২৭ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা

  • ফজলুল হক সৈকত

অল্প-বিস্তর গদ্য লিখলেও সিকদার আমিনুল হক (জন্ম : ৬ ডিসেম্বর ১৯৪২; মৃত্যু : ১৭ মে ২০০৩) মূলত কবি। যাপিত জীবন এবং অস্তিত্বের স্বল্প পরিসর প্রান্তরে তিনি কবিতার জন্য স্বতন্ত্র একটি জায়গা নির্মাণ করতে পেরেছেন। সমূহ নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতার আলোয় শোভিত করার প্রতি তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, সিকদার আমিনুল হক শিল্পের একটি সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল দীপ্তির দিঘিতে সাঁতার কেটেছেন কাব্য সাধনার প্রসন্ন প্রহরে। তাই আপাত অসম্ভবের বিরূপ জমিনে তিনি সম্ভাবনার উদার আকাশ অবলোকন করতেন প্রাতিস্বিক শৈল্পিক-বিলোড়ন বিভায়। কবিতা লেখার জন্য কাক্সিক্ষত নির্জনতার আক্ষেপ তাঁর চেতনায় ঘুরপাক খেত ক্রমাগত। যাবতীয় কোলাহল আর অগণন মানুষের বিবর্ণ স্বভাব তাঁকে বিষণœ-বিমর্ষ করতো সৃষ্টিশীলতায় ঘটাতো ব্যত্যয়। সমাজের নানান অনুষঙ্গ বর্ণন আর প্রতীক-নির্মিতি আমিনুলের কবিতার অনন্য ভ্রমণক্ষেত্র। তাঁর কবিতা কাব্যযাত্রার দীর্ঘ পরিসরঅভিজ্ঞানেরই নমিত নির্যাস।

সিকদারের কবিতায় পানশালার সবুজতা, নারীর উষ্ণতা-অবশতা, নৈরাশ্য-নৈঃসঙ্গ্য, অনাবিল আশাময়তার আলিঙ্গন আর পরাবাস্তব-পরিশীলন বৃত্তাবদ্ধঅভিন্ন আলোড়ন-আবিলতায় প্রকাশিত হয়ে ওঠে। যেমন ‘প্রতিদিন ঘুমের আগে’র কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি পাঠকের নজর কাড়ে। এখানে ‘রোজ রোজ মদ্যপান, অন্ধকার দেখা হয় নাই’, ‘মেয়েরা সবুজ থাকে বিছানার আগে’, ‘এসো মেয়ে স্নান করি, দেখে নেই চাষের জায়গা’ এবং ‘কমলা রঙের রোদে হেঁটে যাবে স্বদেশী সুন্দরী’ এইসব শব্দবন্ধে কবি মানবীয় অবচেতনসত্তার কেন্দ্রস্থিত থিতিয়েপড়া অনুচিন্তন প্রক্রিয়াকে সুতোবদ্ধ করতে পেরেছেন মননশীলতার মানানসই অভিনিবেশের চাতুর্যে।

সিকদার আমিনুল হক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আর মানবিক অস্থিরতায় বিচলিত হয়েছেন। তাঁর স্মৃতিতে ভাসতে থাকে শৈশবের নদী-নালা বালিহাঁস অতিক্রম করে বর্তমানতার ক্রমবর্ধমান ত্রাসবৃত্তি ভাবনার আকাশে যেন দ্রুত রাত্রি নামিয়ে আনে। আর তাই তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের দম্ভ ও অনাবিল প্রাণশক্তির প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়তে থাকেন তিনি ‘সব কি আমার জন্যে। বেসামাল নিসর্গের রূপ/কত আর নিতে পারি? স্বপ্নগ্রস্ত দেবতারুগুলি/ দেয় না বাঁচার নিরাপত্তা, ফলে নিরর্থক লোভে/ পাহাড়ে উঠেছি আমি মৃদু বাতাসের বহু আগে।’ (‘বিশ্বাস করি না’) মানুষে মানুষে বিভেদ, অবহেলা, প্রতিহিংসা সিকদারের কবিতা ক্যানভাসে উঠে আসে বিমর্ষতা অথবা ঝিমুনিঘেরা কার্নিশের কোল বেয়ে। ‘দিবাস্বপ্ন বাঁচার অভ্যাস’ জাতীয় অনুভূতিগুলো যেন থেঁতলে দুমড়ে পড়ে আছে সভ্যতার পথে। কবিতা তার সৌন্দর্য হারিয়ে হয়তো মেনে নেবে সমূহ জট-যন্ত্রণার জেলজর্জর উচ্ছলতা। খ্যাতিমান আর ক্ষমতাবানের দাপটে ভয়কাতর বিড়ালমুখো ভাবমূর্তিমুখর জনতা যেন অসহায়Ñ

