২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিলুপ্তির পথে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং, আঁকিয়েরা ভিন্ন পেশায়

  বিলুপ্তির পথে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং, আঁকিয়েরা ভিন্ন পেশায়
  • লোকায়ত এই শিল্পরীতি বাঁচতে পারে কেবল সরকারী উদ্যোগে

মনোয়ার হোসেন ॥ ভয়ঙ্কর হিংস্রদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভিলেন। তার ঠিক সামনেই রিভলবারের ট্রিগার চেপে ধরা তেজী নায়ক। নায়কের দুই পাশে দুই নায়িকা। একজন লাস্যময়ী ভঙ্গিমায়, অপরজন কুড়াল হাতে রণমূর্তিতে। দর্শক আকর্ষণে এভাবেই বিচিত্র কম্পোজিশনে আঁকা হতো ফ্যান্টাসিতে ভরপুর সিনেমার ব্যানার। শিল্পিত স্পর্শের সেই ব্যানার এখন শুধুই স্মৃতি। অনেকটা নিঃশব্দেই উধাও হয়েছে উচ্চকিত রঙের সঙ্গে অনবদ্য লেটারিং আর জোরালো রেখার টানে চিত্রিত সিনে ব্যানার পেইন্টিং। ব্যানার আঁকিয়েদের রংতুলির আঁচড়ের বদলে এখন ডিজিটাল প্রিন্টে ছাপা হয় সিনেমার ব্যানার। সেই সূত্রে বিলুপ্তির পথে চলচ্চিত্রশিল্পের প্রচারের অন্যতম অনুষঙ্গ ব্যানার পেইন্টিং। একসময় প্রেক্ষাগৃহের সামনে ঝুলত হাতে আঁকা চিত্তাকর্ষক এসব ব্যানার। নির্দিষ্ট চলচ্চিত্রের ফটোইমেজ দেখে তাকে আরও আকর্ষণীয়রূপে আঁকতেন ব্যানার পেইন্টাররা। ঢাকাই ছবির সোনালি সময়ে বিশেষ কদর ছিল ব্যানার পেইন্টিং নামের এই লোকায়ত শিল্পশৈলীর। সিনেপ্রেমীদের পাশাপাশি পথচলতি মানুষও তাকিয়ে থাকত আকর্ষণীয় এসব ব্যানারের দিকে। ঢাকা, নীলফামারীর সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের অনেক জেলাতেই ছিল সিনেমার ব্যানার আঁকার একাধিক কারখানা। সেদিন হয়েছে বাসি হাতে আঁকা সিনে ব্যানার হটিয়ে দিয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের ডিজিটাল ব্যানার।

আর পেইন্টাররা বেঁচে থাকলেও লুপ্ত হয়ে গেছে ওসব ব্যানার কারখানা। কালের আবর্তে বিলুপ্তপ্রায় পপুলার আর্ট নামে পরিচিত সিনে ব্যানার পেইন্টিংয়ের সেই স্বতন্ত্র চিত্রশৈলী।

