১৪ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নোবেল পুরস্কার ॥ উন্নয়ন অর্থনীতিতে নতুন বিতর্ক

  • ড. মিহির কুমার রায়

অর্থনীতিতে নোবেল পুরুস্কার প্রবর্তিত হওয়ার পর বিশেষত ১৯৬৮ সালে পর থেকে উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে মাত্র দু’বার, যদিও বিষয়টি একেবারেই প্রয়োগিক অর্থনীতির বিষয়। প্রথমবারের মতো নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হলেন বাঙালী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য কুমার সেন, যিনি দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও দারিদ্র্যের অন্তর্নিহিত কার্যকর বিষয়ে গবেষণা এবং উদার রাজনীতিতে অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে। আর অর্থনীতির একই শাখায় দ্বিতীয়বার পুরস্কারটি পেলেন অর্থনীতিবিদ ত্রয়ী অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, এস্তার দুফলো ও মাইকেল ক্রেমার ২০১৯ সালে তাদের উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষণায় (জধহফড়সরংবফ ঈড়হঃৎড়ষ ঞৎরধষ) পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন মহলে। কারণ প্রস্তাবিত গবেষণায় ব্যবহৃত জঈঞ পদ্ধতি নিয়ে এমনিতে কেতাবি অর্থনীতি বিষয়ক গবেষকদের মধ্যে বাদানুবাদ রয়েছে। এ ব্যাপারে পিকিং ইউনিভার্সিটির চীনা সেন্টার ফর ইকোনমি ও ন্যাশানাল স্কুল অব ডেপেলপমেন্টের অধ্যাপক ইয়াও ইয়াং মনে করেন, উন্নয়ন গবেষণায় সমসাময়িক কালে জঈঞ পদ্ধতি অনেকটাই সনাতন (ঙনংড়ষবঃব) অথচ পঞ্চাশের দশকের ধ্রুপদি উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের ধারণা অনেকেই একেবারেই ভুলতে বসেছেন যেমন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক বিকাশ শ্রমসাধ্য প্রয়োজন এবং দেশীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি কঠিন হলেও অপরিহার্য।

এই প্রসঙ্গে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ যেমন পেই কাং চাং, রয় এফ হ্যারোড, ইভজি ডোমার ও রবার্ট সলো গবেষণা করে দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দেশীয় সম্পদ বৃদ্ধি খুবই জরুরী, যা কৃষি কাজে নিয়োজিত কৃষকও জানেন যে, সঞ্চয় উন্নত জীবনের জন্য জরুরী। কৃষি জমি কিংবা কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে শক্তি যোগায় কিংবা উচ্চতর ফলন ফলাতে সহায়ক। তিনি বলেন, পঞ্চাশের দশকের দিকে চীনে দেশীয় সঞ্চয় মাধ্যমে মূলধন গঠনের চেষ্টা শুরু করে। সত্তরের দশকের পর থেকে চীনের জিডিপি ২০ শতাংশের নিচে নামেনি এবং সাম্প্রতিককালে (২০০৮) চীনের জিডিপি ৫২ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল যার সদ্ব্যবহার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরী। চীনের অর্থনীতিতে দুটি কাজ সংগঠিত হয়েছে যেমন, একটি শ্রম নিবিড় রফতানি দিয়ে শুরু করে ক্রমান্বয়ে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন বিকাশের সমন্বয় ঘটিয়েছে এবং এই ব্যবস্থায় চীন বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ সংখ্যক উদ্যোক্তা সৃষ্টির দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। এই বিষয় নিয়ে নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে অদ্যাবধি খুব কম উন্নয়ন অর্থনীতিবিদই গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। সে যাই হোক, চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যকে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সম্পূর্ণ বিকশিত পদ্ধতির আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হয়। আর জঈঞ ও সমকালীন উন্নয়ন অর্থনীতির বিষয়টি ব্যাপকভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। উইলিয়াম ইস্টার্নি পদ্ধতির সমালোচনা করে বলেন, এই পদ্ধতি উন্নয়নের বড় প্রশ্নগুলোর সমাধান দিতে পারে না, বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাজুড়ে কিভাবে প্রতিষ্ঠান কিংবা পলিসি তৈরি করা যায়। এই মতামতের জন্য অর্থনীতি পলিসি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক শুদ্ধাচার। এর বিপরীতে জেফরি স্যাক্স বলেন, দুর্নীতির মধ্যেই নিহিত আছে দারিদ্র্যের ফঁাঁদ, যা ভেঙ্গে ফেলে দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হবে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা, যার ফলে সৃষ্টি হয় দারিদ্র্য। এখন আসা যাক দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে উন্নয়ন অর্থনীতি মডেলের ব্যাপকতা নিয়ে কিছু সফল প্রায়োগিক গবেষণার প্রয়াস, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক মডেল তার অন্যতম, যা একটি দারিদ্র্য বিমোচনে প্রায়োগিক গবেষণার ফসল, যা বিশ্বের ১২৫টি দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই মডেলটি হলো, একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের কর্মসূচী, যা দরিদ্রদের কর্মসংস্থ’ানে, আয়বর্ধন ও জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। কিন্তু এই কর্মসূচীতে যে সকল সুফলভোগী নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গঠন করতে পেরেছে তারাই সফলতা পেয়েছে। যদিও এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশেষত মানবিক দারিদ্র্য নিয়ে ঐঁসধহ চড়াবৎঃু। যদিও এই মডেলটি ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে, উন্নয়ন অর্থনীতিতে নয়। তা হলে কি দারিদ্র্যই শান্তির প্রধান শত্রু, যার নিরসন হলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে? তাহলে সাম্প্রতিক নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হতদরিদ্র বিষয়ে গবেষকবৃন্দের ফলাফলের সঙ্গে এই সকল গবেষণার ফলের ভিন্নতা কোথায়?

