১০ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লোকায়ত জীবনের গান...

  • মনোয়ার হোসেন

গল্পটা তিন রাত্রির। নানা রঙের রকমারি ঢঙের লোকগানের। ছয় দেশের লোকগানের শিল্পীতে সজ্জিত সেই গল্পের চরিত্রগুলো। তাদের কণ্ঠের আশ্রয় উঠে এসেছে চেনা-অচেনা লোকায়ত জীবনের বয়ান। সোঁদামাটির গন্ধমাখা সেই সুরে আপ্লুত হয়েছে শহুরে শ্রোতার তৃষিত অন্তর। জীবনের গভীর দর্শন, আধ্যাত্মিকতা আর ভাব-ভালবাসার বার্তাবহ গীতিময়তা কড়া নেড়েছে নাগরিক চৈতন্যে। সহজিয়া সুরের পালাগান থেকে শুরু করে ফকির লালন সাঁই, বিজয় সরকারসহ বাংলার লোকবিদের মরমী সঙ্গীতে মজেছে শ্রোতার মন। শুধু কি তাই? সীমানা পেরুনো এ আসরে শোনা গেছে নয় হাজার মাইল দূরের পশ্চিম আফ্রিকার মালির লোকসঙ্গীত। ভারতীয় ভাঙড়া গানে হৃদয় রাঙিয়েছেন দালের মেহেন্দি। প্রশান্তির পরশ ছড়িয়েছে ইউরেশিয়া অঞ্চলের রাষ্ট্র জর্জিয়ার লোকজ সুর। সুফিধারার সঙ্গে রক মিউজিকের ফিউশনে গাওয়া গানে উচ্ছ্বাসে ভাসিয়েছে পাকিস্তানী সঙ্গীতদল জুনুন। কোমল সুরের পথরেখায় হৃদয় ছুঁয়েছে রাশিয়ার নিও ফোক ঘরানার ব্যান্ডদল সাত্তুমা। এভাবেই সুন্দরের ছবি এঁকে মরমীর সঙ্গীতের বন্ধনে এশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকা ও ইউরোশিয়ার সংযোগ ঘটিয়েছে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব। তবে অনেক ভালর মাঝেও নিখুঁত ছিল না সাউন্ড সিস্টেম। লোকসঙ্গীতের আসরে অধিক মাত্রার আলোক প্রক্ষেপণের কারিকুরির সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ। পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় লোকসঙ্গীতাসর ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট। বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে উৎসবটির সূচনা হয় বৃহস্পতিবার। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে তিন দিনে আঠারো ঘণ্টার সুরভ্রমণ শেষ হয় শনিবার। নগরের নানা প্রান্ত থেকে সমাগত হওয়া লক্ষাধিক শ্রোতা উপভোগ করেছেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, জর্জিয়া ও মালির মরমী সঙ্গীতে সংযুক্ত এ উৎসব। নিজ নিজ দেশের মেঠোপথের সুর শুনিয়েছেন এসব দেশের শতাধিক শিল্পী।