ঢাকাই ছবির দুরবস্থার সঙ্গে ডিজিটাল প্রিন্টের অভিঘাতে শেষ হয়েছে সিনে ব্যানার পেইন্টিং অধ্যায়। অদৃশ্য হয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের চিত্রিত লোকায়ত শিল্পধারার সাক্ষ্যবহ সিনে ব্যানার। সেই জায়গা দখল করেছে ডিজিটাল ব্যানার। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকাই ছবির দুঃসময়ে ২০০৬ সালে আবুল কালাম আজাদ নামেই এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে দেশে প্রথম ডিজিটাল প্রিন্টের আবির্ভাব ঘটে। সেই থেকে হুমকিতে পড়ে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় তৈরি হওয়া শিল্পীদের হাতে আঁকা ব্যানার। এক পর্যায়ে ’১০ সালে থেমে যায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের পথচলা। বর্তমানে সিনে ব্যানার আঁকিয়েরা বেঁচে আছেন, তবে বিলীন হয়েছে ব্যানার পেইন্টিং নামে আপামর মানুষের কাছে জনপ্রিয় শিল্পধারাটি। কাজ না পেয়ে সিনে ব্যানার আঁকিয়েরা ধাবিত হয়েছেন ভিন্ন পেশায়। পোর্ট্রেটে সিদ্ধহস্ত এসব পেইন্টারের কেউ কেউ স্কুলের দেয়ালে বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি, রিক্সার পেইন্টিং, ফস্টোস্টুডিওর ব্যাকড্রপ আঁকা কিংবা ব্যানার লিখে দিন পার করছেন অনেকেই। জীবিকার তাগিদে কেউ মুদির দোকানদারি, কেউ খেলনা বিক্রি থেকে হোটেল বয়ের মতো শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কহীন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। অথচ শিল্পধারাটি সর্বসাধারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমাদৃত হয়েছে বারবার। এই প্রেক্ষাপটে বিলুপ্তপ্রায় এই শিল্পধারার পুনরুজ্জীবনের স্বপ্ন দেখেন এসব আঁকিয়েরা। গণমানুষের শিল্পের আকাক্সক্ষা মেটানো আঁকিয়েরা মনে করেন, সরকার অনুমোদিত চলচ্চিত্র ও অনুদানের ছবি নির্দিষ্ট হাতে আঁকা ব্যানার বাধ্যতামূলক করা হলে বেঁচে থাকার সুযোগ পেত এই শিল্পশৈলী। একইভাবে বিভিন্ন সরকারী আয়োজনসহ জাতীয় পর্যায়ের উৎসব-আনুষ্ঠানিকতায় ডিজিটাল প্রিন্টের ব্যানারের সঙ্গে হাঁতে আঁকা ব্যানারের প্রচলন রাখা হলে এ পেশার মানুষগুলো চিত্রকর্মনির্ভর পেশাতেই টিকে থাকত। পাশাপাশি চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিষয় হিসেবে এই মাধ্যমের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন অনেকেই। ইতোমধ্যে মারা গেছেন গুরু-শিষ্য পরম্পরায় তৈরি অনেক ওস্তাদ-শিল্পী। অনেকে জীবিত থাকলেও নেই ব্যানার পেইন্টিংয়ের কাজ। একই সঙ্গে পেশার অনিশ্চয়তায় নতুন করে তৈরি হচ্ছেন না সিনেমার ব্যানার পেইন্টার।

সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছেন শাওন আকন্দ। বিলুপ্ত এই শিল্পধারাটির অস্তিত্ব ধরে রাখতে ব্যক্তি উদ্যোগে শ্যামলীর আদাবরের ৫ নং রোডে একটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে সিনেমার ব্যানার চিত্রণের চর্চাসহ বিভিন্ন কর্মশালা হলেও হাতে আঁকা ব্যানারের কোন অর্ডার আসে না। এই গবেষক ও শিল্পী জনকণ্ঠকে বলেন, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র নিয়েই দেশের চিত্রকলার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং। অথচ এই বিশেষ ধারার শিল্পশৈলী কিংবা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের কখনই খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্পে সিনেমার ব্যানার পেইন্টারদের কোন স্থান হয়নি। সব সময় অবহেলিত থেকেছে থেকে লোকায়ত ধারার ছবি আঁকা এই স্বশিক্ষিত শিল্পীরা। সিনেমার ব্যানার হচ্ছে গণসংস্কৃতি বা লোকায়ত সংস্কৃতি। কিন্তু গণসংস্কৃতি বা লোকায়ত সংস্কৃতিকে সমমানের শিল্প হিসেবে গণ্য করে না আধুনিক শিল্পকলা। আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ব্যানার পেইন্টিং নিম্ন শ্রেণীর সংস্কৃতি। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবহেলিত থেকেছেন ব্যানার আঁকিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরা। তাই অনেকটা নিঃশব্দেই বিলুপ্তির পথে এগুচ্ছে পাবলিক আর্টখ্যাত সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং। চড়া রংয়ে আঁকা ব্যানার পেইন্টিংয়ে অতিরঞ্জিত নায়ক-নায়িকার ইমেজ লাখ লাখ মানুষ উপভোগ করত। কোন অভিজাতগোষ্ঠীর নয়, এই শিল্পমাধ্যম ছিল জনমানুষের শিল্পরসদ। এই ভূখন্ডের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই শিল্পশৈলীর রয়েছে গভীর সম্পর্ক। এখনও ব্যানার আঁকিয়ে মানুষগুলো আছেন কিন্তু হারিয়ে গেছে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ঢাকা ও নীলফামারীর সৈয়দপুরকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছিল সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং। পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ে চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুরসহ বেশ কিছু জেলাতে বিস্তৃত হয়েছিল ব্যানার পেইন্টিং স্টুডিও বা কারখানা। চলচ্চিত্রের মন্দাবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তির আগ্রাসনে হারিয়ে গেছে সেসব কারখানা। সস্তায় ডিজিটাল প্রিন্ট পাওয়ায় এখন আর কেউ হাতে আঁকা সিনেমার ব্যানারের কথা চিন্তা করে না। সৌন্দর্যের চেয়ে অর্থ সাশ্রয়ের প্রবল প্রাধান্যে বিলুপ্ত হয়েছে ব্যানার আর্ট। অথচ এখনও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত আমাদের এই পাবলিক আর্ট। এই শিল্পশৈলীর একটা আলাদা আবেদন রয়েছে। সে কারণেই শিশির ভট্টাচার্য, চন্দ্র শেখর দেসহ কিছু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর কাজে এই ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। চিত্রকর্ম সৃজনে তারা নিজেদের মতো করে ব্যানার পেইন্টিং আঙ্গিকের ব্যবহার করেন। চারুকলার অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংকে চারুকলার বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্তিতে আগ্রহী ছিলেন। চিত্তাকর্ষক শিল্পকর্ম হিসেবে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের বিশেষ কদর আছে দেশের বাইরে। গত বছরও ফ্রান্সের প্লাই দ্য টোকিও মিউজিয়াম আয়োজিত সিটি প্রিন্সেস শীর্ষক প্রদর্শনীতে সমাদৃত হয় বাংলাদেশের মোহাম্মদ শোয়েবের আঁকা একটি ব্যানার পেইন্টিং। ১৮ ফুট বাই দশ ফুটের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের বিশাল পেইন্টিংটি ছিল ওই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালে ব্যানার পেইন্টার মোহাম্মদ হানিফ পাপ্পু ও মোহাম্মদ শোয়েব ডেনিশ সেন্টার ফর কালচার এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে কাজ করেছিলেন। শিল্পরসিকদের নজরকাড়া তাদের সেই ব্যানার পেইন্টিং সংরক্ষিত আছে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। আরেক বাংলাদেশী ব্যানার শিল্পী শীতেশ সুরের কাজ প্রশংসিত হয়েছে জাপান ও লন্ডনে। অধুনালুপ্ত ঢাকা আর্ট সেন্টারে ব্যানার পেইন্টার বাহরামের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। শুধু তাই নয়, প্রতিকৃতি অঙ্কনে সিদ্ধহস্ত হওয়ায় আগে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানরা দেশে এলে তাদের বিশাল আকারের প্রতিকৃতি আঁকানো হতো এই ব্যানার পেইন্টারদের দিয়ে। এখন সেই কাজটিও তারা পায় না। একসময় নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেই না সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং নামে আমাদের একটি স্বতন্ত্র চিত্রশৈলী ছিল। বর্তমানে ব্যানার আঁকিয়েদের কেউ ফটো স্টুডিওর ব্যাকড্রপ, রিক্সা পেইন্টিং বা প্রাইমারী স্কুলের দেয়ালে ছবি এঁকে কোনমতে টিকে থাকলেও অধিকাংশই যুক্ত হয়েছেন ভিন্ন পেশায়। সেসব পেশার সঙ্গে নেই কোন শিল্পের সম্পর্ক। মুদি দোকানদারি, হোটেল শ্রমিক, চা-সিগারেট বিক্রির মতো নানা পেশায় কাজ করছেন তারা।

এ অবস্থায় সরকারী উদ্যোগ ছাড়া বিলুপ্ত সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের বাঁচিয়ে রাখার কোন পথ নেই। সেক্ষেত্রে অনুদানের চলচ্চিত্রসহ সরকারীভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রে নির্দিষ্টসংখ্যক হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিংয়ের প্রচলন হলে শিল্পশৈলীটি টিকে থাকার সুযোগ পেত। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যানার এবং জাতীয় পর্যায়ের উৎসব-অনুষ্ঠানে হাতে আঁকা ব্যানার প্রচলিত হলে বিলুপ্তি থেকে বেঁচে যেত এই শিল্পমাধ্যমটি। কারণ, যেসব ব্যানার শিল্পী কাজ করছেন একসময় তারা থাকবেন না। আর পেশাটিই যেহেতু বিলুপ্ত তাই তৈরি হচ্ছে না তাদের উত্তরসূরি।

অনুদানের চলচ্চিত্রে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংকে আবশ্যক করার বিষয়ে তথ্য সচিব কামরুন নাহার বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখব। আমি সদ্য তথ্য সচিবের দায়িত্ব পেয়েছি। তাই এই সঙ্কট সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। তবে সুযোগ থাকলে সঙ্কট সমাধানে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব। সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং নামের শিল্পধারটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলে সেই উদ্যোগ নেয়া হবে।

