১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছাত্রী ধর্ষণ, ডাঃ সারোয়ার, বিএনপির তরুণ প্রার্থীদের মুখে পুরনো বুলি!

  • মমতাজ লতিফ

আচ্ছা, এতসব ঘটনার মধ্যে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে শুরু করেছে। এ প্রশ্ন অন্যদেরও মনে জেগেছে কিনা জানি না। প্রশ্ন- ঢাবির মতো দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরের এক নম্বর প্রতিষ্ঠানের কোন ছাত্রী গত দীর্ঘ পঞ্চাশ-ষাট বছরের মধ্যেও, এমনকি ’৬৯, ৭০-এর গণআন্দোলনের সময়ে অথবা ’৯০-এর স্বৈরশাসকবিরোধী আন্দোলনের সময়েও ধর্ষণের শিকার হয়নি। তাহলে কেন এই সময়ে এই দুটি ঘটনা প্রায় একই সঙ্গে ঘটল?

প্রশ্নগুলো উঠেছে নানা কারণে-

প্রথমত. যে ধর্ষক আটক হয়েছে সে নিরক্ষর, মাদকাসক্ত এবং তার ধর্ষণের শিকার ছিল যারা, তারা সবাই প্রতিবন্ধী না হয় পথের ভিখারি, ভাসমান কিশোরী-তরুণী, যাদের কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই- এমন হতদরিদ্র আবাসহীন ভাসমান মেয়েরা। প্রশ্ন জাগে- এমন একজন নিম্নশ্রেণীর নিরক্ষর ব্যক্তি একজন উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীকে টার্গেট করার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয় কি? সে তার সিরিয়াল ধর্ষক চরিত্র নিয়ে তার চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছিল। বড় কথা হলো, তার চাহিদা পূরণের টার্গেটের কোন অভাব ছিল না। তাহলে, এমন কি হতে পারে যেÑ নেপথ্য থেকে কোন পুরনো পাপী, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী কোন শক্তি, যারা এ সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের চরম বিরোধী, তাদের কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন তরুণী, হতে পারে মেয়েটির কোন বন্ধু, ব্যাচমেটের মাধ্যমে ওই দিন একা, কুর্মিটোলায় বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার এবং থাকার পরিকল্পনা জেনে মেয়েটিকে টার্গেট করেছে! এটা কি পরিকল্পিত অপরাজনীতির একটি দৃষ্টান্ত? আমার মন একজন ভাসমান, নিরক্ষর মাদকাসক্তের দ্বারা ঢাবির একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণীর ধর্ষিতা হবার বিষয়টি এতটা সহজ সরল নয় বলে সন্দেহ না করে পারে না।

সেজন্য, ডিবির উচিত হবে এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ধর্ষককে কে বা কারা তাকে এ ঘটনাটি ঘটাতে বাধ্য করেছে অবশ্যই ভাল অর্থের অথবা মাদকের বিনিময়ে, সে তথ্য অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দিয়ে তদন্ত করা। এই ধর্ষককে তার উপস্থিতির প্রমাণ রেখে যেতেও দেখা গেল, যা কিছুটা অবিশ্বাস্য ঠেকে।

প্রায় একই সময়ে এ ঘটনার দু’দিন আগে, আকস্মিকভাবে আমাদের চেনা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী, এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা এবং মৃদুভাষী ডাঃ সারোয়ারের বাড়িতে একেবারে প্রকাশ্যে চাপাতি নিয়ে হামলা করার চেষ্টা হলো, যাতে তার প্রতিবেশী, মেয়ে, জামাই আহত হয়েছে! প্রশ্ন জাগে- এটা কি ছিল হত্যা চেষ্টা? এর দ্বারা তাকে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের কি জঙ্গীরা একটি মেসেজ দিতে চেয়েছিল? নতুবা তারা কেন ব্যাগ ভর্তি সাতটা চাপাতিসহ অন্যান্য প্রমাণ রেখে গেল?

