২৬ জানুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্যামেরার চোখে ইতিহাস ধরেছিলেন তারা-রশীদ তালুকদার ও অন্যান্য

  • পঞ্চাশের প্রাক্কালে স্মরণ;###;মিলু শামস

উত্তাল ঊনসত্তরের রাস্তায় খালি গায়ে, খালি পায়ে হাত উঁচিয়ে সেøাগান দিচ্ছে এক শিশু, পেছনে বিক্ষুব্ধ মানুষ। যেন মিছিলে লিড দেয়া ওই শিশুর নেতৃত্বে বঞ্চিত মানুষেরা এগিয়ে চলছে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

ওই ছবি তাকে বানিয়েছিল রশীদ তালুকদার। তার জন্ম বিশ্ব রাজনীতির এক ঐতিহাসিক সময়ে। উনিশ শ’ ঊনচল্লিশ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে। পৃথিবীতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ হচ্ছে। অবিভক্ত ভারত চলছে বিভক্তির পথে। সাতচল্লিশ থেকে ঊনসত্তর-এ বিশাল সময়ে এ অঞ্চলে ঘটেছে অনেক কিছু। কৃষক বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন পেরিয়ে ষাট দশক। স্বাধীনতা ও মুক্তির দাবিতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জ পুঞ্জ ক্ষোভ জমা হয়ে বিস্ফোরণ ঘটে দশকের শেষ বছরে। সারাদেশ যেন জেগে উঠেছিল নতুন গতিপথে বাঁক নিতে। সেই উত্তাল সময়ে রশীদ তালুকদারের কর্মজীবন শুরু। বাষট্টিতে দৈনিক সংবাদের আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরুর আগে তিন বছর ফটো টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টে। তারপর টানা তেরো বছর সংবাদে। আর একের পর এক ক্যামেরাবন্দী করেছেন ঐতিহাসিক সব মুহূর্ত। ছয় দফা থেকে একাত্তর উল্লেখযোগ্য সব ঘটনা বাঁধা পড়েছে তাঁর লেন্সে। একাত্তরে ক্যামেরাকে রাইফেল বানিয়ে এ দেশের যে ক’জন যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টেশনে ছুটেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের একজন। মার্চ মাসের দুই তারিখে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত হওয়া ও প্রতিরোধ প্রস্তুতির নানা মুহূর্তের দৃশ্য তাঁর ক্যামেরায় ইতিহাস হয়ে আছে। এ দেশের নারীদের সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ প্রস্তুতির সাক্ষীও তার ক্যামেরা। যেন ঐতিহাসিক ঘটনার এক সিরিজ দলিল একের পর এক গেঁথেছেন বিস্ময়কর নৈপুণ্যে। যুদ্ধ শেষে আরেক বাংলাদেশের চিত্র দেখান তিনি। বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের গলে যাওয়া লাশ। যে দৃশ্যে সমস্ত মানবিক অনুভূতি শিউরে ওঠে আজও, যা দেখে আজকের কিশোরও বর্বর পাকিস্তানী সেনাদের প্রতি ঘৃণায় থুতু ছিটায়। পেছন ফিরে জানতে চায় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস। এই ঘৃণা, এই জানার আকুলতা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন রশীদ তালুকদার। তার ক্যামেরায় চোখ রেখে ইতিহাসের স্থিরচিত্র দেখে বাংলাদেশ।

ভিনদেশী সাংবাদিক লিয়ারলেভিনের ক্যামেরাও মুক্তিযুদ্ধের এক চলমান ইতিহাস দেখিয়েছে আমাদের। প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ যা পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে ঘরে। আন্দোলন সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজ যে সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা, অনেকে বলেন এ বড় অস্থির সময়। স্থবির হয়ে আছে সবকিছু। আসলেই কি তাই? হয়ত এ আরেক বাঁক নেয়ার কাল। চল্লিœশ বছরে পৃথিবী বদলেছে অনেক। সামনে এগিয়েছে। যারা যুদ্ধ করেছেন বা সে সময়ে জন্মেছেন তাদের থেকে এখনকার প্রজন্মের ব্যবধান অনেক। নতুন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। বেড়ে উঠছে। ইতিহাসের বিশাল ক্যানভাসে ফেলে আসা দেশ ও সময়কে মূল্যায়ন করছে তারা। সংগ্রামী অতীতের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আবেগে সেভাবে আক্রান্ত না হয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখছে নিজের দেশ। এ দেখার সামগ্রিক রূপ হয়ত এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এর ভিন্নতর মাত্রা ক্রমশ স্পষ্ট হবে নিশ্চয়ই।

