০৮ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৈষম্যের কারণে প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ॥ পরিকল্পামন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বৈষম্যের কারণে প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রবৃদ্ধি একটি উপভোগ্য বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বৈষম্যের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বৈষম্যের কারণে প্রবৃদ্ধির ঢেউ ক্ষতি হতে পারে। প্রবৃদ্ধিতে বৈষম্য ছায়া ফেলতে পারে কিনা, সে বিষয়ে কিছুটা চিন্তা রয়েছে। কারণ বৈষম্যের কারণে প্রবৃদ্ধির সুফল সামাজিকভাবে সবার কাছে পৌঁছে না। ভর্তুকি, কর রেয়াতসহ সরকারের বিভিন্ন সুবিধা বিতরণেও সমস্যা হয় বৈষম্যের কারণে। সোমবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে বিআইডিএস-এর বার্ষিক গবেষণা সম্মেলন সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল পর্যালোচনা করতে গিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। এসময় অন্য বক্তারা আশঙ্কা করেন, আগামীতে বাংলাদেশের জন্য বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাটাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। এম এ মান্নান বলেন, যদি অনিয়ন্ত্রিত কোন প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলে একটা আশঙ্কা অবশ্যই আছে। এখানে যে বিষয়টা বোঝাতে চাচ্ছে, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে যাচ্ছে। যেমন প্রবৃদ্ধির যে ফলটা আমাদের সকলের পাওয়ার কথা সামাজিকভাবে, সেই ফলটা পাচ্ছি না। শেষ বিচারে যাদের পরিশ্রমে এই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাদের কাছে কিন্তু যাচ্ছে না। অথচ আইনত তাদের কাছে যাওয়ার কথা। নানা ধরনের বিকৃতি এখানে আছে। ভর্তুকি বিকৃতি আছে, কর নেয়াতে বিকৃতি আছে। এই প্রবৃদ্ধি পালিয়ে যাচ্ছে। যেটাকে আপনারা বলেন, বিদেশ চলে যাচ্ছে বা বিভিন্ন জায়গায় সরে যাচ্ছে। এখানে সরকারের আরও বেশি করে কাজ করার অবকাশ আছে বলেও মনে করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। মন্ত্রী আরও বলেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। আশা করি ডুয়িং বিজনেস পরিবেশ উন্নত হবে।

আইএলও’র সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈষম্য বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সাম্যের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি হওয়াটাই বড় কথা, যেখানে সবাই কিছু না কিছু কাজকর্ম করে খেতে পারবে। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে বিনিয়োগ। কিন্তু এজন্য পুঁজি সরবরাহ প্রয়োজন। সরকারী বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারী বিনিয়োগ এখনও স্থবির। এজন্য বিনিয়োগ হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান হচ্ছে না। যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এজন্য মানব পুঁজি গঠনে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। বৈষম্য ব্যাপক হারে বাড়ছে। এটি কমিয়ে আনতে হবে।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর আগামী পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়ানো সম্ভব যদি নীতি ও পরিকল্পনা ঠিকভাবে করা যায়। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এরই মধ্যে দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এগুলো হয়েছে বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের কারণে। শিল্প, কৃষি, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন খাতে কিছু না কিছু সংস্কার হয়েছে। এর ফলও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই ফল ধরে রাখতে হলে পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করতে হবে এবং কাঠামোগত সংস্কার চলমান রাখতে হবে।

এর আগে দ্বিতীয় দিনে বিআইডিএসের বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের সমাপনী দিনে বিভিন্ন বিষয়ে ছয়টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। ‘এ গ্রামপেস টু লিভস অব দ্য পিপল ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে আসে গত ১০ বছরের হিসেবে বরিশাল থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকায় এসেছে। এরপর রয়েছে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ভোলা এবং সবচেয়ে কম মানুষ এসেছে শরীয়তপুর থেকে। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষক জুলফিকার আলী। তবে গত ৫ বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকায় এসেছে কিশোরগঞ্জ থেকে। এরপর রয়েছে বরিশাল, ময়মনসিংহ, ভোলা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, রংপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী। আর সবচেয়ে কম মানুষ টাঙ্গাইল থেকে এসেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। ধনী-গরিবের আয়ের এই বিপুল বৈষম্য প্রভাব ফেলছে রাজধানীবাসীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। রাজধানীর ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছে। আর ৬৮ শতাংশ মানুষ কোন না কোন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত।

রাজধানীর সাড়ে ৩ শতাংশ মানুষ এখনও তিন বেলা খেতে পায় না বলেও উঠে এসেছে গবেষণায়। এছাড়াও শহরের অধিবাসীদের মোট মাসিক আয়ের ৯ শতাংশ খরচ হচ্ছে চিকিৎসা খাতে। এতে আরও বলা হয়, ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যা হচ্ছে যানজট। এর পরেই রয়েছে যথাক্রমে বায়ুদূষণ, বিশুদ্ধ পানিপ্রাপ্তি, রাস্তার খারাপ অবস্থা, বিদ্যুতের লোডশেডিং, ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহের নিরাপত্তা এবং ইভটিজিং।