ব্যানার পেইন্টিংকে চারুকলায় অন্তর্ভুক্তিকরণের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন বলেন, কিছু বিষয় আছে যেটা তার নিজ বলয়েই টিকে থাকে। সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের অস্তিত্বকেও তার নিজস্ব বলয়েই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত প্রকৃত নির্যাসটি ঠিক থাকবে না। মূলত এটা এক ধরনের লোকায়ত শিল্প। প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার আওতায় এনে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তাহলে এই শিল্পটির মেঠো ভাবটি আর থাকবে না। তবে শিল্পের দায়বদ্ধতা থেকেই বিলুপ্তপ্রায় এই চিত্রশৈলীকে বাঁচানো প্রায়োজন। সেক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারী অনুদানের চলচ্চিত্রে ব্যানার পেইন্টিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারী অনুষ্ঠানের ব্যানারসহ জাতীয় পর্যায়ের নানা উৎসব-আয়োজনে নির্দিষ্টসংখ্যক হাতে আঁকা ব্যানার ব্যবহারের প্রচলন করলে শিল্পমাধ্যমটি টিকে থাকবে। তাহলে এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীরাও টিকে থাকত এবং বেঁচে যেত ঐতিহ্যবাহী শিল্পশৈলীটিও।

সিনে ব্যানার আঁকিয়েদের কথা

১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং পেশায় আসেন মোহাম্মদ শোয়েব। পুরান ঢাকার রথখোলার সেতারা পাবলিসিটিতে যখন তিনি কাজ শিখতে যান তখন উর্দু ভাষার জেবা ছবির ব্যানার হচ্ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তীতে সেতারা পাবলিসিটি পরিণত হয় রূপায়ণ আর্টে। ততদিনে নবিশ থেকে দক্ষ ব্যানার পেইন্টারে পরিণত হয়েছেন শোয়েব। অবুঝ মন, রাজ দুলারী, আবার তোরা মানুষ হসহ অনেক হিট ছবির ব্যানার এঁকেছেন এই শিল্পী। হাতে আঁকা সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং বিলুপ্ত হওয়ায় পরিবর্তিত হয়েছে এই শিল্পীর পেশা। তবে রয়ে গেছে শিল্পের প্রতি ভালবাসা। ব্যানার পেইন্টিংয়ের উজ্জ্বলতম সময়ের স্মৃতিচারণ করে শিল্পী বলেন, এই কাজ যখন করতাম তখন রাত-দিন বলে কিছু ছিল না। এমন হয়েছে, ঈদের দিনে মানুষ নামাজ পড়তে যাচ্ছে আর আমরা ‘রসের বাইদানি’ ছবির ব্যানার আঁকছি। সে সময় একজন ব্যানার পেইন্টার যে রোজগার করত সেই অর্থে অনায়াসে চলে যেত সংসার। এক সময় চলচ্চিত্রশিল্পে অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও পতন হলো। হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিংয়ের বদলে প্রাধান্য পেল সস্তার ডিজিটাল প্রিন্ট। ডিজিটাল প্রিন্ট কম মূল্য হওয়ায় পরিবেশকরাও ঝুঁকলেন সেটির প্রতি। যদিও হাতে আঁকা পেইন্টিংয়ের সঙ্গে ডিজিটাল প্রিন্টের বিস্তর ফারাক। আমাদের রং-তুলির আঁচড় ও কম্পোজিশনে পরিবেশকের চাহিদার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত যে কোন ব্যানার। নায়িকার শরীরী অঙ্গভঙ্গিসহ পোশাককে এমনভাবে আঁকতাম যেন সহজেই সেক্সসিম্বল হয়ে ওঠে। একটি ঘোড়া থাকলে দশটি ঘোড়ার শ্যাডোজুড়ে দিতাম। দাউ দাউ আগুনের ফুলকি তুলতে চমকিত রং ব্যবহার করতাম। ভিলেনের হিংস্রতাকে কঠিনভাবে ফুটিয়ে তুলতাম। এখন সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং শুধুই স্মৃতি। হারিয়ে গেল এই পেশা। চর্চাটাকে ধরে রাখতে ভিন্নভাবে সেই কাজটা করি। ফটো স্টুডিওর সিন-সিনারি আঁকি। পোর্ট্রটে আঁকি। স্কুলের দেয়ালে আর্ট করি। আগে বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানরা দেশে এলে তাদের বড় বড় প্রতিকৃতি আঁকতাম। সেই কাজও এক সময় একই শিল্পশৈলীটি আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সিনিয়র শিল্পীরা অনেকেই মারা গেছেন। গত ২৩ ডিসেম্বর মারা যান সিনেমার প্রখ্যাত ব্যানার পেইন্টার এস. মইন। এখন চারদিকে শুধুই হাহাকার। নেই ড্রইংম্যান। নেই ফ্রেম গড়ার অভিজ্ঞ মিস্ত্রি। কেউ বা আবার জড়িত হয়েছেন শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কহীন সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায়। পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই পেশা টিকে থাকার আর কোন রাস্তা নেই। যদি সরকারীভাবে অনুমোদিত ছবি এবং প্রতিটি সরকারী অনুদানের ছবিতে নির্দিষ্টসংখ্যক হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিং বাধ্যতামূলক হতো তাহলে বেঁচে যেত এই শিল্পশৈলী। পাশাপাশি চারুকলার বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং ধারাটি যুক্ত হলে সম্ভাবনা জাগত। কথা প্রসঙ্গে এই ব্যানার শিল্পী জানান, সর্বশেষ কাজ করেছেন জয়কালী মন্দির এলাকার সিনেমার ব্যানার স্টুডিও একতা আর্টে।