একটি বিড়াল থাকে তার পাশাপাশি, কিন্তু ভয়ে

দাঁড়কাক দেখেও না, খুঁট খায় চুরি-করা

মাংসের হাড় কিংবা রুটি। বিড়ালটি খাদ্যাভাবে ভুগে

যদিও কঙ্কালসার, দাঁড়কাক করে না করুণা!

বেচারা তাকিয়ে দেখে, ব্যর্থ লেজ নাড়ায় অযথা!

দেখি আর ভাবি, প্রাণিকুলে আছে তবে দলাদলি?

(‘দুপুরের দাঁড়কাক’)

কবি আমিনুল দেখেছেন অ্যাম্বুলেন্স কিংবা দমকলগাড়ির হুইসেলঘণ্টা যানজটে জমে থাকা জনতার বুকে কোনো মমতা জাগ্রত করে না। মায়া-বর্জিত আপন স্বার্থ-আচ্ছাদিত মানুষ রাস্তা ধরে রাখে নিজ নিজ দখলে। অথচ আকাশে-শূন্যতায় অফুরান গতিপথ। অসহায় যাত্রাপথে সিগন্যালে আটকেপড়া সভ্যতার সহযাত্রীরা অবশতার গভীরে ডুবতে থাকে ক্ষিপ্রতায় অজান্তে। কেননা, আমাদের ‘উরু সামাজিক কার্পাসের নিচে গোপনে রক্ষিত...।’ পোশাকি আন্তরিকতায় ছেয়ে গেছে সমাজ। দারুণ মাতাল সুখে সবাই যেন উন্মাদ-প্রায়। সহযাত্রী কিংবা প্রতিসঙ্গীকে ‘মাছি’র মতো অবাঞ্ছিত-নোংরা ঠাউরে রাখি যেন আমরা। আর মিথ্যা শিল্প মুড়ি দিয়ে থাকি তাবৎ ভদ্রতার অন্তরালে। সিকদারের কবিতায় সাক্ষাৎ-প্রত্যাশী এক আমন্ত্রিত অতিথির যন্ত্রণা চিত্রিত হয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক প্রতিবেশের এক অতি-পরিচিত প্রসঙ্গের উপস্থাপনায় ‘...অপমান, এতো অপমান!/বাড়িতেই ছিলো, কিন্তু কাজের মেয়েটা বলে কি না/বাড়িতে নেই।... কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনলাম পিয়ানোর/শব্দ ভেতরের ঘরে। ... দেখি মোড়ে এক/দোকানির তরমুজে মাছি ওড়ে। আমি তার মাছি।’ (‘তরমুজের লোভে’)