আবেগেরও পরম্পরা তৈরি হয়। যে আবেগ নিয়ে রশীদ তালুকদার ঊনসত্তরের ইতিহাস ক্যামেরাবন্দী করেন সে আবেগ নিয়ে তার পূর্বসূরিরা বায়ান্নকে ধরেন। অগ্রজ আমানুল হকের ক্যামেরায় অমর হয়ে আছে আরেক সাদা-কালো আলোকচিত্র। ভাষা আন্দোলনের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ রফিকের লাশ। খুলি ফেটে বেরিয়ে আসছে মগজ-এ চিত্র ধারণের অভিযোগে সরকারী চাকরি হারিয়েছিলেন আমানুল। কিছুদিন পালিয়ে থেকে চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। সেখানে সত্যজিৎ রায়ের সান্নিধ্যে থেকে দুর্লভ কিছু আলোকচিত্র ধারণ করেন। সেও এক অসাধারণ ডকুমেন্টেশন। সবার অবদান কি মূল্যায়ন পেয়েছে রাষ্ট্রের কাছে? কারও কাজ পেয়েছে। কেউ পেতে পেতে পৌঁছে গেছেন মৃত্যু উপত্যকার প্রায় প্রান্তে। কেউ বঞ্চিতই থেকেছেন। জীবনের দীর্ঘপথ পেরিয়ে আমানুল একুশে পদক পেয়েছিলেন দু’হাজার এগারয়। রশীদ তালুকদার রাষ্ট্রীয়কোন স্বীকৃতি পাননি। এ নিয়ে কি আক্ষেপ ছিল তাঁর? ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অল রোভস প্রোগ্রাম প্রতিবছর বিশ্বের একজন সেরা ফটো সাংবাদিককে পাইওনিয়ার ফটোগ্রাফার এ্যাওয়ার্ড দেয়। দু’হাজার দশে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এ পদক পেয়েছিলেন রশীদ তালুকদার। পদক নেয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পুরস্কারের আশা করি না, কারণ এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পায়। তাই আমি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার চাই না। দেশের মানুষের ভালবাসাই আমার পুরস্কার। এর আগেও আমি অনেক পুরস্কার পেয়েছি, কিন্তু ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির এ পুরস্কার আমাকে আনন্দিত করেছে।’ কথাগুলোয় প্রচ্ছন্ন অভিমানের সুর তো আছেই। হয়ত মরণোত্তর পাবেন। কিন্তু তা আর স্পর্শ করবে না তাঁকে। অথচ তাঁর কাজ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল নিঃসন্দেহে। উনিশ শ’ পঁচাত্তর থেকে দু’হাজার সাতে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যে দৈনিকে কাজ করেছেন তিনি সেই ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘ষাটের দশকে টেকনোলজির সীমাবদ্ধতা ছিল। সেসব সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি অসাধারণ সব ছবি তুলেছেন, যা বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রামাণিক দলিল হিসেবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে উদ্ভাসিত হবে। রশীদ তালুকদার তার কাজের প্রতি ভালবাসা দিয়ে প্রযুক্তিগত ঘাটতি অতিক্রম করে গেছেন। তার ছিল নিজেকে মেলে ধরার উৎসাহ এবং সাংবাদিকতার কালে সীমাহীন নিষ্ঠা যা তাকে একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। সেই সময়ে রশীদ তালুকদার, আফতাব আহমেদ, মোহাম্মদ আলম ও জহিরম্নল হকÑ এদের ছবি যদি সংরক্ষণ করা হয়, তবে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধকে শুধু সে সব ছবি দিয়েই তুলে ধরা সম্ভব’ (দৈনিক ইত্তেফাক ২৬.১০.১১)। শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামের চিত্র নয় বেঁচে থাকার সংগ্রামে যারা প্রতিদিন লড়ছেন তারাও বিষয় হয়েছে। পিছিয়ে কিছু পড়া জনগোষ্ঠী, আদিবাসী জীবন কিছুই ফাঁকি দেয়নি তাদের ক্যামেরার চোখকে। ইতিহাস নির্মাণকালের এসব পালাকাররা রাষ্ট্রের অন্যমনষ্কতায় নীরব অভিমান নিয়ে চলে যান। স্বীকৃতির মুকুট পাক খায় সঙ্কীর্ণতার আবর্তে।

তবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পেলেও যারা গুণের কদর বুঝেছেন তাদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। দেশে-বিদেশে প্রায় সাতাত্তরটি সংগঠন পুরস্কার দিয়েছে রশীদ তালুকদারকে। তাঁর তোলা ছবি যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া এনসাইক্লোপিডিয়ায় যুক্ত হয়েছে।

জন্মেছিলেন ভারতের চব্বিশ পরগণায়। বাবার রেলের চাকরির সুবাদে ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন এলাকা। ক্যামেরায় হাতে খড়ি সেই ছেলে বেলায় রাজশাহীর স্টার স্টুডিওতে। ক্লাস সিক্সে পড়েন তখন। জীবনের গল্প বিনির্মাণে ক্যামেরা ছিল তাঁর আজীবনের সঙ্গী। যোদ্ধার যোগ্য অস্ত্রের মতো। জাতীয় জীবনের সংগ্রামমুখর ঘটনাবলী তাই অনায়াসে ধরা পড়েছে তাতে। দেশ ও মানুষের প্রতি কমিন্টমেন্ট রেখেছেন ক্যামেরায় চোখ রেখে। আজকের ফটো জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন তাঁর হাতে গড়া। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফি সোসাইটির সর্বোচ্চ পদক অনারারি ফেলোশীপ পেয়েছিলেন। শাব্দিক অর্থেই তারা ছিলেন কালের সাক্ষী। সংগ্রামী অতীতের যে চিত্র তারা দায়িত্ব নিয়ে ধারণ করেছেন তা-ই বাঁচিয়ে রাখবে তাদের। তারাÑ বেঁচে থাকবেন দেশের প্রতি আমাদের ভালবাসায় এক হয়ে।

নির্বাচিত সংবাদ