ঢাকার পাশাপাশি নীলফামারীর সৈয়দপুরকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছিল সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং। সেখানকারই এক ব্যানার আর্টিস্ট টুন্নু মিয়া। ১৯৮২ সালে যুক্ত হন ব্যানার পেইন্টিং পেশায়। বেদের মেয়ে জোছনা, শঙ্খমালা, গাড়িয়াল ভাইসহ অসংখ্য সুপারহিট ছবির ব্যানার এঁকেছেন এই শিল্পী। সেসব দিন এখন তার কার কাছে মরচেপড়া ধূসর স্মৃতি। কেমন আছেন জানতে চাইলে টুন্নু মিয়া বলেন, কোন মতে বেঁচে আছি। যারা চা-সিগারেট বিক্রি করে তারাও আমাদের চেয়ে ভাল আছে। আমাদের খোঁজ নেয়ার কেউ নেই। সিনেমার ব্যানার পেইন্টার যে বিলুপ্ত হলো সে নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা নেই। চলচ্চিত্রের দুর্দশার সঙ্গে ডিজিটাল প্রিন্টের আগ্রাসনে হারিয়ে গেল ব্যানার পেইন্টিং। থেমে যায় পাবলিক আর্ট নামে পরিচিত এই শিল্পরীতির পথচলা। ঢাকাই ছবির দুঃসময়ে আবির্ভূত হয় ডিজিটাল প্রিন্ট। এতে ব্যানারের খরচ কমে যাওয়ায় সবাই হাতে আঁকা সিনেমার ব্যানারের বদলে ডিজিটাল প্রিন্টের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। বিলুপ্ত হওয়ায় এখন সিনেমার ব্যানার না এঁকে প্রাইমারী স্কুলের দেয়ালে ছবি আঁকি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি সুফিয়া কামাল, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি জসীম উদ্দীনের প্রতিকৃতি আঁকি। আমি তো তবুও ওই পেশার কাছাকাছি আছি। কোন মতে জীবন চললেও আঁকাআঁকিতেই আছি। কিন্তু সৈয়দপুরের অনেক সিনেমার ব্যানার পেইন্টার জড়িত হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায়। আমাদের সঙ্গের ব্যানারশিল্পী ইকবাল এখন মুদির দোকান চালায়। হান্নু নামের আরেক শিল্পী বাচ্চাদের খেলনা বেঁচে জীবিকা নির্বাহ করে। সিনেমার ব্যানার আঁকার বদলে ভুট্টু এখন ঘরবাড়িতে রং মিস্ত্রির কাজ করে। এমনকি আমার ছেলেও কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে দোকানদারি করে। অন্যদিকে অগ্রজ শিল্পী আমার চাচা ওস্তাদ নওশাদ আলী, হাফিজ, হায়দারের মতো অনেক ব্যানার পেইন্টার ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তাই এখন আর নতুন করে ব্যানার শিল্পী তৈরি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে ভবিষ্যতে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং নামের শিল্পমাধ্যমটির কথাও হয়ত জানবে না নতুন প্রজন্ম। সরকার যদি একটু উদ্যোগী হয়ে অনুদানের চলচ্চিত্রগুলোয় হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিংকে প্রাধান্য দিলে এই পেশার মানুষগুলো টিকে থাকত। সেই সূত্রে পাবলিক আর্ট নামের শিল্পমাধ্যমটিও বিলুপ্তির পথ থেকে বেঁচে যেত।