‘কোকিলের ডাক শোনা আজকাল ভাগ্যের ব্যাপার।’ কবি ভাগ্যকে মান্য ভাবছেন, না কি শুভাশুভের অভাবগ্রস্ততার বিবর্ণতাকে স্পর্শ করছেন? মা-কে বলা কোনো এক কবির কথা থেকে সিকদারের ‘মা, তোমার ছেলে আজ কবি’ কবিতায় বিবৃত হয়েছে ওই বিবর্ণ-বিষণœ সময়ের প্রতিঘাত ‘তোমার বয়স্ক ছেলে আজও দয়ার ওপরে বাঁচে।’ তাই তিন শেষত পৌঁছেন, ক্ষমা-প্রার্থনার সিঁড়ি বেয়ে, মিথ্যা কষ্টের প্রান্তর অতিক্রম করে রাত্রি জমা পাহাড়ের পাদদেশে, যেখানে ‘শর্ত ছাড়া সবই ভালো’। অসহায়-বঞ্চিত মানুষের স্বপ্নের বারান্দায় রক্তমাখা ট্রাউজারে যারা পড়তে চায় সভ্যতার বিষ-শুভ্রতা, ‘নির্বিবাদে গরিব মেয়েদের বুকে হাত চালায় যখন তখন’, তাদের প্রতি প্রবল ঘৃণা জমিয়ে রেখেছিলেন সিকদার আমিনুল হকবুকের অতল গহীনে। ‘যাদের শরীরে কোনোদিন বডি লোশন, জেল কিংবা রূপটানের স্পর্শ পড়েনি’, তাদের জন্য মমতার মাটির প্রত্যাশায় তিনি ছিলেন অধীর। কেননা তিনি এও জানতেন ‘ক্রন্দনের সুখ থেকে ওরা বঞ্চিত করবে না আমার/ প্রতীক্ষারত মা ও পাথরের মতো স্তব্ধ/ বসে থাকা প্রেমিকাকে।’ (‘বঞ্চিত মানুষদের জন্যে কিছু লিখবো’)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-প্রাপ্তির পঞ্চাশ বছর পূর্তিলগ্নে আমিনুলের আর্তি জানান দেয় দেশমাতার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর অর্জিত স্বাধীনতার বেহাল রূপ সম্পর্কে। তিনি লেখেন ‘...আত্মত্যাগ ছায়া হয়ে জেগে থাকে।...নির্মূল হয় না কেন দালালেরা? রাতে ঝাউপাতা কেন ভয়ে থেমে যায়, মুদ্রের পরিচিত ঘামে।’ তিনি জানেন ‘সব কাজ বড় একপেশে, আর আমাদের চারপাশে অবিরাম স্থির অন্ধকার আরো গাঢ়তর হয়। শুধু ছত্রাকের ছড়াছড়ি। ‘নিরিবিলি ঘরে আসে কর্কশ কাকের ভাঙা ডাক, চৌবাচ্চার জলে মরা তিমিরের গন্ধ, প্রশ্রয় পায় না স্বপ্ন, অতএব সংকল্পের দম্ভ মরে যায় অচিরেই’। সিকদার আমিনুল হক ‘উৎপীড়িতের চিরকালের উত্তরণ’ আর বিশ্বাসের জয়ের উচ্ছ্বাসে সমূহ নেতিবাচককে উপড়ে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আর তাই আলোমুখী মানব-সভ্যতা নির্মাণ-প্রত্যাশী এই কবির কবিতায় ‘শাদা’ অনুষঙ্গের ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ ‘শাদা-পৃষ্ঠা কবিতার খাতা’, ‘শাদা ভেড়া’, ‘শাদা সেমিজ’, দুধ-শাদা পিয়েরে কার্ডিন শার্ট’ ‘শুভ্র ঘাড়ে’, ‘যাদের দাঁতের রঙ বেশ শাদা’, ‘শাদা বেডে’, ‘শাদা গেঞ্জি’। বর্তমান গ্রন্থের ‘আয়নায় নিজেকে দেখে’, ‘মানুষ, সুখ’, ‘আগন্তুক এখানে’, ‘যে সম্পর্ক কাঁদে ও কাঁদায়’ প্রভৃতি কবিতায়ও কবি অনায়াস বিবৃতিতে নির্মাণ করেছেন ‘স্বর্গের কুমারীর মতো মৃদু ও পবিত্র’ সভ্যতার মুখ। তিনি যেন নদী-দেখার সান্ত¡না ও সুখ ফিরিয়ে আনতে চান মানুষের বুকে।

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা যেন গল্পের মতো কথা বলে চলে। শব্দ আর বাক্যবদ্ধ নির্মতি লাভ করতে থাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কোনো জড়তা তাঁকে, কবিতাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। পাঠক ক্লান্তিহীন একটানা টানটান উত্তেজনা-আগ্রহ নিয়ে চোখ বুলাতে পারে তার কবিতার পাতায়। পরাবাস্তবতার হাওয়া সতর্কভাবে কাব্যকথায় উড়িয়ে দেয়া সিকদারের আর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। দৃষ্টান্তÑ

