২২ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান

  • জাহাঙ্গীর আলম সরকার

১৯৭১ সাল বাংলাদেশে যখন যুদ্ধ চলছিল তখন পড়শি দেশ হিসেবে ভারত ও দেশটির সাধারণ মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতের গণমানুষের সহযোগিতার সেই ইতিহাস তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের বটে। প্রায় এক কোটি মানুষ দেশান্তরিত হয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। শুধু তাই নয় ভারত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়ে আরেক ভূখ-ের মানুষের স্বাধীনতার রক্তাক্ত যুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম ও মেঘালয়ের মাটি ও মানুষ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। ভারত সরকার একদিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন শরণার্থীদের, অন্যদিকে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানগুলো পরিণত হয়েছিল মুক্তিফৌজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। এভাবেই একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখতে শুরু করে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত পৃথিবীর মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সীমান্ত। বর্বর পাকিস্তানী সেনা অভিযানে দেশত্যাগীদের সিংহভাগ ঢুকে পড়ে ভারতে। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বিভিন্ন রাজ্যে সর্বমোট ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন শরণার্থী প্রবেশ করেন। বিপুল এই ছিন্নমূল মানুষের দায়িত্ব নিতে হয় ভারত সরকারকে। ভারতের সাধারণ মানুষ ও সরকারের জন্য এটা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ ২৩ বছরের সামরিক এবং ধর্মতান্ত্রিক নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে বাঙালী জনতার সংগ্রাম ঘটে একাত্তর সালে। অনিবার্যভাবে শুরু হয় ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ধ্বংসযজ্ঞ ও লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ। একই সঙ্গে একাত্তর সাল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মানুষের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। মুক্তিযুদ্ধের সকল কর্মকা- যদিও পরিচালিত হয়েছে পূর্ববঙ্গ, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মাটিতে, তথাপি যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে সীমান্তবর্তী ভারতের ভূখ-ে, সেখানকার সরকার ও সকল স্তরের মানুষের সার্বিক সহযোগিতায়। পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও বর্বর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের মাটিতে, যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সর্বাধিক শরণার্থী বিপর্যয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাবর্তে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার এবং সেই সঙ্গে দেশটির সকল স্তরের মানুষ ও সশস্ত্র বাহিনীর অবদান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর দমননীতির বিরুদ্ধে মুক্তিপাগল জনতার মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে নিত্যই মিছিল, মিটিংয়ে মুখর ছিল পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য। শুধু তাই নয়; বরং বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবিতেও ভারতের মানুষজন সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিল। প্রতিদিন দলে দলে নারী-পুরুষ কেউ বা মাথায় একটি পুঁটলি নিয়ে শরণার্থী হয়ে ভারতে পারি দিয়েছিলেন। এসব মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও অন্নের সংস্থান করার বিষয়টি ছিল রীতিমতো একটি চ্যালেঞ্জ। গড়ে প্রতিদিন চল্লিশ হাজার শরণার্থী প্রবেশ করেছে ভারতে। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১৬ মে, ১৯৭১ সালে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে নেমে সেখান থেকে হলদিবাড়ি ও দেওয়ানগঞ্জ শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। তিনি শরণার্থীদের বলেনে যে, ভারত গরিব দেশ এবং ভারতের লোকেরাও গরিব; তবুও ভারত সাধ্যমতো এই শরণার্থীদের সেবা করবে। তৎকালে হলদিবাড়ি শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী ওই কথাগুলো উচ্চারণ করেন। শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী খুব সংক্ষিপ্ত আকারে বক্তৃতা করেন। কিন্তু তাঁর বক্তৃতায় কোন বাহুল্যতা ছিল না। তিনি শরণার্থীদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেন না যে, তারা ভারতের বহু সমস্যার মধ্যে আর একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছেন; তবুও ভারত এটাকে আপনজনের ব্যাপার বলে মনে করছে।