মনে হয় নাকি, এই দুটো ঘটনা একসূত্রে গাঁথা! একই রকমভাবে প্রমাণ ফেলে রেখে বাস্তবায়নকারীই একমাত্র অপরাধী, তা প্রমাণে বিশেষ যত্ন ও পরিকল্পনা একইরকম কেন? পুলিশ বা ডিবিকে ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। নিশ্চয়ই তারা তা করছেন।

এবার ঢাকা সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে আসা যাক। আমার মনে প্রশ্ন- বিএনপি, বলা উচিত, বিএনপির লন্ডনে বাসরত অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত প্রধান নেতা এবং পরিকল্পনা অনুসারে তার সুরে সুর মিলিয়ে তার নির্দেশ পালনকারীরা দীর্ঘদিন যাবত যে অচল, প্রাচীন, অগণতান্ত্রিক অপরাজনীতি করে চলেছে, এই ২০২০-এর পুরোপুরি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও বিএনপির তরুণ প্রজন্মের দুই প্রার্থীকেও কেন তাদের উত্তরসুরীদের বোলগুলোই শেখানো বোলের মতোই বলতে হচ্ছে?

আমি অন্তত বিএনপির এ যুগের তরুণ প্রার্থীদের কাছে ভিন্ন, যুগোপযোগী, গণতান্ত্রিক, দলের ভুল-ভ্রান্তি, প্রাচীনপন্থী নীতি বর্জন করে তারা বক্তব্য দেবে বলে আশা করেছিলাম। এটা ঠিক যে, এই নির্বাচনে তারেকের ভূমিকা প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে না তার অর্থ দাবির বিষয়াবলী। কিন্তু তাই বলে, বিএনপির প্রবীণ নেতানেত্রী, যারা তার সবরকম অন্যায়ের পক্ষে সহযোগিতা করেছে, তারা এখনও নিঃশব্দে সেই সহযোগিতা দিচ্ছে না, তা বিশ্বাস করা কঠিন। সহজ ছিল- নতুন প্রজন্মের বিএনপির সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দুই প্রার্থীর নতুন যুগোপযোগী, সুস্থ রাজনৈতিক বক্তব্য। দেশের কল্যাণে কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং সর্বোপরি, দেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাস, জাতির জনকের প্রতি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, কৃতজ্ঞতা জানানোর সূচনা করে বিএনপি দলটির নবযাত্রার সূচনা করতে পারত।

আর যাই হোক, তারেক, খালেদা জিয়া ফৌজদারি, দুর্নীতির মামলায় প্রমাণিত ও দ-িত আসামি। এ সত্যকে অস্বীকার করে, অপরাধীদের দলের নেতৃত্বে স্থান দেয়া এবং তাদের অপরাধমূলক নির্দেশ মেনে চলার কোন প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের বিএনপির রাজনীতি করতে আসা ব্যক্তিদের উচিত ছিল না। কেন তারা প্রাচীন-তারেক শাসিত প্রবীণ নেতাদের কথার পুনরাবৃত্তি করছে তা দেখে দুঃখ না পেয়ে পারি না। বিএনপিতে নতুন রক্ত সঞ্চালনের একটি অপ্রত্যাশিত সময় ও সুযোগ এই দুই প্রার্থীর কাছে উপস্থিত হয়েছে, যা দুর্লভও বটে।

বিএনপিকে নতুন প্রজন্ম এখন, এই সময়ে একটি দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী আধুনিকমনস্ক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনর্গঠিত করতে পারে। অতীতের অন্ধকারের দানব বন্ধু, যুদ্ধাপরাধী মিত্র, ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে হত্যার দ্বারা রাজনীতিকে প্রতিযোগীহীন করার কালো পন্থা বর্জন করতে পারে। এ দলের তরুণ প্রজন্মে এমন কি কেউ নেই যারা বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধী-আলবদর, জামায়াত ও জঙ্গী মৌলবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরে এসে দেশের মূল, ইতিবাচক ¯্রােতে অবস্থান গ্রহণ করতে ভূমিকা নিতে পারে?