নোবেল কমিটির বিবেচনায় হয়ত নতুনত্ব রয়েছে, যা আলোচনার দাবি রাখে। বৈশ্বিক দারিদ্র্য লাঘবে পরীক্ষামূলক জঈঞ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য ত্রয়ী গবেষককে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়, যা তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতি এখন উন্নয়ন অর্থনীতির দারিদ্র্য গবেষণায় কর্তৃত্ব করে যাচ্ছে। ২০০৩ সালে পভার্টি এ্যাকশন ল্যাবরেটরি স্থাপন করে অভিজিত, দুফলো ও সেন্ধিল মুলাইনাথন, যার নাম আব্দুল লতিফ জামিল পভার্টি এ্যাকশন ল্যাবরেটরি, যা ২০০৫ সালে এমআইটি এর সাবেক ছাত্র মোঃ আব্দুল লতিফ জামিল প্রদত্ত অর্থ সহায়তায় তার বাবার নামে নামকৃত হয়। যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে এ ল্যাবের মাধ্যমে গবেষণা চালানো হয় দারিদ্র্য বিমোচন ছাড়াও কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সুশাসনে। এই গবেষকদের গবেষণায় বিগত তিন দশকে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে বেশি লাভবান হয়েছে অতি গরিব ও অতি ধনী শ্রেণী, বিশেষত ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও চীন দেশের দরিদ্ররা। এই গবেষকরা মনে করেনÑ দারিদ্র্য কেবল অর্থের টানাটানি নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার বহুমাত্রিক নিরসন দরকার, যা উন্নয়ন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, গরিব মানুষ কি বলছে, কেমন আচরণ করছে, কীভাবে চিন্তা করছে, ক্ষুদ্র ঋণ এর বিকল্প । হয়ত দারিদ্র্য বিমোচনে নেই। কিন্তু তা বন্ধ হয়ে গেলে যে অনেক বিকল্প পথ বেরিয়ে আসবে, তা বলা দুষ্কর। সঞ্চয় নিয়ে দরিদ্রদের উদ্বেগ রয়েছে, যা একটি কাঠামোর মাধ্যমে আনা সম্ভব, যেমন গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাক সঞ্চয়ের সংগ্রহ তথা ব্যবহারে সাফল্য দেখিয়েছে। বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচন পরীক্ষামূলক পদ্ধতি (জঈঞ)-এর সফলতা দেখিয়ে তিন জন নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেলেন, যা হয়ে উঠেছে উন্নয়ন অর্থনীতির জন্য সফল দৃষ্টান্ত। অভিজিত ব্যানার্জী ও এস্তার দুফলোর লেখা চারটি গ্রন্থের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত চড়ড়ৎ ঊপড়হড়সরপং:অ জধফরপধষ জবঃযরহশরহম ড়ভ ঃযব ডধু ঃড় ঋরমযঃ এষড়নধষ চড়াবৎঃু (২০১১), যা গোল্ডম্যান স্যাক্স বিজনেস বুক সম্মানে ভূষিত হয়েছে। শ্রী অভিজিতের আরও একটি প্রখ্যাত গ্রন্থ হলো ডযধঃ ঃযব ঊপড়হড়সু ঘববফং ঘড়ি (২০১৯)। প্রথম বইটিতে কি আছে? বইটির মুখবন্ধে লেখা হয়েছে, গরিব মানুষ যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তা কয়েকটি স্তরে অগরিবদের চেয়েও ভিন্ন হয়, যেমন গরিব শ্রেণী যুক্তিপূর্ণভাবে চিন্তা করে কাজ করে, যাতে কোন ভুলভ্রান্তি না হয় হলে, তার খেসারত দিতে হয়, যা ধনীরা করে না। বিশ্বের সরকারগুলো গরিব উন্নয়নে অনেক ডলার ব্যয় করে, তার সঙ্গে অনেক বেসরকারী সংস্থা (ঘএঙ)সহ দাতব্য সংস্থা (ঈযধৎরঃধনষব ঙৎমধহরুধঃরড়হ) কিন্তু সেই সকল সংস্থা যে সকল অংংঁসঢ়ঃরড়হং-এর ভিত্তিতে কাজগুলো করে সেগুলোর ফল চড়ংরঃরাব হলে বলা হয় অপরিপক্ব (ওসসধঃঁৎব) দৃষ্টিভঙ্গির ফল। এই ক্ষেত্রে গবেষকগণ জঈঞ ব্যবহারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ভারতসহ বিশ্বের আরও ছয়টি দেশে মাঠ গবেষণা করে দেখিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্য অনেকের মতো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গরিবের জীবন ভিন্নরূপ ধারণ করে কেন?

দেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নোবেল বিজয়ী অভিজিতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে অর্থাৎ তাদের ব্যবস্থাপত্র বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য যেমন এক : পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সক্ষম করে তুলতে হবে আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে এবং টাকা, চাহিদা বৃদ্ধি, ক্রয় বিক্রয়, বাজার সম্প্রসারণ ইত্যাদির দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে; দুই : চাহিদার অভাব অর্থনীতির জন্য সমস্যা এবং গরিবদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিন : মধ্যবিত্ত ও গরিবদের হাতে অর্থ দিতে হবে এবং ধনীদের হাতে টাকা দিলে বৈষম্য বাড়াবে, যা কল্যাণের অর্থনীতি না হয়ে প্রেষণের অর্থনীতি হবে; চতুর্থত : রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে, যা গরিব মানুষের কোন কাজে আসে না; পঞ্চমত : ভ্রান্ত পরিসংখ্যান অর্থনীতি পরিকল্পনার জন্য খুবই ক্ষতিকর, যা ডাটা প্রস্তুতকারীদের মধ্যে তর্কবিতর্কের জন্ম দেয়, যা কম-বেশি বাংলাদেশেও রয়েছে, যেমন পেঁয়াজের তথ্য নিয়ে বিবিএস ও কৃষি বিভাগ কিংবা প্রাণী (গরু, ছাগল, মহিষ, হাঁস, মুরগি) সম্পদের ডাটা নিয়ে বিবিএস ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ কিংবা জিডিপি এর প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে মতবিরোধ ইত্যাদি।

এখন প্রশ্নটি হলো, গবেষকদের মতে গরিবরা গরিব শুধু তাদের বৈষয়িক অবস্থার কারণে নয়, এর মূলে রয়েছে তাদের ওপরে ওঠার উচ্চাকাক্সক্ষার অভাব। একবার এই আকাক্সক্ষাকে প্ররোচিত করতে পারলে সেটা ক্ষুদ্র প্রণোদনা দিয়েই অর্জন সম্ভব। দারিদ্র্যের মৃদুমন্দ চলকের বৃহৎ উল্লম্ফনের পরিবর্তন করা যায়। এর জন্য অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, উদ্বুদ্ধকরণ অর্থনীতি, যার মাধ্যমে গরিব মানুষের সাধারণ কার্যকলাপের ধারণা-ধরন পরিবর্তন করা সম্ভব, যাতে তারা দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে পারে, যা নোবেল বিজয়ী বাঙালী বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর এক শ’ বছর আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর হলো, গত জুন মাস নাগাদ অতিদারিদ্র্যের হার ৯.৭ শতাংশে নেমে এসেছে বলে পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, গত দশ বছরে প্রায় ১ কোটি লোক হতদরিদ্রের অবস্থা কাটাতে সক্ষম হয়েছে। আশা করা যায়, এসডিজি লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত হবে এবং অভিজিত দম্পতির অভিজ্ঞতা হবে তার সহযোগী।

লেখক : ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি