০৫ ডিসেম্বর ২০১৯

ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে নিজেদের মুলুকে ফিরছে বাঙালি মুসলিমরা

ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে নিজেদের মুলুকে ফিরছে বাঙালি মুসলিমরা

অনলাইন ডেস্ক ॥ ‘হাই-টেক সিটি’ বলে পরিচিত কর্নাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে পরিকল্পিত ও অত্যাধুনিক মেট্রোপলিস। কিন্তু আধুনিকতার আড়ালে এই শহরের একটা গভীর গোপন ‘আন্ডারবেলি’ও আছে, আর সেখানে মানবেতর পরিবেশে আক্ষরিক অর্থেই এই শহরের জঞ্জাল ঘেঁটে কায়ক্লেশে জীবন যাপন করেন হাজার হাজার দরিদ্র বাঙালি মুসলিম।

কিন্তু দু’তিন মাস হলো, এই বাঙালি মুসলিমরা ব্যাঙ্গালোরের পাট গুটিয়ে দলে দলে নিজেদের মুলুকে ফিরে যেতে শুরু করেছেন–শহরের উপকণ্ঠে তাদের ঘিঞ্জি বস্তিগুলো খালি হতে শুরু করেছে। যে গারবেজ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে পুরুষরা ভাত জোটাতেন, রাতারাতি সেই আয়ের রাস্তা তাদের বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর যে গরিব বাঙালি নারীরা শহরের বিভিন্ন হাইরাইজ সোসাইটি বা বহুতল আবাসনে রান্নাবান্না বা পরিচারিকার কাজ করতেন, তারাও চাকরি খোয়াচ্ছেন।

এই সবের পেছনেই আছে কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্গালোর পুলিশ আর কর্নাটক সরকারের কড়া অভিযান, যার জেরে এই অসহায় মানুষগুলো দলে দলে শহর ছাড়ছেন। অনেককেই জেলে ভরা হয়েছে, অনেকে তার আগেই ভয়ে ঘরবাড়ি ফেলে পালাচ্ছেন।

থুবারাহাল্লিতে ‘কালি খাট্টা’ বস্তি

অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করতে আসামের ধাঁচে কর্নাটকেও এনআরসি (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) তৈরির কাজ অচিরেই শুরু হবে বলে কর্নাটকের বিজেপি সরকার আগেই ঘোষণা করেছে, তার আগেই ব্যাঙ্গালোর জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের খুব কাছে অবৈধ বিদেশিদের আটক রাখতে একটি ডিটেনশন সেন্টার তৈরির কাজও শেষ, এখন যে কোনও দিন উদ্বোধনের অপেক্ষা!

গত সপ্তাহে ব্যাঙ্গালোর সফরে গিয়ে পূর্ব ব্যাঙ্গালোরের থুবারাহাল্লি বস্তি এলাকায় দেখা গেছে, গ্রামটিকে চিরে দিয়ে গেছে টেক করিডর। প্রশস্ত রাস্তার দুপাশেই ত্রিপল আর টিনে ঘেরা সার সার ঘর, যেখানে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে থাকেন হাজার হাজার বাঙালি মুসলিম। রাস্তার একপাশের বস্তিটাকে বলা হয় ‘কালি খাট্টা’, আর অন্য দিকটার নাম ‘লাল মাটি’।

এই দুরকম নামের রহস্যভেদ করতে গিয়ে জানা গেলো, ‘লাল মাটি’তে যারা থাকেন তারা কাজ করেন মূলত শহরের আবাসন শিল্পে। সেখানে জামিলুর বলে এক যুবক জানালেন, ‘আমরা রাজমিস্ত্রি, দিনমজুর বা জোগাড়ের কাজ করি–আর আমরা সবাই ভারতের বৈধ নাগরিক, বেশির ভাগই পশ্চিমবঙ্গের মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়া জেলার লোক।’

আর অন্যদিকে ‘কালি খাট্টা’-র বাসিন্দারা প্রায় সবাই জঞ্জালের স্তূপ ঘেঁটে নানা ধরনের ময়লা ঝাড়াই বাছাইয়ের কাজ করেন–আর এরাই নাকি সবাই তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি।

