১০ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শ্যামপুরের এক সন্ত্রাসীর কাছ থেকে রিভলভারটি ভাড়া নিয়েছিল রেজা

  • সগিরা মোর্শেদ হত্যাকান্ড

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ত্রিশ বছর আগে বহুল আলোচিত সগিরা মোর্শেদ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত রিভলভার সম্পর্কে তথ্য মিলেছে। ইতোমধ্যেই সগিরা মোর্শেদ হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ঘটনাটির আরও তদন্ত চলছে। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত রিভলভার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা অব্যাহত আছে। এখন পর্যন্ত তদন্তে রিভলভারটি ঢাকার ওই সময়ের শ্যামপুর এলাকার একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীর কাছ থেকে ভাড়া করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। ওই সন্ত্রাসী পরবর্তীতে র‌্যাবের অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাস্থল থেকে যেসব আলামত উদ্ধার হয়েছিল, তারমধ্যে রিভলভারটি ছিল কিনা সে বিষয়ে পর্যালোচনা চলছে। সগিরা মোর্শেদকে শায়েস্তা করতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব) মাহমুদুল হাসানের ভাগ্নে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার ওই সময়ের বড় মস্তান মারুফ রেজা দায়িত্ব নেয়। শায়েস্তা করার অংশ হিসেবে সগিরা মোর্শেদকে ভয়ভীতি দেখাতে ওই সন্ত্রাসীর কাছ থেকে মারুফ রেজা রিভলভারটি ভাড়া করেছিল। ভাড়া করা ওই রিভলভার দিয়ে গুলি চালিয়েই শেষ পর্যন্ত সগিরা মোর্শেদকে হত্যা করে মারুফ রেজা। মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের বিশেষ পুলিশ সুপার মোঃ শাহাদাত হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, আমরা রিভলভারটি সন্ধান করে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত তদন্তে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত রিভলভারটি ভাড়া করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। মারুফ রেজা ওই রিভলভারটি ঢাকার শ্যামপুর এলাকার ওই সময়ের একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীর কাছ থেকে ভাড়া করেছিল বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ওই সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানকালে গোলাগুলিতে মারা যায়। ঘটনাস্থল থেকে যেসব আলামত উদ্ধার হয়েছিল, তার মধ্যে সগিরা মোর্শেদ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সেই আগ্নেয়াস্ত্রটি ছিল কিনা তা জানার চেষ্টা করে যাচ্ছি। হত্যাকা-ের পর মারুফ রেজা রিভলভারটি যে সন্ত্রাসীর কাছ থেকে ভাড়া করেছিল, তাকে ফেরত দিয়েছিল বলে এখন পর্যন্ত তদন্তে জানা গেছে।

গত ১৫ নবেম্বর ঢাকার ধানমন্ডি পিবিআই সদর দফতরে তদন্তকারী সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, প্রত্যক্ষদর্শী এক রিক্সাচালকের দেয়া তথ্য এবং পিবিআইয়ের গভীর তদন্তে দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে সগিরা মোর্শেদ হত্যার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেল পাঁচটার দিকে মোসাম্মৎ সগিরা মোর্শেদ সালাম (৩৪) তার ভিকারুননেসা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে সারাহাত সালমাকে (৮) আনতে বাসা থেকে বের হন। স্কুলের সামনে পৌঁছা মাত্রই অজ্ঞাতনামা দু®ৃ‹তিকারীরা তার হাতে থাকা বালা টেনে খুলে নেয়ার চেষ্টা করে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাকে গুলি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সগিরার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সগিরার স্বামী আব্দুস ছালাম চৌধুরী বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন।

১৯৯০ সালে ডিবির পরিদর্শক আব্দুল জলিল শেখ ছিনতাইকারী মিন্টুর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট দেন। বিচার চলাকালে নানাভাবে সাক্ষীদের জবানবন্দীতে মারুফ রেজার নাম আসে। মামলাটি ২৬ জন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ১১ জুলাই সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ক্রিমিনাল মিস মামলাটি খারিজ করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়।

গত ১০ নবেম্বর মামলার সন্দেহভাজন আসামি আনাছ মাহমুদ ওরফে রেজওয়ানকে (৫৯) ঢাকার রামপুরা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক গত ১২ নবেম্বর ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী (৭০) ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনকে (৬৪) ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করা হয়। এদের দেয়া তথ্য মোতাবেক গত ১৩ নবেম্বর মোঃ মারুফ রেজাকে (৫৯) বেইলী রোড তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাকৃতরা আদালতে সগিরা হত্যায় নিজেদের সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দেয়।

পিবিআই প্রধান জানান, সগিরা হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আসামি ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী (৭০) ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন (৬৪)। আনাছ মাহমুদ ওরফে রেজওয়ান (৫৯) ও মোঃ মারুফ রেজা পরিকল্পনা মোতাবেক হত্যায় অংশ নেয়।

মামলার বাদী সগিরার স্বামী আব্দুস ছালাম চৌধুরী ও তার অপর দুই বড় ভাই সামছুল আলম চৌধুরী, মেজো ভাই ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী। সগিরা ও আব্দুস সালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে লেখাপড়া করার সময় তাদের মধ্যে সম্পর্ক হয়। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৭৯ সালের ২৫ অক্টোবর তাদের বিয়ে হয়।