... রাত বারোটার পর

তোমাকে ব্যাকুল ডাকি স্মৃতি-কক্ষে। নগ্ন

কল্পনায় মনে হতো মৎস্য কন্যা, সমুদ্রের স্নান

মনে ক’রে কতদিন দেখেছি লুকিয়ে

হ্রদের পরীর মতো শাদা বুক। বালি চিহ্ন রেখে

এখন জোয়ার ক্লান্ত। জ্যোৎস্না নেই। তারা খুলে গ্যাছে।

নেরুদাকে খুব চাই, পাশে ট্রাউজার-পরা মেঘ

মায়াকোভস্কির মৃত্যু কার হাত ধরে এসেছিলো?

(‘তুমি যে বিপ্লব ভালোবাসতে’)

জীবনের ঊষালগ্নের প্রশান্তির গান আজ আর তার মনে পড়ে না খুব একটা। বিত্তশালীদের প্রতারণামুখর দিনযাপনের বিচিত্র গলিমুখ তিনি এক পরাবাস্তব টর্চের আলোয় দেখতে চান, দেখাতে চান‘যখন করছে ক্ষতি অপরের, শীতাতপ ঘরে/... যারা পচে যাবে/ সদিচ্ছার রৌদ্র ছাড়া। দিবারাত্র গনগনে ঘরে/ কোথায় অবৈধ নারী?...কেননা এখন শয্যা তার/ কফিনের কালো কাঠ; সেই আছে শুধু অনটনে; /গিন্নি কি মর্ত্যরে ছাত্রী, একা ঘরে কামশাস্ত্র পড়ে?’ ‘সার্কাস’ কবিতায় তাঁর তৈরি পরাবাস্তবতা আমাদের নজর কাড়ে‘সার্কাসের তাঁবুর দিকে যাচ্ছে ভিড়। রুগ্ন সিংহ, বাঘ, হাতি আর হান্টওয়ালির চ্যাপ্টা মুখ, সে-দিকেও কত না লোমশ অভিযান। গোল বৃত্তে মোটর সাইকেলের যুবক; তার আঁটো ট্রাউজার, ধবধবে শাদা গেঞ্জি, ছাব্বিশ বছরের এই অহঙ্কার; তাও লুফে নিচ্ছে রাত্রির কোলাহল।’ সিকদারের ‘কার হাত’, ‘তবে অবেলায়’, ‘ইতিহাসের অস্বচ্ছ রাস্তা’, ‘একদিন যে স্বপ্ন ছিলো’, ‘শক্ত হচ্ছে কফিনের কাঠ’ প্রভৃতি কবিতা পরাবাস্তবতার আলোয় স্নাত।

স্মৃতিঘন ভগ্নহৃদয়ে বসবাস আমাদের প্রায় নিত্যসঙ্গী। স্মৃতিবিমুখ অথবা স্মৃতিতে বিরক্ত মানুষ মিথ্যাচারের নিথর জগতেরই বাসিন্দা মাত্র। নৈঃসঙ্গ্যে আর অবসরে স্মৃতিই তো একমাত্র সঙ্গী। আমিনুলের আবিলতা-মাখা স্মৃতিলগ্নতা এক আলোময় আকাশ তৈরি করে ভাবনার বিশাল-বিস্তৃত প্রান্তরে। তিনি সেই ‘অস্তিত্বের গন্ধ’ এবং জড়তামাখা ‘স্বপ্ন আর মাদকতা’ কবিতার খাতার শূন্য পৃষ্ঠায় আঁকেন মুগ্ধতায় ‘...এই চুল নয় ততো ঘন/ যেখানে তোমার ঠোঁট দ্রুত হতো। তারপর আর/ ক্রীড়া নয়, আবিষ্কার। বিদ্যমান শুধু দুই দেহ; আদরে গলতে তুমি অসহায়, অথচ এখন/ শাদা চুল বরফের মতো ঠা-া।... রাত্রি আসে ঘরে ঘরে। রান্না হয় দুর্দান্ত সরবে/ আমার সম্বল শুধু নীলিমা সেনের কিছু গান!.../ সামান্য বাটির ভাত শেষ করি, ততক্ষণে আসে খর-দৃষ্টি মৃত্যুভয়; উটপাখি হয়ে বেঁচে থাকি। ঘরময় শূন্যতায়। কল্পনা-চোখে কদাচিৎ দেখি/ প্রভাতে শুকাচ্ছে চুল, গান গেয়ে দীর্ঘ বারান্দায়!’ (‘দুরন্ত শীত’) প্রতীক্ষার অশেষ প্রহরে আচ্ছন্ন না-পাওয়া কোনো আনন্দের জন্য কবির মন খারাপ হয়। তিনি ভাবতে থাকেন সেই সুখ-মাখা স্মৃতিমুখ। প্রার্থনাক্লান্ত অতীত ধরা পড়ে সিকদারের ‘সেটা কোন্ দিন’ কবিতায়। আর পরিবার-পরিজন ও প্রতিবেশঘেরা এক অনবদ্য স্মৃতিপাতা নির্মিতি পেয়েছে ‘অগ্রজের সেই অধিকার’ কবিতায়। স্মৃতিভারাক্রান্ত এই কবিকে তাই আজকাল মধুর কমলা-রঙের রোদ, হরিণ ছানার মতো চঞ্চল বাতাস আর মুগ্ধ করে না। তিনি ডুবে থাকেন বিবর্ণ সময়ের অতল আঁধারে।