কালি খাট্টা বস্তি খালি করে অনেকেই পালাচ্ছেন

এই দাবির সত্যতা যাচাই করার কোনও উপায় নেই, যে গুটিকয় বাঙালির সঙ্গে কালি খাট্টা-তে বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিনিধির দেখা হয়েছে, তারা ভয়েই মুখ খুলতে চাইলেন না। তবে এটা দেখা গেল, সেই বস্তিতে একের পর এক ঘর খালি করে বাসিন্দারা উধাও হয়ে গেছেন–স্থানীয় গরিব কন্নড়রা সেইসব ঘরের দখল নিতেও শুরু করেছেন।

আর শুধু থুবারাহাল্লিতেই নয়–একই ছবি ব্যাঙ্গালোরের শহরতলির সারজাপুর, বেলান্ডার বা হোশুরের বাঙালি বস্তিগুলোতেও। সেখানেও হাজার হাজার বাঙালি মুসলিম (বা কথিত বাংলাদেশি) গত দুমাসের মধ্যে যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছেন।

অথচ ব্যাঙ্গালোরের ওয়েস্ট (বর্জ্য) ম্যানেজমেন্ট বা গার্বেজ সেগ্রিগেশন–অর্থাৎ ময়লা থেকে মেটাল, প্লাস্টিক, কাগজ, মাথার চুল, গদি-তোষক ইত্যাদি আলাদা করার যে শিল্প–সেটা পুরোটাই নির্ভর করত এই কথিত ‘বাংলাদেশি’ শ্রমিকদের ওপর।

রসভার ঠিকাদাররাই তাদের কাজে লাগাতেন, সময়ে মাইনে না-দিয়েও তাদের পার পাওয়া যেতো, কারণ ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করায় তারা বেশি চেঁচামেচি করারও সাহস পেতো না’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন ব্যাঙ্গালোরের সাবেক পুর কাউন্সিলর কে ভেঙ্কটাপ্পা।

ব্যাঙ্গালোরের কাছে ফরেনার্স ডিটেনশন সেন্টার চালু হওয়ার অপেক্ষায়

সম্প্রতি কর্নাটকে এনআরসি-জিগির শুরু হওয়ারও বেশ আগে থেকেই কথিত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ছুটকো ছুটকা অভিযান অবশ্য চলছিলই। মহাদেবপুরা অঞ্চলের এমএলএ ও কট্টর বিজেপি নেতা অরবিন্দ লিম্বাভালি তো অনেক জায়গায় পুলিশের সঙ্গে গিয়ে কথিত বাংলাদেশিদের বস্তি ভেঙে দেওয়াসহ উচ্ছেদ অভিযানে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

অরবিন্দ লিম্বাভালি এই প্রতিবেদক

সিন্দাদের রুটিরুজিতেই ভাগ বসাচ্ছে না, টাকার লোভ দিয়ে তাদের জঙ্গি কার্যকলাপেও টেনে আনা খুব সহজ। ফলে দেশের নিরাপত্তার জন্যও এরা খুব বড় হুমকি।’

বস্তুত দক্ষিণ ব্যাঙ্গালোরের তরুণ বিজেপি এমপি ও কেন্দ্রীয় স্তরেও দলের ‘উদীয়মান তারকা’ তেজস্বী সুরিয়া পর্যন্ত সম্প্রতি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেছেন তার শহরের ‘অবৈধ বাংলাদেশিরা’ নাকি বিভিন্ন ‘টেরর মডিউলে’ জড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে প্রায় মাসখানেক নিজেদের জিম্মায় রাখার পর দিওয়ালির সময় আটক ৫৯ জন কথিত বাংলাদেশিকে নিয়ে কর্নাটক পুলিশ অবশেষে বিশেষ ট্রেনে করে কলকাতা পাড়ি দেয়।

গত ২৩ নভেম্বর হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছানোর পর পুলিশ অবশ্য তাদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দিতে পারেনি–মানবাধিকার কর্মীদের হস্তক্ষেপে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি অতিথিশালায় তাদের সাময়িক আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল।

কিন্তু সেই স্বস্তি ছিল মাত্র তিন-চারদিনের। তারপরই কথিত বাংলাদেশিদের ওই দলটি রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে, ভারতের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম রিপোর্ট করছে তাদের নাকি সীমান্তের ফাঁকফোকর দিয়ে গোপনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

আর যথারীতি এই গোটা ঘটনার অভিঘাত পৌঁছেছে সুদূর ব্যাঙ্গালোরেও, ধীরে ধীরে বাঙালি মুসলিম-শূন্য হচ্ছে ভারতের এই কসমোপলিটন শহর।