১৫ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ॥ ২ ডিসেম্বর, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এই দিন মুক্তি সংগ্রামে উত্তাল ছিল বাংলার মাটি। মুক্তিবাহিনী ধারাবাহিক বিজয় অব্যাহত রাখে-আরও নতুন স্থান দখল করতে থাকে এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাদের ওপর প্রবল চাপ চলমান থাকে। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ থেকে সম্মুখযুদ্ধের গতি বাড়ে। আর অপ্রতিরোধ্য বাঙালীর বিজয়ের পথে পাকিস্তানী বাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ে পাকিস্তানী সেনারা পিছু হটতে থাকে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অসংখ্য মুক্তাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এদিকে পাকিস্তানী বাহিনী পঞ্চগড়ে রিং আকারে প্রথম ও দ্বিতীয় ডিফেন্স লাইন তৈরি করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা মিত্র বাহিনীর সহায়তায় গভীর রাতে আক্রমণ করায় তারা পঞ্চগড় ছেড়ে চলে যায়। চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা উত্তরে ফটিকছড়ি ও রাউজান থানা এবং দক্ষিণে আনোয়ারার অধিকাংশ স্থান তাদের দখলে আনতে সক্ষম হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী পটিয়া থানা তাদের দখলে আনার জন্য মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। মুক্তিবাহিনী বিরিসিড়ির বিজয়পুরে পাক অবস্থানের ওপর এ্যামবুশ করে ৫ জন পাকহানাদারকে হত্যা করে। এখান থেকে মুক্তিবাহিনী রাইফেলসহ ২১ জন রাজাকারকে ধরতে সক্ষম হয়। পাক কমান্ডার মোছলেহ উদ্দিন ভালুকা থেকে একদল রাজাকার সঙ্গে নিয়ে কাঁঠালি গ্রামে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করতে এলে মুক্তিবাহিনীর সেকশন কমান্ডার গিয়াসউদ্দিন এবং তিন নং সেকশন কমান্ডার আবদুল ওয়াহেদের নেতৃত্বে পরিচালিত অতর্কিত আক্রমণে ৩ জন পাকহানাদার এবং ৭ জন রাজাকার নিহত হয় এবং ৭ জন পাকসৈন্য আহত হয়। পরে পাকহানাদাররা মৃতদেহগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়। কোম্পানি কমান্ডার মোছলেহ উদ্দিন আহমেদ, প্লাটুন কমান্ডার এমদাদুল হক ও নাজিম উদ্দিন খানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহের ধানশুর ও কাটালী গ্রামের বড় রাস্তায় পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে ১৪ জন পাকসেনা ও ১৩ জন রাজাকার নিহত হয়। একই দিন মশাখালী ও কাওরাইদ থেকে পাকবাহিনী রাজৈ গ্রামে লুট করতে এলে কোম্পানি কমান্ডার চাঁন মিয়া প্লাটুন কমান্ডার মজিবর রহমান ও নজরুল ইসলাম মুক্তিবাহিনীর দল নিয়ে পাকসেনাদের ওপর গুলি চালান। এই যুদ্ধে একজন পাকসেনা নিহত হয়। মুক্তিবাহিনী ঘোড়াশালে পাকবাহিনীর অবস্থানের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ করে ২৭ হানাদারকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। সেখান থেকে বেশকিছু গোলাবারুদও উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনী। এদিকে আখাউড়া, পঞ্চগড়, ভূরুঙ্গামারী, কমলাপুর, বনতারা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে প্রচ- সংঘর্ষে হনাদার বাহিনী পিছু হটে। এতে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন লে. মাসুদ, সুবেদার খালেক, লে. মতিন, মেজর সদরুদ্দিন ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার। মুক্তিবাহিনীর ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঢাকার রামপুরা বিদ্যুত সরবরাহ কেন্দ্র, চট্টগ্রামের পাঁচটি বিদ্যুত সাব স্টেশন ও দুটি পেট্রোল পাম্প বিধ্বস্ত হয়। আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলেও হানাদার বাহিনী তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠে মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। এ আক্রমণে মুক্তিবাহিনী পুনরায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে তিন দিক থেকে আক্রমণ করলে হানাদার বাহিনী আজমপুর রেল স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যায়। দিনাজপুর জেলার মুক্তিবাহিনীর পচাগড়ের ১০ মাইল দক্ষিণে বোদা থানা হেডকোয়ার্টার শত্রুমুক্ত করে এবং এখন ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে অগ্রসর হয়। রংপুর জেলার মুক্তিবাহিনী নাগেশ্বরী থানা শত্রুমুক্ত করে এবং আরও দক্ষিণে এগিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ভারলা নদীর উত্তরে এখন প্রায় পুরো এলাকায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। কুষ্টিয়ায় মুক্তিবাহিনী জীবননগরের উত্তর-পূর্বে আন্দুল্বেড়িয়া গ্রাম স্বাধীন করে। জানা যায় যে মুক্তিবাহিনীর ভারি চাপের কারণে শত্রুরা ৯ম বিভাগীয় হেডকোয়ার্টার যশোর থেকে মাগুরায় শিফট করে। ময়মনসিংহে মুক্তিবাহিনী কামালপুরে শত্রু পোস্ট চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে এবং শত্রুর সমস্ত যোগাযোগ লাইন ধ্বংস করেছে। কামালপুরের পতন অতি আসন্ন। সিলেট জেলার মুক্তিবাহিনী বিমানবন্দর এবং শমসেরনগর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান সংহত করছে। সর্বশেষ রিপোর্ট মতে সীতাকু- ও মিরেশ্বরাই নিয়ন্ত্রণের জন্য যুদ্ধ চলছে। মুক্তিবাহিনী রাঙ্গামাটির কাছে তাদের অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলছে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা আগেই শত্রুমুক্ত হয়েছিল লে. জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর দ্বারা। ডিসেম্বরের শুরুতে দূরবর্তী বিভিন্ন অবস্থান যথা বসন্তপুর, কালীগঞ্জ, নাছিমগঞ্জ, পারুলিয়া প্রভৃতি এলাকা থেকে পাকিস্তানী সেনাদের পিছু হটিয়ে মুক্তিবাহিনী সাতক্ষীরার উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। রূপসা নদীর ওপারে খুলনার কাছে ঘাঁটি স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেক দল। দেশের গভীরতম স্থানেও যে মুক্তিবাহিনী ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল, তার পরিচয় নানা স্থান থেকে মিলছিল। নাগরপুর থানা মুক্ত হওয়ার ফলে টাঙ্গাইলে আক্রমণ পরিচালনা অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে। শত্রুপক্ষ বুঝতে পারে, মুক্তিযোদ্ধাদের আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। পরাজয় নিশ্চিত জেনে মরণকামড় দিতে শুরু করে দখলদার বাহিনী। নবেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল নিয়াজী নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাতে রাজাকার, আলবদর ও সেনাবাহিনীকে দেশের চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। অপ্রতিরোধ্য বাঙালীর বিজয়রথে পাকবাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে। প্রবাসী সরকার অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়, বাংলাদেশের বিজয় আসন্ন। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর প্রচারিত হতে থাকে। রেডিওতে বাজে জয়ের গান। রাজধানী ঢাকায় গেরিলা যোদ্ধারা একের পর এক গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন দখলদারদের আস্তানা। পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে এই দিন ঢাকা থেকে বিবিসিতে সবিস্তারে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন সংবাদদাতা নিজামউদ্দিন আহমদ। ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার পাঁচটি স্থানে বোমা বিস্ফোরণের খবর তিনি জানিয়েছিলেন। রামপুরা ও মালিবাগে বিস্ফোরণে বিদ্যুত সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সংবাদ তিনি জানান। পাকিস্তানী এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। রক্তপিপাসু সামরিকতন্ত্র পাকিস্তানের জন্য তাদের নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত একটি সংবিধান প্রণয়ন তখন প্রায় সম্পন্ন করে এনেছিল এবং ১৬ ডিসেম্বর বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই সংবিধান জাতির প্রতি ‘উপহার’ দিয়ে গঠন করবেন জাতীয় সরকারের এমনটা ছিল পরিকল্পনা। বিবিসি, ভোয়া, আকাশবাণী অথবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদে উচ্চারিত বিভিন্ন স্থানের নাম কোটি মানুষের বুকে জাগাত অন্যতর অনুভূতি। একেকটি জনপদ মুক্ত হয়ে আলোড়ন তুলত হাজারো জনপদবাসীর অন্তরে। এই দিন থেকে সীমান্ত-সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পাকিস্তান অভিযোগ করেছিল যে, সাতটি স্থানে ভারত যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলেছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহে আঘাত হেনেছে। ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই ত্রিমুখী যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। এসব দেখেশুনে ভারত সরকার বুঝেছিল, পাকিস্তান যুদ্ধ করবেই। ভারত তখন যে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা বা আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েছে, তা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে ভারত সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। পশ্চিমের প্রস্তুতি দেখে এবং নাশকতামূলক কাজের লোক ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত মোটামুটি পরিষ্কার বুঝে ফেলে পাকিস্তান রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে না, বরং লড়াই-ই করবে। তখন থেকে ক্রমেই ভারতের প্রস্তুতিও জোরদার হচ্ছিল। পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার লক্ষ্যে অবিলম্বে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে ভারত আক্রমণ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আবেদন জানান। অন্যদিকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের কর্মিসভায় বলেন, সময় বদলে গেছে, তিন-চার হাজার মাইল দূর থেকে বর্ণের প্রাধান্য দিয়ে তাদের (পাকিস্তান) ইচ্ছামতো হুকুমনামা জানাবেন, তা মেনে নেয়া যায় না। ভারত তার নেটিভ রাজ্য নয়। আজ আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য দেশের সর্বোচ্চ প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করব, ওই সব বৃহৎ দেশগুলোর ইচ্ছানুযায়ী নয়। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেই লাখ লাখ বাঙালী স্বদেশে ফিরে গিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারবে। বিবিসির বিশেষ সংবাদদাতা ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পাকিস্তানী স্যাবর জেট উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় বিমানঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করেছে। বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আশু আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গেরিলারা ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রম জোরদার করছে এবং সেনাবাহিনী বিশ্বাস করে যে, ঢাকায় অন্তত দুই হাজার গেরিলা আছে। দ্য স্টেটসম্যানের রিপোর্টে মিসেস গান্ধী উল্লেখ করেন ‘আজকে আমরা তাই করব যা আমাদের জাতীয় স্বার্থে ভাল এবং তা নয়, যা এ সকল তথাকথিত বড় রাষ্ট্রগুলো আমাদের দিয়ে করাতে পছন্দ করে। আমরা তাদের সাহায্য সহযোগিতার এবং বন্ধুত্বের সম্মান দেই কিন্তু আমরা রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌম ক্ষমতা ত্যাগ করতে পারি না।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

[email protected]