২৭ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ‘এগ্রিকালচারাল প্রাইচ কমিশন’ গঠনের পরামর্শ

 দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ‘এগ্রিকালচারাল প্রাইচ কমিশন’ গঠনের পরামর্শ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ‘এগ্রিকালচারাল প্রাইচ কমিশন’ গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থায় ভোক্তারা ন্যায্যদামে পণ্য কিনতে পারবেন। সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দ্রুত পণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানো উচিত। প্রতিযোগিতামূলত অর্থনীতির কল্যাণে প্রবৃদ্ধি, উৎপদনশীলতা ও দক্ষতা উন্নয়ন হয়ে থাকে। জিনিসপত্রের দাম কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির পরিসর বড় হলেও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে বড় ধরনের দুর্বলকা রয়েছে। এজন্য দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গণতান্ত্রয়ণ প্রয়োজন। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের সর্বক্ষেত্রে সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও মানবিক উন্নয়ন অপরিহার্য্য হয়ে পড়ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলা মোটরে ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা নীতি’ শীর্ষক এক সংলাপে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন সমন্বয় এই সংলাপের আয়োজন করে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে সংলাপে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. মফিজুল ইসলাম, ইষ্ট-ওয়েষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. একে এনামুল হক, বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক উপদেষ্টা মঞ্জুর আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মনোজ কুমার রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সেলিনা সিদ্দিকা, বিএসটিআইয়ের প্রতিনিধি আফসোনা হোসেন প্রমুখ।

সংলাপে ভোক্তা কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেয়া হয়েছে। এজন্য সকল ধরনের প্রতিযোগিতা-বিরোধী তৎপরতা নিষিদ্ধ করে এবং সুসমন্ডিত রেগুলেটররি সেবা নিশ্চিত করে-এমন একটি সার্বিক প্রতিযোগিতা নীতি প্রণয়ন ও তা কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি করা হয়। এক্ষেত্রে সকল অংশীজনকে চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

ড. আতিউর রহমান বলেন, বাজারে ক্রিয়াশীল সকল পক্ষের মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। কারণ ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে প্রবৃদ্ধি গতিশীল ও বাজার ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সার্বিক উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তাদের কল্যাণ হবে সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত দেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে পেঁয়াজ ও চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ভোক্তা স্বার্থ নিশ্চিত করতে হলে অর্থনীতিতে গণতান্ত্রয়ণ প্রয়োজন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এগ্রিকালচারাল প্রাইচ কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রয়োজন আছে উল্লেখ করে সাবেক গবর্নর আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও সচল রাখতে আগ্রহী উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা নীতি আরও বেশি মাত্রায় অপরিহার্য্য। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা নীতি কেবল অগ্রসর অর্থনীতির জন্য প্রযোজ্য এমন ভুল ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ উদ্যোগ এবং বেসরকারী খাতের কার্যকর সম্পূরক ভূমিকার কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মানব বসম্পদ উন্নয়ন এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে। এসবের পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে জীবন যাপনের ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়া বৃহৎ অর্থে ভোক্তা কল্যাণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

এদিকে, উন্নয়ন সমন্বয়ের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বাজারে যারা ছোট খেলোয়ার তারাই বড় ভূমিকা রাখছেন। দেশের মোট শ্রম শক্তির ৮৩ ভাগ নিযুক্ত আছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে। কাজেই ক্ষুদ্র কুটির শিল্পগুলোকে যদি কার্যকর প্রতিযোগিতা নীতির মাধ্যমে রক্ষা করা যায় তাহলে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে সুফল আসবে। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতা নীতি প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকরা নিজের দেশের অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন। গত এক দশকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সুবিবেচনাভিত্তিক নীতি উদ্যোগের মাধ্যমে আর্থিক সেবার বাজারে একটি সুস্থ্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে ও তা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর্থিক সেবার বাইরে থাকা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এ সেবা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সেবা দান এবং সর্বোপরি ডিজিটাইজেশনের ওপর জোর দিয়েছে। ফলে এ সময়ের মধ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এজেন্ট ব্যাংকিং, ব্যাংক ও এনজিও পার্টনারশিপের মতো উদ্যোগগুলো ছড়িয়ে পড়ছে।

সংলাপে প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, প্রতিযোগিতা আইনটি দেশে ২০১২ সালে করা হয়। কিন্তু তিনবছর ধরে মূলত এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দুজন সদস্য দিয়ে এটা চলছে। শীঘ্রই কমিশনের কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ৩৫-৪০ জন লোকবল নিয়োগ করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই আইনটি বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশে বিভিন্ন নামে রয়েছে। মূলত ভোক্তাদের স্বার্থ নিশ্চিত করতেই এ ধরনের আইন ও কমিশন করা হয়। তিনি জানান, পেঁয়াজ ও চাল নিয়ে যে সঙ্কট তৈরি হতে পারে এটি কমিশন অবগত। এ কারণে একবছর আগে বাংলাদেশ উন্নয়ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) দিয়ে একটি সমীক্ষা করানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন পুরোদমে কাজকর্ম শুরু করতে পারলে জিডিপি আরও ২ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে এই্ কমিশন শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল কিংবা চালের মতো নিত্যপণ্য নিয়ে কাজ করা কিন্তু কমিশনের কাজ নয়। এসব জিনিসের দাম বাড়ার পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। চাহিদা ও যোগানের মতো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, পেঁয়াজ ও চালের বাজারে কোন সিন্ডিকেট পাওয়া যায়নি। ড. একে এনামুল বলেন, ভোক্তা স্বার্থে অনেক দেশে বাধ্য করে প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশেও এটি এখন প্রয়োজন হয়ে পড়ছে।

নির্বাচিত সংবাদ