দেশের সিনেমা ব্যানারের সূচনালগ্নের আরেক ওস্তাদ শিল্পী বিদেশ কুমার ধর। সংক্ষেপে বিকেডি নামে পরিচিত এই শিল্পী কাজ শিখেছিলেন দুই ওস্তাদের কাছ থেকে। একজন মামা পীতলরাম সুর ও অপরজন গিরীন দাস। ১৯৬১ সালে পেশায় যুক্ত হয়ে ১৯৬৫ সালে রপ্ত করেন সিনেমার ব্যানার আঁকার পরিপূর্ণ কৃৎকৌশল। হাতে আঁকা সিনেমার ব্যানারের দুর্দিন নেমে এলে ডিজিটাল প্রিন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এই শিল্পী। বর্তমানে পুরানা পল্টনের বিকেডি নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিনেমা ব্যানারের ডিজিটাল ডিজাইন করেন। তার ভাষ্য মতে, হাতে আঁকা সিনেমার ব্যানার আর ডিজিটাল প্রিন্টের মধ্যে বিশাল পার্থক্য। হাতে আঁকা ব্যানারে থাকে শিল্পীর আন্তরিকতা এবং নিজস্ব মেধা প্রকাশের সুযোগ। আর ডিজিটাল প্রিন্টে সব মেধাই এক হয়ে যায় কম্পিউটারে। হাতে আঁকা ব্যানারের শিল্পমান কখনই ডিজিটাল প্রিন্টে প্রতিফলিত হয় না। বেশকিছু ফটোগ্রাফ দেখে সেই সিনেমার মূল আবহটি উদ্ভাসিত হতো ব্যানারে। সেখানে চরিত্রকে বিশেষভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো উজ্জ্বল রঙের খেলা ও রেখার গতিশীলতায়। কোন বিশাল ব্যানার আঁকার আগে আমি আগে ছোট কাগজে পুরো ছবির কম্পোজিশন করে নিতাম। তারপর শুরু হতো ব্যানার চিত্রায়ণ। চলচ্চিত্রশিল্পের সোনালি সময়ে ব্যানার পেইন্টারদের আয় ভাল হওয়ায় সবাই মন দিয়ে কাজ করত। তাই কাজের মানও ছিল উচ্চমানের। উল্টোদিকে নির্দিষ্ট চলচ্চিত্রটির ফটোগ্রাফকে স্ক্যানের মাধ্যমে ফটোশপের কারিকুরিতে প্রকাশিত ডিজিটাল প্র্রিন্টে থাকে শুধু আলো বাড়ানো-কমানোর কন্ট্রাস্ট পদ্ধতি। সেখানে থাকে না কোন শিল্পশৈলী। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় ব্যানার পেইন্টার তৈরি হওয়ার তথ্য তুলে ধরে বিকেডি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবর্তে ওস্তাদদের হাত ধরে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে তৈরি হতো একজন ব্যানার পেইন্টার। কাঠের ফ্রেমে মার্কিন কাপড় টানিয়ে কয়েক দফা আস্তরণের মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে ক্যানভাস প্রস্তুত করা, ড্রইং ও স্কেচের দক্ষতাসহ গ্রাফ করার পর রঙের ব্যবহার শিখতে হতো ধাপে ধাপে। শেষ ধাপে ছিল ওস্তাদ শিল্পীর তুলির আঁচমাখা ফিনিশিং টাচ। উচ্চকিত রঙে ভেসে উঠত নায়িকার পেলব ত্বক, নায়কের বলিষ্ঠ চেহারা কিংবা ভিলেনের নিষ্ঠুর মুখচ্ছবি। কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বছর লাগত শিক্ষানবিশ থেকে একজন পরিপূর্ণ ব্যানার পেইন্টার তৈরি হতে। ধৈর্য সহকারে ওস্তাদদের অনুসরণ করে রপ্ত করতে হতো এই শিল্পরীতিকে। কাজ দেখে ওস্তাদ ভাল বললে সেটাই হতো আমাদের সার্টিফিকেট। এ কারণেই সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং একটি আলাদা শিল্পজগত। জনকণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় এই প্রখ্যাত ব্যানার পেইন্টার বলেন, নিতুন কু-ুর মতো বিখ্যাত শিল্পীও একসময় সিনেমার ব্যানার এঁকেছেন। সিনেমার ব্যানার আঁকার উপার্জনের টাকায় তিনি চারুকলা অনুষদে পড়েছিলেন। শুধু তিনি নন বিখ্যাত পরিচালক সুভাষ দত্ত কিংবা আজিজুর রহমানের মতো চারুকলা পড়ুয়া বিশিষ্ট পরিচালকও সিনেমার ব্যানার এঁকেছেন। আফসোস করে এই ব্যানার আঁকিয়ে বলেন, বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের অবনমনের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় শিল্পরীতি সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং হারিয়ে গেল। ডিজিটাল প্রিন্টের আবির্ভাবের সঙ্গে চলচ্চিত্রের দুর্দশায় ব্যানার আঁকিয়ে চর্চায় গুরু-শিষ্যের পরম্পরার পথটি সঠিকভাবে না এগোনোয় এক সময় দক্ষ শিল্পী কমে গিয়ে কাজের মান পড়ে যায়। নেমে আসে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং ও পেইন্টারদের দুর্দিন। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পীরা ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন পেশায়। ছবি আঁকার কাজের বদলে ছোটখাটো কাজ করে দুঃখে-কষ্টে বেঁচে আছেন অনেকে। এর মধ্যে আবার অনেক গুণীশিল্পী মারা গেছেন। আমাদের সময়ের নামী ব্যানার পেইন্টার হরিমঙ্গল দাস অর্থকষ্টে ভুগে অসুখে অসুখে মারা গেলেন দেড় বছর আগে।। তার মতোই সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংও একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। কারণ, এই শিল্পকে টিকে থাকার কোন লক্ষণ বা বাস্তবতা দেখছি না। এই শিল্পরক্ষায় সরকারী উদ্যোগ নেয়া হলে হয়ত বেঁচে যেত। তেমনটা তো দেখছি না। তাছাড়া ব্যানার পেইন্টিংয়ের কারখানার জন্য বড় জায়গার প্রয়োজন হয়। তাই কারখানা করতে গেলে জায়গা পাওয়া যায় না। আর জায়গা পেলেও সেটার জন্য যে ভাড়া দিতে হবে সেটা দিয়ে কেউ কারখানা চালাতে পারবে না।

