২৮ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ

  • আনোয়ারা বেগম

’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিল তাদের জীবনবাজি রাখার ঘটনা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষ যোদ্ধাদের ন্যায় নারী যোদ্ধারা সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগের মাধ্যমে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা অনেক। আজ তাদের মধ্য থেকে দু’জনকে উদাহরণ হিসেবে বেছে নেয়া যাক। মুক্তিযোদ্ধা করুনা বেগমের বাড়ি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দোয়ারিকা শিকারপুর ফেরিঘাটের সঙ্গে অবস্থিত বাকুদিয়া গ্রামে। যুদ্ধ শুরু হলে তার স্বামী শহীদুল হাসান যুদ্ধে যোগদান করেন। একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন শহীদুল। তারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। করুনা তিন বছরের শিশুকে মায়ের কাছে রেখে স্বামীর মৃত্যুর একমাস পরে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। বরিশালে মুলাদী থানার কুতুববাহিনীতে তিনি আরও অনেকের সঙ্গে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। এ বাহিনীর ৫০ জন নারী যোদ্ধার তিনি কমান্ডার ছিলেন। তিনি গ্রেনেড, স্টেনগান ও রাইফেল চালানো শেখার পাশাপাশি বিস্ফোরক দ্রব্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন (পাগলী) সেজে ছদ্মবেশে শত্রু শিবিরে অপারেশন চালিয়েছেন। তাঁর এ অসম সাহসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের দায়িত্ব পান। পাকিস্তানী বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি ছিল মাহিলাড়ায়, পাঁচজন নারী এবং ছয়জন পুরুষের একটি দল করুনা বেগমের নেতৃত্বে এই ঘাঁটি আক্রমণ করে। তিনি নিজেই পর পর পাঁচটি গ্রেনেড ছুড়ে আক্রমণের সূচনা করেন। চারঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যান তাঁরা। ১০ জন পাকিস্তানী সেনা হতাহত হয়। তাদের দলের একজন আহত হয়। পাকিস্তানী বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলি করুনা বেগমের ডান পায়ে বিদ্ধ হয়। তিনি ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার (মুজিব) ৪২৬ জনকে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। তাঁদের একজন হচ্ছেন সিরাজগঞ্জের ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম। তিনি যুদ্ধকালে হাসপাতালে আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। অস্ত্র হাতে তিনি যুদ্ধ করেননি। কিন্তু সেনাবাহিনীর মহিলা অফিসার ও চিকিৎসক হিসেবে হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। অন্যজন অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করেছেন পুরো নয় মাস। যার নাম তারামন বিবি। তারামনের পৈত্রিক নিবাস কুড়িগ্রামের সংকর মাধবপুর। স্বাধীনতা যুদ্ধে চলাকালে তারামনের পরিবারবর্গ মুক্তিযোদ্ধা মালঙ্গ মাস্টারের বাড়িতে আশ্রয় নেয় রাজীবপুরে। নিকটস্থ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তিনি রান্নাবান্নার কাজ করতেন। এ সময় ক্যাম্পের কমান্ডার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুজিব হাওলাদার তারামনকে ধর্ম কন্যা হিসেবে গ্রহণ করেন। এবং অস্ত্র চালনা শিক্ষা দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ নিরক্ষর তারামন কোদাল কাঠি, রাজীবপুর, তারাবর, সাজাই, গাইবান্ধা অঞ্চলের সাত আটটি স্থানে যুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণ করেন। মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এক অবিস্মরণীয় ও একক ইতিহাস সৃষ্টি করেন। যু্েদ্ধ তার প্রথম অংশগ্রহণ ছিল ১১নং সেক্টরের ব্যাংকারে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্ম পিতার সঙ্গ্ েএক বছর ঢাকায় ছিলেন। পরে মা কুলসুম বিবির চিঠি পেয়ে গ্রামে ফিরে যান এবং দিনাজপুর আবদুল মজিদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ ও জানত না তারামন বিবি বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন। ১৯৯৫ সালে গবেষণায় তার বীর প্রতীক খেতাব পাওয়ার বিষয়টি দৈনিক কাগজে খবর প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতার ২৩ বছর পর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বীর প্রতীক মেডেল পরিয়ে দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষের অনেক আকাক্সক্ষার স্বপ্নপূরণের জায়গা প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। এ জন্য মা তার সন্তানকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেছিল। স্বাধীনতার জন্য যে যুদ্ধ সেখানে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়। যুদ্ধে বিজয় লাভের পূর্বে দেশের জন্য অনেক মা সন্তানকে উৎসর্গ করেছেন। মহীয়সী নারী জাহানারা ইমাম তার ছেলে রুমীকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘যা তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে দিলাম।’ এ স্বাধীন সত্য পুরুষের বেলায় যেমন সত্য নারীর বেলায়ও তেমন সত্য। মুক্তিযুদ্ধ বাকি সময় জাহানারা ইমাম সন্তানের সঙ্গে গেরিলাযুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছেলেকে অস্ত্রসহ তার বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে জায়গা দিয়েছেন, খাবার খাইয়েছেন, যুদ্ধের প্রস্তুতি আগে সতর্ক করে দিয়েছেন, তদারকি করেছেন। তৃণমূল পর্যায়ে থেকে শহরের সর্বত্র নারী তাঁর সাহসকে সমুন্নত রেখেছেন যুদ্ধের সমান্তরালে।