আমি বিস্মিত হয়ে শুনলাম, এই দুই নবীন প্রার্থী প্রাচীনদের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলছেÑ

১. তাদের প্রার্থিতা নাকি বাতিল করার চেষ্টা করছে সরকারী লোকজন! এটি কেউ বিশ্বাস করবে না, বরং এ ধরনের নি¤œস্তরের লোক হাসানো বক্তব্য দিয়ে তারা যে রাজনীতি বোঝে না। তাই প্রমাণ করছে। হায় দুঃখ! ভেবেছিলাম দেশে বিএনপি জামায়াত মুক্ত হয়ে সুস্থ ধারায় ফিরবে, দেখছি তা হবার নয়।

২. তারা নির্বাচনের আগেই বলছেÑ সরকারী নিরাপত্তা বাহিনী, নির্বাচন অফিসের লোকজন আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে ফেলবে! শুধু গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছে! এ কথা বলে তারা কি মাঝ পথে নির্বাচন বর্জন করার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

৩. এদের একজন তো আগে নির্বাচন করে ভাল ভোট পেরেছিল। তবু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশে তারেকের মূর্খামীপূর্ণ নির্দেশে বেলা বারোটার দিকে নির্বাচন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছিল! এ কারণে ঢাকা উত্তরে প্রয়াত আনিসুল হক মেয়র হিসেবে সহজেই জয় লাভ করেছিল। বর্তমান সিটি মেয়রও ভাল কাজ করে চলেছেন। দক্ষিণের মেয়রও যথেষ্ট ভাল কাজ করেছেন। কেবল জলাবদ্ধতা ও মশা নিবারণে দু’জনের সীমাবদ্ধতা প্রকাশিত হয়েছে।

৪. দু’জনেই তাদের বক্তব্য এলাকার সমস্যা দিয়ে শুরু করেনি। বরং ভিন্ন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে সমালোচনা করার মাধ্যমে বক্তব্য শুরু করেছে। অভিযোপত্রও দিয়েছে! এ কাজটি তাদের গণতন্ত্র চর্চার পক্ষে প্রমাণ দেয় না।

এত তারেক-নির্দেশিত পথই হলো। অর্থাৎ, তারেক গোয়েবলসের ভাবশিষ্য, সেজন্য ‘আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছে, এ নির্বাচনেও হবে’Ñ এই মিথ্যা বারংবার বলে একে সত্যে পরিণত করার পন্থা অবলম্বন করেছে বলে শঙ্কা হচ্ছে। কারণ, জাতীয় পার্টির নেতা নেত্রী যতটুকু দেশের কল্যাণ চিন্তা করে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ যতটা মান্য করে, জাতির জনকের প্রতি যে প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শন করে, বিএনপি সেই সব সূচকে জাতীয় পার্টির কাছে হেরে চলেছে! তাদের বড় সর্বনাশ ঘটাচ্ছেÑ দু’জন আদালতে অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত, দ-িত ব্যক্তির কুমন্ত্রণা মানার কারণে এবং দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী, যুদ্ধাপরাধীদের ও জঙ্গীদের সঙ্গে মিত্রতা রক্ষা করে চলায়।

তরুণ প্রজন্মের একটি দল কি উক্ত, জাতির শত্রুদের বর্জন করা এবং সুস্থ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে নতুন রূপ দিয়ে বিএনপি দলটিকে অন্তত জাতীয় পার্টির মতো অবস্থানে আনার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না?

এরকম একটি পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছিলেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, যিনি দ্রুতই রোগগ্রস্ত হন এবং মারা যান। ওলি আহমদ একটা চেষ্টা নিয়েছিলেন। সেটি মওদুদ, নাজমুল হুদা, শমশের মবিন, নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ ঐক্যবদ্ধভাবে করবেন বলে অনেকে মনে করেছিল। সেটিও হয়নি। বর্তমানে রাজনীতিতে আদর্শ, দেশপ্রেমের ওপরে অর্থের লেনদেন, অর্থ লাভ বড় হয়ে ওঠায় সম্ভবত তৃণমূলের বিএনপির নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছে।

জানতে পেরেছি। বিএনপির এক প্রার্থীর অর্থ-বিত্ত এত বেশি যে, তার নাম ‘প্যারাডাইস’ লিস্টে রয়েছে। অর্থাৎ কর ফাঁকি দিয়ে ধনী হওয়ার অভিলাষ তার কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য! এরা কিভাবে নগরপিতা হয়ে জনকল্যাণে কাজ করবে? এরা তো অর্থবিত্ত গড়াতেই বেশি মনোযোগী। কই, এত তীব্র শীতে এদের কে তো দরিদ্র শহুরে, গ্রামীণ জনগণকে কোন সেবা দিতে দেখলাম না। তা হলে তারা কতটুকু জনকল্যাণ করবে, তা ভেবে সন্দেহ হয়।

লেখক : শিক্ষাবিদ

নির্বাচিত সংবাদ