কবিতা লিখে বৈষয়িক অর্থে কোনো সাফল্য নেই এই বোধ ও যন্ত্রণা সিকদার আমিনুল হকের কবিতার আরেকটি অনুষঙ্গ। তাঁর অনুভব‘রোগা ঈগলের সাথে চাঁদের সদ্ভাব বেশি।... কিছুকাল থাকে আধুনিক ইচ্ছা, রিরংসা, ত্রাস; কবিদের বিমর্ষের রীতি।’ কবিদের এই সাফল্যহীনতার, স্বীকৃতি-অপ্রাপ্তির যাতনাকে তিনি অন্যভাবে কবিতারই দুঃসময় মনে করেছেন। এর ব্যতিক্রম যে নেই, তাও নয়। ‘চলো যাই জয়ের বাড়িটা দেখে আসি’ কবিতায় কবিদের নির্লিপ্ত জীবনের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে-থাকা বৈষয়িক কবিদের সাফল্য অঙ্কন করেছেন সিকদার। তার এ বোধের প্রকাশ ‘... চার কামরার বাড়ি! নির্মাণ করেছো/ ছায়া, পেছনের রোদ; স্তন ভালোভাবে বসে যায়/ এ-রকম জানালার গ্রিল! তবে পুষ্করিণী নাই।/ ঘাট নাই। ভেজা শাড়ি। তাতে কি? বাড়ি তো! কতোজন/ বাড়ি পায় আজকাল?’ তবে তিনি ইতিবাচকতার নরম অনুভূতিকেই স্পর্শ করেন শেষত, পরম সুখে। চারদিকে যেন বসন্তের প্রবল বাতাস কবিতার বিশাল ঠা-া-অন্ধ ক্ষেত্রকে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে যাবতীয় পাথর-স্তব্ধতার প্রতিকূলেÑ

জয় কবিতার। অন্ধকারে নারী, এখন তোমারও।

সমস্ত কিচুতে আজ প্রতিভার জয় খুঁজে পাই;

মাংসে, গন্ধে, যৌবনের সব পথে।...

পাঠযোগ্য প্রতি পৃষ্ঠা, সবিস্তার, মৌন, নাব্য আর অনর্গল!

(‘ওরা জানতেই পারবে না’)