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ছিল সম্মুখ সমরে। বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাময়িক আশ্রয় দেয়া, আহতদের সেবা করা, খাবার ব্যবস্থা করা, অস্ত্র লুকিয়ে রেখে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়া। আশ্রয় গ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রুপক্ষের নজর এড়াতে কাপড়ের ব্যবস্থা করা, লুকিয়ে সাহায্য করা, অর্থকড়ি দিয়ে সাহায্য করা, খাবার সঙ্গে দিয়ে দেওয়া। যুদ্ধের অংশীদারিত্বের পাশাপাশি সমাজ কাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য যা করা তার সবটুকু করেছেন নিজ সাহস ও শক্তিমত্তা বলে।

গ্রাম বাংলার দুই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মেহেরুন্নিসা মীরা ও হালিমা খাতুন। অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় মেহেরুন্নিসা মীরার বয়স ছিল ১৬ বছর। গ্রামের নাম বাজুখালী, তার পিতা জসিমুদ্দীন ও রাজাকারদের হাতে শহীদ হলে মিরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি বাগেরহাটের জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ এ তিনি বিয়ে করেন। ১৯৯০ সালে চার সন্তানের জননী মীরা স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হন। ৯৯ সাল পর্যন্ত তার জীবিকা ছিল কাঠ কুড়িয়ে বিক্রি করা।

গ্রামের হালিমা খাতুন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ১৯ বছর বয়সে। তার স্বামী সিরাজ শেখ ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন সিরাজ শেখ। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের আগ পর্যন্ত হালিমা দৈনিক বিশ টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ‘কেয়ার’ এ দিনমজুরি করতেন। হালিমা ও মীরা উভয়েই জানিয়েছেন তাদের সঙ্গে আরও অনেক মহিলা যোদ্ধা ছিলেন। সাধারণ পরিবারের বলে তাদের কোন খোঁজ খবর নেই।

পাকিস্তানী সেনাদের বাঙালী সহযোগী আলবদর বাহিনীর হাতে যাঁরা অপহৃত হয়ে শহীদ হন তাঁদের একজন ছিলেন শিলালিপি পত্রিকার সম্পাদক সেলিনা পারভীন। আলবদর আল শামস বাহিনীর লোকেরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর এবং হত্যা করে নির্মমভাবে। সেলিনা পারভীনের অর্ধনগ্ন লাঞ্ছিত মৃতদেহের ছবি প্রকাশিত হয় পত্রিকায়। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম শহীদ কবি মেহেরুন্নিসা হানাদার বাহিনীর হাতে জীবন দেন ১৯৭১ সালের ২৭মার্চ। তাদের মিরপুরের বাড়িতে দুই ভাইসহ তাকে তার মায়ের সামনে হত্যা করা হয়। অত্যন্ত সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের মেয়ে মেহেরুন্নিসা তার লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার স্পৃহাকে মূর্ত করে তুলেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক নারী এবং বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত ছিলেন ডা. নুরুন্নাহার জহুর, মুশতারী শফি, বেগম নুরজাহান মোর্শেদ বেগম হোসনে বেগম। উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার বঙ্গানুবাদকৃত হ্যান্ডবিলটি পাঠ করে শোনান ঘোষক হোসেন আরা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ দুপুর দুটায়। ইংরেজীতে লেখা হ্যান্ডবিলটির বঙ্গানুবাদ করেন স্থানীয় চিকিৎসক ডা. আনোয়ার আলীর স্ত্রী ডা. মঞ্জুলা আনোয়ার বেগম মুশতারি শফি। যুদ্ধে স্বামী ও ভাইকে হারিয়ে ভারতের আগরতলায় যান এবং নানাভাবে নিজেকে মুক্ত করেন যুক্ত করেন যুদ্ধের কাজে।

তাঁর লেখা ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’ গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক ১৩৯৬ বাংলা সালের সেরা গ্রন্থের পুরস্কার লাভ করে।