু পুরীতে পরিণত করা।

পাঠককে এ সুযোগে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা বিগত ৭০-৮০ বছরে তেমন কোন রেল দুর্ঘটনা হতে দেখলাম না, অথচ বিগত দশ বছরের মধ্যে একবার চট্টগ্রামগামী ও চট্টগ্রাম ছেড়ে আসা দুটি ট্রেনের মুখোমুখী ভায়াবহ এক দুর্ঘটনা দেখে সেই প্রথম এটি নাশকতা হতে পারে বলে ধারণা করেছিলাম! এরপর খলেদা জিয়া যেদিন ঘোষণা দিয়েছিল, ‘শীঘ্রই লাশ পড়বে’, তার পরদিনই তার জনসভাস্থলের পাশে রেলপথে বসে থাকা মানুষের ওপর দিয়ে একটি ট্রেন চালিয়ে দিয়ে সম্ভবত ৮/১০ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনা জনমনে একটি নাশকতামূলক পরিকল্পিত ঘটনা বলেই প্রতিভাত হয়েছিল। এ সবের তদন্তের ফল কি হয়েছিল তা অবশ্য জনগণ জানতে পারেনি।

কিছুকাল আগে কারখানা, বহুতল ভবন, পুরান ঢাকা, নতুন ঢাকায় বার বার অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটছিল, তাতে যেমন সাধারণ শিক্ষিত নর-নারীর মৃত্যু ঘটেছিল, তেমনি সাধারণ নিরীহ নারী-পুরুষ, শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় এ ঘটনাগুলো পরিকল্পিত নাশকতা বলেই মনে হয়েছিল। কেননা, বাংলাদেশের জন্মের পর এখন পঞ্চাশ বছর হচ্ছে। তাহলে বিগত দশ বছর আগে কেন পুরান ঢাকা, নতুন ঢাকা, কারখানা, বস্তিতে এখনকার মতো আগুন লাগতে দেখা যায়নি? এখন পর পর এই আগুন কোন শ্রমিক, দারোয়ান বা যে কোন লোককে বিপুল অর্থ দিয়ে পাকা বিল্ডিংয়ে লাগানো হয়েছিল কিনা, সে সন্দেহ তখনই অনেকের মনে জেগেছিল। এর একটাই কারণ, উন্নয়নের পথে চলতে থাকা বাংলাদেশকে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্য নিয়ে একের পর এক পরিকল্পনা হচ্ছে লন্ডনে, বিদেশে এবং এদেশের জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের উদ্যোগে। মনে রাখতে হবে, যখন পর পর নানা জায়গায় আগুন লাগছে, মানুষ নিহত হচ্ছে, তারপর এটি আবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আমি ভাবছিলাম, না জানি স্বদেশের শত্রুরা এবার কোন নাশকতার খেলায় মেতে উঠবে!

এ ভাবনার পর পরই শুরু হলোÑ রেল গাড়ির বগির লাইনচ্যুত হওয়া, বগি রেলপথের বাইরে পড়ে যাওয়া, পর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুটি ট্রেনের একটি আরেকটিকে ধাক্কা দিয়ে তিনটি বগিতে সংঘর্ষে বেশ কিছু মানুষ, নারী-শিশুর নিহত হওয়া, পর পরই রংপুর লাইনে ট্রেনে ইঞ্জিনসহ ক’টি বগি পুড়ে যাওয়া এবং আগুন ধরে যাওয়ার ফলে বেশ ক’জন যাত্রীর আহতের ঘটনা।

পর পর সংঘটিত ট্রেন দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যেও কিন্তু ওই আগের অগ্নিকা-ের ঘটনার মতোই একটি পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দুর্ঘটনা হলে হঠাৎ দশ-পনেরো বছরে একটি ঘটতে পারে। কিন্তু পর পর এভাবে বিশেষত যে ট্রেনটি পাশের লাইনে সরে যাচ্ছে, তার পেছন দিকের বগিতে ধাক্কা লাগানোটা চালকের ইচ্ছাকৃত, অর্থ পেয়ে নাশকতা ঘটানোর লক্ষ্যে করেছে বলে গভীর সন্দেহ হয়। দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটির আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হতে পারে বলে সন্দেহ হয়। ইঞ্জিনও পড়ে যাবেÑ এটি কি হতে পারে স্বাভাবিক অবস্থায়? প্রশ্ন না জেগে পারে না।

এখন, জনগণকে নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা দিতে সরকারকে একদিকে যেমন দুর্ঘটনাকবলিত চালক, সংশ্লিষ্ট রেলের অন্য কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উচ্চমানের তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ, অন্য আলামত, ভিডিও ফুটেজ থাকলে তার তথ্য ব্যবহার করে মানসম্পন্ন একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে, যা করবে নিরপেক্ষ একটি তদন্ত কমিটি। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সঠিক তথ্য বের হয়ে আসবে। আমরা তো বিস্মিত হচ্ছি, দীর্ঘ আটাশ বছর পর সগীরা নামের তরুণীকে সামান্য উপর তলা থেকে ময়লা ফেলার কারণে উদ্ভূত ঝগড়াঝাটির প্রেক্ষিতে একজন খুনী মানসিকতার ডাক্তার ভাসুর ও জা সগীরাকে হত্যার পরিকল্পনা করতে পারে এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীকে ব্যবহার করে ভ্রাতৃবধূকেও হত্যা করতে পারে। এ ঘটনাটি কেন আদালত বন্ধ রেখেছিল, তাও বিস্ময়কর। তবু এতদিন পর, যখন সগীরার কন্যারা ত্রিশোর্ধ হয়েছে, একজন প্রত্যক্ষদর্শী রিক্সাওয়ালার দেয়া সাক্ষ্য থেকে প্রকৃত খুনী ও সত্য বের হওয়ায় তারা অকালে মৃত মায়ের শত্রুদের চিনতে পারবে, সেটিও কম কথা নয়। যদি সেই রিক্সাচালককে দীর্ঘ আঠাশ বছর পর পাওয়া না যেত, তাহলে কি পুলিশ এ ঘটনার রহস্য ভেদ করতে পারত?

যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধপন্থী জনগণ ও সরকারকে এ কথাটি সব সময় মাথায় রেখে সব দুর্ঘটনার নেপথ্যে নাশকতার উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, সেটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে। এ কাজটি জনগণের নিরাপত্তার জন্য যেমন দরকার হবে, তেমনি সরকারের জনকল্যাণমুখী কর্মকা-ের সুরক্ষার জন্যও প্রয়োজন হবে। সব সময় মনে রাখতে হবে, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। তেমনই একাধিক শয়তান অদূরে দাঁড়িয়ে আছে দেশ ও জাতির ক্ষতি সাধনের জন্য।

তবে রেলপথের ডবল লাইন হওয়া এবং অটো সিগন্যাল পদ্ধতি চালু করার কাজ এখনই করা দরকার, এর কোন বিকল্প নেই। রেলপথকে সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে এবং সব রকম সুরক্ষা রেলপথের যাত্রীদের প্রদান করতে হবে। তাহলেই সরকারের এবং জনগণের কাক্সিক্ষত জনপ্রিয় রেলপথ নিরাপদ যাত্রার বাহন হয়ে উঠবে অন্যান্য দেশের মতো।

লেখক : শিক্ষাবিদ