আবাল্য রুগ্ন এই কবির চেতনায় শিকড় গেড়েছিল মৃত্যুচিন্তা। তাই তাঁর কবিতার বিচিত্র-পরিসরে প্রবেশ করেছে ‘মৃত্যু’ অনুষঙ্গ প্রসঙ্গ। এ গন্থের ‘আমি যাই’ কবিতাটি পৃথিবীর আলো-বাতাস যাবতীয় প্রশান্তি-অশান্তি ছেড়ে যাবার প্রস্তুতির ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আবিলতায় আবিষ্ট। যাপিত জীবনের প্রসন্ন ভোর, বিষণœ দুপুর, শৈশব- কৈশোরের তাড়া করা কথামালা, প্রিয়জনদের আলিঙ্গন, সাহিত্য, আড্ডা, প্রকৃতির অনিন্দ্য শোভা, নারীর মুখ, শহরের সমূহ আকর্ষণ-বিকর্ষণ, হাসপাতালের অলি-গলি, বিউটি পার্লার, লেখার টেবিল কবিতার খাতা, পানপাত্র, সেবাদাত্রীর রাত্রি জাগরণ, বইয়ের বহর, দেশমাতার প্রবল টান, বণিক-স্বভাব সভ্যতা, চাটুকারের কোলাহল, কোদালের দাঁতে নিবিড় বসে থাকা গ্রামসন্ধ্যা, শ্রাবণের মধ্যরাতএইসব ছেড়ে ‘মৃত্যুর অধিক মৃত্যু’কে মেনে নিতে কবির প্রবল প্রস্তুতির দীর্ঘ বর্ণনা তার মৃত্যুকাতর শীতল অনুভূতিকে পাঠকের সামনে হাজির করে ফ্রেমে-আঁটা ছবির মতো। মৃত্যু সত্য কিন্তু কে-ই বা পারে একে সহজে বরণ করতে মৃত্যুর অমানিশা আর! জীবনের উজ্জ্বলতার দ্বন্দ্বের যে গল্পগল্পের শিহরণ, তা আলোড়িত করেছে সিকদার আমিনুল হককে। তাঁর ভাবনায় কেবলই মৃত্যুগন্ধী কবিতা লতিয়ে ওঠে ‘সকলের ভাবনায় মৃত্যুই নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত/ নিথর রাতেও তার প্রতিশোধস্পৃহা ভয়ংকর;/ মৃত্যু আসে ভিন্ন নামে। যতই করি না রাগ-দ্বেষ/মৃত্যু তখনও বসে সৌন্দর্যের মগডালে।’ (‘মৃত্যুর বয়সী শিকারীরা’/ ‘এক রাত্রি এক ঋতু’) কবি সিকদারের কবিতায় মৃত্যুর অনুঘটক-অন্বেষণে পাওয়া যাবে জরা আর মরাবোধের আখ্যান। মৃত্যুর অভ্যন্তরে অন্ধকারে যাত্রার চমৎকার আয়োজন তাঁর কবিতায় সাফল্যের সুতোয় গিঁটবদ্ধ হয়েছে। হাসপাতাল, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স, কেবিন প্রভৃতি প্রসঙ্গ তার কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে। মৃত্যু-চিন্তা আর সৌন্দর্য-ভাবনার সমান্তরাল পরিভ্রমণ তাঁর কবিতার ব্যতিক্রমী আভাস। আর সেই অনুভব-প্রকাশের সময় তিনি ‘স্বর্গ’, ‘মহিলার চামড়া’, ‘আত্মহত্যা’, ইত্যাদি অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন কোনো কোনো কবিতা-কথায়। জীবনানন্দ তাঁর প্রিয় কবিদের অন্যতম ছিলেন বলেই হয়তো জীবনানন্দীয় মৃত্যু-ভাবনাবিশ্ব তাকে অনুপ্রাণিত বা প্রভাবিত করেছে। যেমন, সিকদার লেখেন ‘লাশকাটা ঘর/ আমারে ডাকিল সবে।’, ‘আমার মৃত্যুর পরে জড়ো হবে, জানি না সত্যিই/ জড়ো হবে কি না।’ মৃত্যুকাতর কবি সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় আমরা দায়-এড়ানো দায়িত্বকাতর এক শিল্পীকে পাই ‘শীত’ নামক জড়তা আর বিষণœতার মোড়কে। কয়েকটি দৃষ্টান্তÑ

১. দুর্লভ মৃত্যুকে জানো

সময়ের শূন্যতাকে; সব রাস্তা, বৃক্ষসারি, রাজধানী

হে নৃপতিরা, প্রত্যূষে ওঠার আগে

দেখিবে, তোমাদেরও চাকরি নাই দুপুরের আগে।

(‘নদীতে অস্ট্রিচ জাহাজে’)

