২২ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সতর্কবার্তা, তবে-

অবৈধ, অপরিণত, অযোগ্য চালকদের হাতে গণপরিবহনের চাবি তথা মানুষ মারার লাইসেন্স তুলে দেয় কে? জেনেবুঝেই এই কাজটি করে থাকে পরিবহন মালিক এবং বিআরটিএ-এর এক শ্রেণীর দায়িত্বহীন অসাধু কর্মকর্তা। তাই যে কোন সড়ক দুর্ঘটনা, বলা ভাল সড়কে বিশৃঙ্খলা ও মানবহত্যার পেছনের মূল হোতা তারাই। অথচ এ জাতীয় ঘটনা ঘটলে শাস্তি পায় কেবল চালক। ওই দুই শ্রেণীর বিপজ্জনক ব্যক্তিরা নয়। দিয়া-রাজীবের নিহত হওয়ার মামলার রায়েও সেটিই ঘটেছে। শাস্তি পেয়েছে পাল্লাপাল্লি দেয়া দুই বাসের চালক-সহকারীরা। নেপথ্যের অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞের মতামতে উঠে এসেছে সঠিক চিত্র। গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, রায়টি অবশ্যই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা থেকে বেপরোয়া চালকদের মধ্যে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা পৌঁছবে। এটা সাধুবাদ তো পাবেই; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলব যে, এই রায় থেকে পরিপূর্ণ খুশি হতে পারছি না। পরিপূর্ণ খুশি হতে পারতাম যদি বেপরোয়া চালকদের পাশাপাশি মালিক ও রুট পারমিট দেয়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারাও শাস্তির আওতায় আসত। সেটা হলো না। আগের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল পরিবহন খাতে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার নেপথ্যের মূল কারিগর পরিবহন মালিক ও অসাধু কর্মকর্তারা। তাই বলতে হচ্ছে, এই রায়টি কেবলই একটি অপরাধ প্রক্রিয়ার উপরিভাগের অংশ বা রোগের উপসর্গের সাময়িক চিকিৎসা। কিন্তু রোগটির উৎস শনাক্ত বা নির্মূল করার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখার দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকছে না।

পিছন ফিরে দেখা যাক। গত বছরের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ওপর উঠে গিয়েছিল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দুটি বাস। এতে নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব; আহত হয় আরও কয়েকজন। ওই দুর্ঘটনার দিনই ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন নিহত মিমের বাবা। তদন্তে জানা যায়, একটি বাসের ফিটনেসের মেয়াদ দুই বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ট্যাক্স-টোকেনেরও মেয়াদ ছিল না। অন্য বাসটির ছিল না রুট পারমিট। আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ২৭৯, ৩২৩, ৩২৫, ৩০৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয় অভিযোগপত্রে। মিম ও রাজীবের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনে প্রায় এক সপ্তাহ অচল ছিল ঢাকার সড়ক। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলায়। শিক্ষার্থীদের সব দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে হয় সরকারকে। শিক্ষার্থীদের দাবিতেই সংসদে পাস হয় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইন, যা গত ১ নবেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলন থেকে ৯টি দাবি উঠে আসে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে, ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যাতে সমর্থনও দিতে দেখা যায় রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহলকে।

দৃষ্টান্তমূলক রায় প্রদানকালে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, পরিবহন সেক্টরে চালক-হেলপারদের খামখেয়ালিপনায় সারাদেশেই ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনায়, বাসের নিচে চাপা পড়ে নিহত হচ্ছে। এই খামখেয়ালিপনা যেন মানুষ হত্যার নেশায় পরিণত হয়েছে। বাসের চালক-হেলপারদের উদাসীনতায় রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। তাদের বাসের চাকায় প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে অনেকে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন- এটিই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আমরা আশা করব, নতুন সড়ক আইন মেনে সড়ক ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কঠোরতার সঙ্গে আইন প্রয়োগ করবে। অপরাধীকে যেমন ছাড় দেয়ার প্রশ্ন ওঠে না, তেমনি অপরাধের যারা নেপথ্য কারিগর তাদেরকেও আগামীতে ছাড় না দেয়ার প্রত্যয় দেখাতে হবে।

নির্বাচিত সংবাদ