প্রদর্শকের ব্যর্থতার দায় স্বীকার

মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দীন নওশাদ বলেন, বহু বছর আগেই অনেকটা নিঃশব্দে থেমে গেছে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং নামের শিল্পমাধ্যমটি। অথচ হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিংয়ের আবেদনটাই অন্যরকম। আমাদের উচিত ছিল এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীদের অস্তিত্বকে ধরে রাখার চেষ্টা করা। আমরা সেটা পারিনি। ব্যর্থ হয়েছি। বাংলার চলচ্চিত্রের দুঃসময়ে ডিজিটাল প্রিন্টের কাছে চরমভাবে মার খেয়েছে হাতে আঁকা ব্যানার। মূলত পরিবেশকদের মাধ্যম হয়ে প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছত সিনেমার ব্যানার। কিন্তু স্বল্পমূল্যে ডিজিটাল প্রিন্ট পাওয়ার কারণে পরিবেশকরাও আকৃষ্ট হন সেটির প্রতি। ঢাকাই ছবির মন্দাদশায় খরচ বাঁচানোর চিন্তায় আমরাও সেটাকে গ্রহণ করি। তাই এক সময় হারিয়ে যেতে বাধ্য হয় হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিং। একরকম ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে এই শিল্পমাধ্যমকে। অথচ দর্শককে আকৃষ্ট করা হাতে আঁকা ব্যানার পেইন্টিংয়ের কাছে একেবারেই ম্রিয়মাণ ডিজিটাল প্রিন্ট। হাতে আঁকা সিনেমার ব্যানার ছিল আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির একটি অংশ। নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতির একটি ধারাকে নির্বিকারভাবে ধ্বংস হতে দেখলাম। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এই পাবলিক আর্টের একটি নিজস্ব ফর্ম সৃষ্টি করেছিলেন আমাদের ব্যানার আঁকিয়েরা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গ্যালারির বাইরে উন্মুক্ত স্থানে রাখা সেসব ব্যানারের শিল্পিত সৌন্দর্য সহজেই আকৃষ্ট করত সাধারণ মানুষকে। এই ধারাটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, এখনও রিক্সার পেছনে নিশান কিংবা বেদের মেয়ে জোছনার ব্যানারের আঁকা ছবিটি দেখা যায়।