২. কী যে ভয়ংকর, মৃতের সঙ্গে অমীমাংসিত

এই সহবাসের দৃশ্য ... (‘কুয়াকাটার সূর্যাস্ত’)

৩. ...অনেক অন্ধকার এলে এতে অবসাদগ্রস্ত লাগে

আজকাল! আমি নিভে যাই। নারী নিভে যায়। আর কোনো স্তন

থাকে না ভেতরের নরম অংশে। (‘দুশ্চিন্তা সকল মানুষের জন্যে’)

শব্দ-ভাবনায় সিকদার আমিনুল হক বরাবরই সাবধানী। তাঁর শব্দ সাজানোর মেধাবী-কৌশল আমাদের মুগ্ধ করে। তাঁর কবিতা থেকে কতগুলো শব্দ কিংবা শব্দগুচ্ছ আমরা এখানে তুলে ধরছি অভিশপ্ত ঘ্রাণ, অবসন্ন ধর্মাক্ত বন্দরে, নদীর লজ্জা নেই, ট্রাউজার-পরা মেঘ, রক্তের দস্যুতা, প্রভুভক্ত কুকুরের ছায়া, রুগ্নতার যতœ, বউকে গণিকা করে, চামড়ার রূপ, সুনীল মাছ, নেশাগ্রস্ত গোরখোদকের মুখ, কামমত্ত চুল, সোনার-পিত্তল মূর্তি, গনগনে মরুণীর রোদে, প্রমোদ জাহাজ, বিধবার কোমলতা, মরাশরতের শেষরাতে, চৌকো রুমালের অংশ, রক্ষিতার রক্তও লাল, কিশোরীর অসতর্ক ঘুম, নিস্তব্ধ বুক, রক্তগন্ধ ডলারের গতি, কম-বয়সী নারীর দাঁত এসব সাজানো-শব্দ জীবন-জগত-বাস্তবতা সম্পর্কে কবির বোধকে প্রকাশ করেহ্যারিকেনের আলোয় শয়নগৃহের মুগ্ধ-আবেশে।

সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় ‘অভিশপ্ত জাতি’র ‘নির্বিকার মাস্তি’ যেন সাড়াহীন মানুষের ‘নিচু কণ্ঠে’ ‘নিরর্থক লোভে’র প্রতিকূলে নির্মাণ করে মৃদু বাতাসের স্বপ্নগ্রস্ত দেবদারু। তাঁর কবিতায় পরিকল্পনা ও পরিচর্যার ছাপ আছে। ভাবনা-প্রকাশক শব্দমালাকে তিনি তাৎক্ষণিক আবেগে নয়; প্রকাশ করেন বিকাশমান কাঠামোর পরিণতির পোশাকে। মেদহীনতা তাঁর কাব্যভাষার স্বকীয়তা। চরিত্রগুলো যেন কোলাহলমুক্ত নির্জনতার নির্বাক বাসিন্দা। আর বিষয় ও উপাদান চলমান সমাজ-বাস্তবতার স্বাভাবিক গতিতে বইতে-থাকা অকৃত্রিম দৃশ্যাবলী। জাতীয় এবং বৈশ্বিক প্রসঙ্গ এবং অনুষঙ্গ তাঁর কবিতার শরীরকে স্ফীত করেছে, করেছে মজবুতও। কবিতা-ভাবনা, নারী ও মোহময়তা, সংসার, সমাজ, শিল্পীর ভুবন, মৃত্যু-চিন্তা আর ক্ষোভমিশ্রিত বিষণœতা তাঁর কবিতায় অবয়ব লাভ করেছে নিরীক্ষা-প্রবণ প্রবল প্রেরণা থেকে। সিকদারের কবিতায় আছে আত্মবিশ্বাসের অশেষ উপাদান। বসন্তের বিপুল ইচ্ছা, মলিন বিকেলের চকচকে বালু, সমুদ্রের ধ্বনি, স্বাতী নক্ষত্র, প্রিয় উত্তেজনা আর সব সম্ভাবনার অতিশক্তি তাঁর কাব্যযাত্রার অফুরান আবেদন।

নির্বাচিত সংবাদ