সমাপনী রাত : পেছন থেকে শুরু করা যাক হৃদয় রাঙানো লোকসঙ্গীতাসরের বর্ণন। আসরের সমাপনী দিন ছিল শনিবার। এদিন জনারণ্যে পরিণত হয় আর্মি স্টেডিয়াম। মোহময় এ রাতে উন্মাদনা ছড়িয়েছে উৎসবের সর্বোচ্চ আলোচিত পাকিস্তানী সুফি ঘরানার ব্যান্ডদল জুনুুন। সুফিধারার সঙ্গে রকের ফিউশনে উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে তুমুল সমাদৃত দলটি উ”চ্ছ্বাসে ভাসিয়েছে গানপ্রেমীদের। আলোড়িত করা সেসব গানের সুরে নেচে-গেয়ে ভাললাগার প্রকাশ ঘটিয়েছেন শ্রোতারা। দেড় ঘণ্টায় শুনিয়েছে ‘সাইওনি’, ‘দোস্তি’, ‘মিট্টি মে মিল যায়েঙ্গে’সহ পরানজুড়ানো কিছু গান। এই রাতের দ্বিতীয় পরিবেশনায় শ্রোতারা শুনেছে রাশিয়ান লোকসঙ্গীত। মিঠে সুরের হৃদয়গ্রাহী পরিবেশনাটি উপস্থাপন করে দেশটির কারেলিয়া অঞ্চলের নিও ফোক ঘরানার জনপ্রিয় ব্যান্ডদল সাত্তুমা। রাশিয়ার মেঠোপথের গন্ধমাখা গানের সঙ্গে পরিবেশিত যন্ত্রসঙ্গীতও ছিল দারুণ উপভোগ্য। ভাষার দূরত্ব ঘুচিয়ে মেলোডিনির্ভর গানগুলো স্পর্শ করেছে শ্রোতার অন্তর। সমাপনী রাতে তৃতীয় পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেন কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর পাড়ে জন্ম নেয়া লালনসঙ্গীত শিল্পী চন্দনা মজুমদার। চড়া কণ্ঠের আশ্রয়ে লালনের গানে ভাললাগার অনুভব ছড়িয়েছেন এই শিল্পী। লালনের পাশাপাশি শুনিয়েছেন বিজয় সরকারসহ বাংলার বিভিন্ন গীতিকবির গান। শেষ রাতের উৎসব শুরু হয় মালেক কাওয়ালের কাওয়ালি গানের আশ্রয়ে। তার গানে গানে উচ্চারিত হয় স্রষ্টার গুণগান।

দ্বিতীয় রাতের বর্ণন : শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় রাতে লোকসঙ্গীতের সূত্র ধরে এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ ঘটেছে আফ্রিকার। শোনা গেছে বাংলার বিচ্ছেদী সুরের সঙ্গে পাকিস্তানের সুফিধারা। মুগ্ধতা ছড়িয়েছে পাকিস্তানের হিনা নাসরুল্লাহ এবং সাহারা মরুভূমি সুর¯œাত মালির শিল্পী হাবিব কইটে ও তার দল বামাদার লোকগান। এদিন আধ্যাত্মবাদী সুফি সুরে শ্রোতার হৃদয়স্পর্শী গান শুনিয়েছেন উৎসবের অন্যতম শিল্পী হিনা নাসরুল্লাহ। পরিশীলিত ও চর্চিত কণ্ঠের পরিবেশনায় স্রষ্টা ও রাসুলের গুণকীর্তন। এ রাতে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির শিল্পী হাবিব কইটে ও তার দল বামাদার পরিবেশনায় কথাও বলতে হয় বিশেষভাবে। এই দলের সুরের মিশেছিল সাহারা মরুভূমির হৃদয়স্পর্শী মেলোডি। সাড়ে নয় হাজার মাইল দূর থেকে উৎসবে আসা দলটি শুনিয়েছে স্প্যানিশ ফ্ল্যামেনকো আর আফ্রো আমেরিকান ব্লুজের মূর্ছনা। আফ্রিকান পারকাশান, ফ্যমেনকো আর ব্লুজ এই তিন ঘরানার মিশেলে সাহারা মরুভূমির লু হাওয়ামাখা অপার্থিব সুরের দোলা ছুঁয়েছে শ্রোতার অন্তর।

উদ্বোধনী রাত : শুক্রবার সূচনা হওয়া উৎসবের প্রথম পরিবেশনায় দর্শক দেখেছে সিলেট অঞ্চলের ধামাইল নাচ। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেন সামিনা হুসাইন প্রেমা ও তার নৃত্যদল ভাবনা। নারী ও পুরুষশিল্পীর সম্মিলিত প্রয়াসে উপস্থাপিত হয় নয়ন জুড়ানো তিনটি নাচ। ধামাইল নাচের সঙ্গে ছিল ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাঠিনৃত্য ও মুখোশ নাচ। এই রাতে ভাঙরা গানে আসর মাতিয়েছেন ভারতের শিল্পী দালের মেহেন্দি।

উৎসবের উৎসর্গ : মেরিল নিবেদিত সান ফাউন্ডেশন আয়োজিত ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের পঞ্চম আসরটি উৎসর্গ করা হয় বাংলা গানের ছয় বরেণ্য শিল্পীকে। তারা হলেন- সুবীর নন্দী, বারী সিদ্দিকী, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আইয়ুব বাচ্চু ও ফকির আবদুর রব শাহ।

ছবি : ইবনুল আসেফ জাওয়াদ

নির্বাচিত সংবাদ