২৮ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কাঠগড়ায় মিয়ানমার

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে রোহিঙ্গাদের প্রতি অমানবিক নৃশংসতার বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। মামলাটি করা হয়েছে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে। হেগ শহরের ‘পিস প্যালেস’ নামে সমধিক খ্যাত শান্তির প্রাসাদে মিয়ানমারের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ানো গাম্বিয়া এই মামলাটির পক্ষে সওয়াল জবাব প্রদান করে নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আইনী লড়াইয়ে নেমেছে। আর শান্তির জন্য নোবেল পাওয়া মিয়ানমারের এক সময়ের কথিত মানবতাবাদী রাজনীতিবিদ আউং সান সুচি তার সামরিক সরকারের দুঃশাসনের পক্ষে লড়ছেন, এটাই ট্র্যাজেডি। রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন, গণহত্যা, ধর্ষণ আন্তর্জাতিক সালিশীর কতখানি পরিপন্থী সেটা যাচাই-বাছাইয়ের লক্ষ্যে এই বিচারিক আদালতে বাদী-বিবাদী মুখোমুখি। মামলাটির গুরুত্ব এবং তাৎপর্য আন্তর্জাতিক বলয়ের প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সহমর্মিতার এক অনবদ্য নজির। গাম্বিয়া বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী কোন রাষ্ট্র নয়। সেখানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি আমলে নেয়ার ব্যাপারটা গাম্বিয়ার একক কৃতিত্ব। এতে অবশ্য সমর্থন দিয়েছে ওআইসি। গাম্বিয়া বাদী হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তা যেমন মনুষ্যত্বের অপার শক্তি, পাশাপাশি অত্যাচার আর সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দীপ্ত প্রতিবাদও।

২০১৮ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশ হতে বিতাড়িত, গৃহচ্যুত রোহিঙ্গারা যেভাবে প্রাণভয়ে এবং সম্মান বাঁচাতে জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তাও এক নির্মম পাশবিকতার কলঙ্কিত অধ্যায়। লাখ লাখ রোহিঙ্গার সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটে। বাংলাদেশ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এমন মানবতা বিবর্জিত দুর্দশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও মিয়ানমার নির্বিকার ও নিরুদ্বেগ। কোনভাবে এমন অত্যাচার আর বর্বরোচিত জঘন্য কর্মকা-ের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র সুরাহার মনোবৃত্তি নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই এমন অমার্জনীয় অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্বসভায় অভিযোগ করতে হয়েছিল। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিয়ে এমন অনাকাক্সিক্ষত দুর্যোগ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামলানোর প্রচেষ্টা যেমন নিজে করেছেন, পাশাপাশি সারা দুনিয়ায় এর যথার্থ প্রতিকার চেয়ে আশু সমাধানের আহ্বানও জানিয়েছেন। ওআইসি সম্মেলনেও এর যৌক্তিক সুরাহা চেয়ে অমানবিক নৃশংসতার বিরুদ্ধে আপীল করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আবেদন-নিবেদনে বিশ্ব সভায় এর বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠলেও বিচারিক প্রক্রিয়া পর্যন্ত সমস্যাটি গড়ায়নি। আর এদিকে এই রোহিঙ্গাদের মানবিক দায়বদ্ধতায় আশ্রয় প্রদান থেকে শুরু করে সব ধরনের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বসভায় অভিষিক্ত করা হয় মানবতার জননী হিসেবে।

গাম্বিয়ার পক্ষে এই মামলার প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির এ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তাম্বাদু। তিন দিনব্যাপী এই মামলার শুনানি শুরু হয় ১০ ডিসেম্বরে। গাম্বিয়া এবং মিয়ানমার পারস্পরিক যুক্তিতর্কের মাধ্যমে শুনানির সর্বশেষ পর্যায়ে তাদের মতামত তুলে ধরবে। বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস ও কানাডা এই বিচারিক আদালতে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। এই মামলার রায় যা হবে তাতে আপীল করার কোন সুযোগ না থাকলেও রায় প্রদানে কতখানি দ্রুততার সঙ্গে আদালত এগিয়ে যাবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে যথার্থ আইনী লড়াইয়ে মানবিক মূল্যবোধের ওপর সহিংস আক্রমণের বিরুদ্ধে যৌক্তিক রায় যেন নির্যাতিতদের পক্ষে এবং অশুভ শক্তির বিপক্ষে যায়, এমন প্রত্যাশা সমগ্র বিশ্ববাসীর।