২৬ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভোজ্যতেল ও চিনির আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব

ভোজ্যতেল ও চিনির আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ আগামী রমজান মাস সামনে রেখে দাম নিয়ন্ত্রণে ভোজ্যতেল ও চিনির আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে। অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতারোধ ও ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে শীঘ্রই এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম কমানো হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। অন্যথায় দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ট্যারিফ কমিশনে আবেদন করা হয়েছে। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে ইতোমধ্যে লিটারপ্রতি ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে ৯-১১ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে চিনির দামও কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে গেছে খুচরা বাজারে।

জানা গেছে, দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত ও আয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এসেছে। খাদ্যে ভোজ্যতেল ও চিনির ব্যবহার বেড়েছে। কয়েকটি নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, প্রতিবছর বছর দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ টন এবং ২৪ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। তবে ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেল ও সাড়ে ১৭ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। চাহিদা মেটাতে ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানি করা হয়ে থাকে। আমদানির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। শুধু তাই নয়, ভোজ্যতেল ও চিনির একটি বড় অংশ ব্যবহার হয়ে থাকে রমজান মাসে। ইফতার সামগ্রী তৈরিতে ভোজ্যতেল ও চিনির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ওই সময় অতিরিক্ত ২ লাখ টন করে ভোজ্যতেল ও চিনির চাহিদা তৈরি হয়।

জানা গেছে, পুরোপুরি আমদানি নির্ভর হওয়ায় রাজস্ব আয় বাড়াতে চলতি বাজেটে ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানিতে শুল্ক আরোপ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা হচ্ছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু সরকারের চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন আখ থেকে যে চিনি উৎপাদন করছে তা ভর্তুকি দিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিবছর এখাতে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এ কারণে চিনি উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি বেসরকারীখাতে আখ উৎপাদনের পরিমাণ কমে গেছে। এ অবস্থায় ভোজ্যতেল ও চিনির দাম নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রায়শই কারসাজির সুযোগ গ্রহণ করে। এই দুটো পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সম্প্রতি পেঁয়াজের অতিরিক্ত দাম ভুগিয়েছে ভোক্তাদের। এখন ভর্তুকি মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করে বাজার সামাল দিতে হচ্ছে। রমজান মাস সামনে রেখে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন জনকণ্ঠকে বলেন, ভোজ্যতেল ও চিনির দাম আর যাতে না বাড়ে সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। সামনে রমজান মাস ওই সময় বাজার স্বাভাবিক রাখতে সব রকম উদ্যোগ সরকারের রয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের এই দাবি কতটুকু যৌক্তিক সে বিষয়ে সমীক্ষা করছে ট্যারিফ কমিশন। শুল্ক আরোপের কারণে যদি দাম বাড়ে সেক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তা প্রত্যাহার কিংবা সমন্বয়ের জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর পক্ষে নয়।

জানা গেছে, রোজার আগে ভোজ্যতেল ও চিনির ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য ইতোমধ্যে এনবিআরকে অনুরোধ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়েল পক্ষ থেকে একাধিকবার এ বিষয়টি নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগামী সপ্তায় আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে, রাষ্ট্রীয় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, বর্তমান প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন ৯১-৯৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যা গত একমাসে দাম বৃদ্ধির হার প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত। এক মাসে ৫ শতাংশ দাম বেড়ে পাঁচলিটার বোতল সয়াবিন ৪৭০-৫১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পামওয়েল খোলা তেলের। দাম বেড়ে প্রতিলিটার পামওয়েল লুজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮২ টাকায় এবং এক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ। এছাড়া পামওয়েল সুপার ৮৬-৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতিলিটার। একমাসে দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত। যদিও বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেলে। একই অবস্থা বিরাজ করছে চিনির ক্ষেত্রেও। প্রতিকেজি খোলা চিনি ৬৩-৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসে দাম বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশ। এছাড়া সরকারী লাল চিনির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭৫ টাকায়। গত একমাস ধরে বাজারে চিনির দাম বাড়ছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বাজেটে অপরিশোধিত চিনির টনপ্রতি আমদানি শুল্ক ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করা হয়। আবার নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ১০ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ৩০ শতাংশ। পরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক দেড় হাজার টাকা বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের আগস্টে চিনি আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য (ট্যারিফ ভ্যালু) টনপ্রতি ৩২০ ডলার নির্ধারণ করে এর ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরে ডিসেম্বরে ট্যারিফ ভ্যালু বাড়িয়ে টনপ্রতি ৩৫০ ডলার করা হয়। আগে থেকে প্রতিটন চিনিতে আমদানি শুল্ক ২ হাজার টাকা ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক-ভ্যাট) ছিল ১৫ শতাংশ। আমদানিকারকদের দাবি, এর বাইরেও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর (এটি) আরোপ করা হয়েছে নতুন বাজেটে, যা প্রয় সব পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এছাড়া চলতি বাজেটে ভোজ্যতেলের ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা নেয়া হয়। এর আগে পরিশোধনকারীরা তিন পর্যায়ে ৫ শতাংশ করে ভ্যাট আমদানি পর্যায়ে দিতেন। তাদের জন্য এ বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন তিন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। যদিও রেয়াত সুবিধা থাকবে। এতে ভোজ্যতেলের ওপর করভার তিন টাকার মতো বেড়েছে বলে জানা গেছে।

এসব কারণে রোজার আগে দাম নিয়ন্ত্রণে ভোজ্যতেল ও চিনির ওপর থেকে শুল্ক কমানোর কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, রোজা সামনে রেখে ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রাখতে আরও ২ লাখ টন আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব পেঁয়াজ আমদানি হবে মিসর, তুরস্ক, মিয়ানমার ও চীন থেকে। এছাড়া দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে দেশী মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে উঠলেও সেভাবে দাম কমছে না। বাজারে প্রতিকেজি মুড়িকাটা নতুন পেঁয়াজ ১৩৫-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৫৫-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে।

নির্বাচিত সংবাদ