১৯৮০ সালে সগিরা ও তার স্বামী শিক্ষকতা করার জন্য স্ব-পরিবারে ইরাকে চলে যায়। ইরাক-ইরান যুদ্ধের কারণে ১৯৮৪ সালে তারা আবার দেশে ফেরেন। বসবাস শুরু করেন পৈত্রিক বাড়ি রাজারবাগ পেট্রোল পাম্পের কাছের দু’তলা বাড়িতে। সঙ্গে তাদের তিন কন্যা সারাহাত সালমা চৌধুরী (৮), সামিয়া সারোয়াত চৌধুরী (৫) ও সিফাত আবিয়া চৌধুরী (২) ছিল।

আর সগিরার ভাসুর ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী বারডেম হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসাবে কর্মরত। তিনি ১৯৮০ সালে সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনকে বিয়ে করেন। ১৯৮০ সালের ২২ জুন এই দম্পতি লিবিয়ায় চলে যান। আবার ১৯৮৫ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ দেশে ফেরেন। বসবাস শুরু করেন ৯৫৫ আউটার সার্কুলার রোডস্থ রাজারবাগের ওই বাড়িতে। যে বাড়িতে সগিরারা দ্বিতীয় তলায় বসবাস করত। পিতা মাতা ছাড়াও আরেক ভাই সামসুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে নীচ তলায় একত্রে কিছুদিন বসবাস করেন। তারপর বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় আব্দুস ছালাম চৌধুরীর বাসায় একটি রুমে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী ও তার পরিবার।

এক বাসায় থাকার কারণে ডাঃ হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে সগিরার ঝামেলা হতে থাকে। মাস ছয়েক পরে ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে বাড়িটির তৃতীয় তলার কাজ শেষ হয়। ডাঃ হাসান আলী তৃতীয় তলায় ওঠেন।

তৃতীয় তলা থেকে প্রায়ই ময়লা ফেলা হতো। এ নিয়ে ডাঃ হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনের সঙ্গে সগিরার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তা এক পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করে।

ডাঃ হাসান আলীর স্ত্রী শাহিন সগিরা মোর্শেদকে শায়েস্তা করার জন্য পরিকল্পনা করেন। তাতে সায় দেন তার স্বামী ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী। ডাঃ হাসান আলীর রোগী ছিলেন তৎকালীন সিদ্ধেশ্বরী এলাকার নামকরা সন্ত্রাসী মারুফ রেজা। রেজা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অবঃ) মাহমুদুল হাসানের ভাগ্নে। ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী সগিরা মোর্শেদকে শায়েস্তা করার জন্য মারুফ রেজাকে ২৫ হাজার টাকা দেয়। ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী তার শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজোয়ানকে মারুফ রেজার সহযোগী হিসেবে কাজ করতে বলেন। আনাস মাহমুদ সগিরাকে চিনতেন।

ঘটনার দিন ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী তার শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকে দুপুর ২টার দিকে মৌচাক মার্কেটের সামনে আসতে বলেন। অপর আসামি মারুফ রেজা মোটরসাইকেলযোগে মৌচাক মার্কেটের সামনে যায়। ডাঃ হাসান আলী চৌধুরী তার শ্যালককে মারুফ রেজার সঙ্গে গিয়ে সগিরাকে শায়েস্তা করতে বলেন। সগিরাকে শায়েস্তা করার জন্য মারুফ রেজাকে ২৫ হাজার টাকা দেন ডাঃ হাসান আলী।

আনাস মাহমুদ ও মারুফ রেজা মোটরসাইকেলে করে সিদ্ধেশ্বরী কালি মন্দিরের গলিতে যায়। তারা সগিরাকে রিক্সাযোগে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের দিকে যেতে দেখে পিছু নেয়। স্কুলের সামনে মারুফ রেজা মোটরসাইকেল দিয়ে সগিরার রিক্সা আটকায়। মারুফ রেজা সগিরার হাত ব্যাগ নিয়ে নেয়। আর হাতে থাকা স্বর্ণের চুড়ি খুলে নেয়ার চেষ্টা করে।

সগিরা আনাস মাহমুদকে চিনে ধমক দেন। ধমক দেয়ার পর মারুফ রেজা ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে সগিরাকে কোমর থেকে রিভলভার বের করে গুলি করে। প্রথম গুলিটি সগিরার হাতে লাগে। এরপর সে সগিরারকে আরও একটি গুলি করে। গুলিটি বাম বুকে বিদ্ধ হয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সগিরার মৃত্যু হয়। মারুফ রেজা আরও দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে মোটরসাইকেলযোগে দু’জনই পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আসামিরা মামলাটি তুলে নিতে সগিরার পরিবারকে হুমকি দিতে থাকে।

পিবিআই প্রধান জানান, হত্যাকান্ডের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিল রিক্সাচালক। যে রিক্সায় সগিরা ছিলেন। ওই রিক্সাচালককে খুঁজে বের করা হয়েছে। তার নাম ছালাম মোল্লা। বর্তমানে তার বয়স ৫৬ বছর। খুনের ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ২৬ বছর। সম্প্রতি রিক্সাচালক সগিরা খুনের বিষয়ে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন।

নির্বাচিত সংবাদ