মার্কিন সিনেটর এ্যাডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর ওয়াশিংটনে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন যে, ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৩০০ শিশু মারা যাচ্ছে। তিনি ছিলেন সিনেটের শরণার্থী সংক্রান্ত জুডিশিয়ারি সাব-কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, নতুন বৈদেশিক সাহায্য বিলে কংগ্রেস যদি কোন অর্থ মঞ্জুর না করে, তবে তিনি শরণার্থীদের জন্য ২৫ কোটি ডলার মঞ্জুরির জন্য একটি বিল পেশ করবেন। শরণার্থী শিবিরে বিবর্ণমুখ দেখে ভারতের সাধারণ মানুষেরা চুপ করে বসে থাকেনি; বরং যে যার অবস্থান থেকে সর্বত্রভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। কর্মীরা প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবির ও শরণার্থী শিবিরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট একাকার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষগুলো ত্রাণসামগ্রী, কাপড় ও চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু করেন। সুনামির ঢেউয়ের মতোই সাধারণ মানুষের স্রোত পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়লেও সেখানকার অধিবাসীরা হাল ছেড়ে দেয়নি। সার্বিক অবস্থা দেখে শরণার্থী সাহায্যে রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্ট শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য উদাত্ত আহ্বান করেন।

একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানী ঘাতক সামরিক সরকার, অন্যদিকে মুক্তিকামী জনতা। যাই হোক, ভারতের সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র। কেউ কেউ ডাক্তারের পাশে থেকে শরণার্থীদের সেবা-শুশ্রƒষায় নিয়োজিত হয়ে যায়। এভাবেই কেউ ধাত্রী প্রশিক্ষণ, নার্স প্রশিক্ষণ নিয়ে শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছেন অবিরত। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মাস কয়েকের মধ্যে এ সকল অঞ্চলে হাজার হাজার শরণার্থী এসে অবস্থান করলে এক অমানবিক অবস্থার জন্ম নেয়। উল্লিখিত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। বসবাসের স্থান দেয়ার পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একাত্তরে ভারতে যারা শরণার্থী শিবিরে দিনভর কাজ করতেন। সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একাত্তর সালে ভারত পরিণত হয়েছিল হাজার হাজার শরণার্থীদের শেষ আশ্রয়স্থল। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি ধনী, গরিব ও জাতি-ধর্মনির্বিশেষে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। এ অবদান নগণ্য নয়; বরং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য।

একাত্তরে ভারত আভাস দিয়েছিল যে, সীমান্তের ওপারের মানুষ এপাড়ের মানুষগুলোর সঙ্গে একাত্ম। এ আভাস মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। ভারতের মানুষ বিভিন্ন রসদ জোগান দিয়েছিল সেটি শুধু মুক্তিসেনাদের উৎসাহিত করেনি বরং তাদের বাহুতে নতুন করে বল সংযোজিত হয়েছিল। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত রসদ পাঠানো হয়েছিল। ভারতের শরণার্থী শিবিরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, আহতদের রক্তদানের ব্যবস্থা করতে কোনো প্রকার কাল বিলম্ব করা হয়নি।

শুরুর দিকে একটু কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে শরণার্থীদের জন্য সুসময় আসতে থাকে। প্রতিটি শরণার্থীকে কলেরা ভ্যাকসিন, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট, দুধ এবং সবচেয়ে বড়ো যেটা দু’বেলা পেটপুরে ভাতের জোগান দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের সর্বস্তরের মানুষ তথা রাজনীতিবিদ, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, গৃহিনী, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ শ্রমজীবী যারা ইতিহাসের যুগ-সন্ধিক্ষণে নিজেদের আবেগ ও যুক্তিতে বরণ করে নিয়েছিলেন এক কোটি শরনার্থী, একাত্ম হয়েছিলেন পরম বন্ধু হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাতারে। নিজেদের দেশ থেকে বিতারিত হয়ে আসা বিবর্ণ মুখগুলোর জন্য ভারতের সাধারণ মানুষের ভালবাসা ছিল সীমাহীন। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে বাংলাদেশের মাটি, রচিত হয়েছে আরেক অমচোনীয় ইতিহাস। এসব ঘটনাবর্তে মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের সকল স্তরের মানুষের অবদান বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কখনও ওষুধ, কখনও খাদ্য কিংবা কখনও সেবার মাধ্যমে বুকভরা ভালবাসা দিয়ে ভারতের মানুষ যে ঋণের জালে আবদ্ধ করেছে, তা বোধকরি কোন দিন ভুলতে পারবে না বাংলাদেশের মানুষ।

লেখক : আইনজীবী

[email protected]

নির্বাচিত সংবাদ