উৎস ও সর্বশেষ তথ্য

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রভাষা সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং। এই অঞ্চলে চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসার ও প্রচারের সঙ্গে সিনেমা ব্যানার পেইন্টিংয়ে ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। ১৯ শতকের শেষ ভাগে রাজা রবি বর্মার পশ্চিমা শৈলীতে ভারতীয় বিষয়বস্তু নিয়ে আঁকা চিত্রকলা ও জনপ্রিয় ছাপাই ছবির সঙ্গে এই বিশেষ শৈলীটির সংযোগ আছে। মূলত গত শতকে দেশভাগ পরবর্তীতে বাংলাদেশে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের সূচনা হয়। ১৯৫০ সাল থেকে আশির দশকের শেষাবধি ছিল সিনেমার ব্যানারের সুসময়। দেশ ভাগের শিকার হওয়া ভারতের কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই ও মাদ্রাজ থেকে আসা অবাঙালী শিল্পীদের মাধ্যমে এদেশে এই শিল্পধারার চর্চা শুরু হয়। পরবর্তীদের তাদের এদেশীয় শিষ্য-প্রশিষ্যদের মাধ্যমে বিকশিত হয় বাংলাদেশের সিনেমার ব্যানার পেইন্টিংয়ের নিজস্ব শিল্পশৈলী।

এদেশের ব্যানার পেইন্টিংয়ের সূচনা সময়ের শিল্পী পীতলরাম সুর। দেশ ভাগের আগে ত্রিশ ও চলচ্চিত্রের দশকে তিনি ব্যানারের বদলের সিনেমার ছবি আঁকতেন প্রেক্ষাগৃহের দেয়ালে। ওয়াইজঘাট এলাকায় আর্ট হাউস নামে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানও গড়েছিলেন এই আঁকিয়ে। পীতলরাম সুর পরবর্তী অধ্যায়ে শাঁখারীবাজার থেকেই ব্যানার পেইন্টিংয়ে যুক্ত হয়েছিলেন বিদেশ কুমার ধর, উত্তম সুর, লক্ষ্মীনারায়ণ, বিক্রম সুর প্রমুখ। এছাড়াও ব্যানার আঁকিয়েদের তালিকায় ঢাকার অগ্রগণ্য শিল্পীরা হলেন গিরীন দাস, হরিমঙ্গল দাস, সুভাষ চক্রবর্তী, হরেন্দ্র মনিদাস, মেহাম্মদ হানিফ পাপ্পু, মোহাম্মদ শোয়েব, আবদুর রব খান, বিদেশ কুমার ধর, এস মঈন মোহাম্মদ সেলিম ও মোহাম্মদ রাজা মিয়া। সারাদেশে ব্যানার পেইন্টিং বিকাশে ভূমিকা রাখা এই তালিকা অন্য শিল্পীরা হলেন বগুড়ার এ জেড পাশা, চুয়াডাঙ্গার শারজেদ হোসেন ও জালালউদ্দিন, জামালপুরের বাদশা, দিনাজপুরের সুতান সরকার, সৈয়দপুরের আবদুল ওহাব ও টুন্নু মিয়াসহ নাম না জানা অনেক শিল্পী

সর্বশেষ ২০০৬ সালেও ঢাকায় সাতটি এবং সৈয়দপুরে তিনটি ব্যানার স্টুডিও কাম কারখানার খোঁজ পাওয়া যায়। ঢাকার ব্যানার পেইন্টিং কারখানাগুলো মধ্যে নারিন্দার পুলিশ ফাঁড়িসংলগ্ন বেগমগঞ্জে ছিল ফারজানা আর্ট ও মুন্না আর্ট, বনগ্রামের যুগীনগরের এস আর্ট, সূত্রাপুরের লোহারপুলের শিল্পী আর্ট, দক্ষিণ মুগদার সেলিম আর্ট, নবাবপুরের রূপায়ণ ও শাঁখারীবাজারের আঁকা পাবলিসিটি। সৈয়দপুরে ছিল তিনটি ব্যানার কারখানা। স্টেশন রোডে ছিল দাদা আর্ট, নয়াটোলায় টুন্নু আর্ট ও কালিম হোটেল মোড়ে ছিল বাবু আর্ট।