২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পিলখানা হত্যা মামলার রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণ

  • বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী

(গতকালের পর)

পিলখানার ভয়াবহ অবস্থায় বিমান বাহিনী হেলিকপ্টারে করে বিদ্রোহ বন্ধের জন্য লিফলেট দেয়ার সময় বিদ্রোহীরা হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করতে থাকে। বিদ্রোহীদের গুলিতে হেলিকপ্টারের ফুয়েল ট্যাঙ্ক ছিদ্র হয়ে তেল পড়তে থাকা অবস্থায় হেলিকপ্টার জরুরীভাবে বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করে। তিনি পর্যবেক্ষণে বলেছেন, বিডিআর বিদ্রোহীরা কেবল ডিজির দরবারে আক্রমণ ও সেনা অফিসারদের নৃশংসভাবে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা বাসায় বাসায় গিয়ে সেনা অফিসারদের পরিবার-পরিজনদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে। আদালতের পরীক্ষিত সাক্ষী ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। এই মামলায় ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির কোন অভিযোগ গঠন না হওয়ায় ওই সব অপরাধের বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। তথাপিও ঘটনার সার্বিক পারিপার্শ্বিকতা নৃশংসতা অনুধাবনের জন্য পিলখানায় অবস্থিত সামরিক কর্মকর্তাগণের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষ্যে বিদ্রোহীদের অত্যাচারের ভয়ঙ্কর রূপ ন্যায়বিচারের স্বার্থে অত্র রায়ে দৃশ্যপটে আনা হয়েছে। আলোচিত সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে লক্ষ্য করা যায় যে, সেনা অফিসারদের সর্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত দায়িত্বে থাকা রানার, গাড়ি চালক, ব্যক্তিগত সহকারীদের কেবল শপথ ভঙ্গ করায় নয়, তাদের বর্বরতা, পৈশাচিকতায় এটাই প্রমাণ হয় যে, বাংলাদেশ রাইফেলসের নেতৃত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতি তাদের দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ এবং প্রতিহিংসার বহির্প্রকাশ হিসেবে ওরা একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অভিপ্রায়ে ঘটনার বহু পূর্ব থেকেই ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিতভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, বিডিআর থেকে যে কোন মূল্যে সেনা অফিসারদের উৎখাত করে বিভাগীয় অফিসার দ্বারা বাহিনী পরিচালনা করা। আর সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কেবলমাত্র সামরিক অফিসারদের হত্যা করেই বিদ্রোহীরা থেমে যায়নি, তারা অফিসারদের পরিবার-পরিজন, মেহমান ও গৃহকর্মীদের ওপর এমনভাবে নৃশংস নির্যাতন চালিয়েছে যে ভবিষ্যতে যাতে সেনাবাহিনীর কোন অফিসার প্রেষণে বিডিআরে দায়িত্ব পালন করতে সাহস না পায়।

যে সকল সৈনিক অফিসারদের সঙ্গে সর্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে পরিবারের সদস্যের মতো স্নেহ-ভালবাসা পেয়েছে, তারাই এই বিদ্রোহে হায়েনার ন্যায় হিংস্র আচরণের মাধ্যমে অফিসারদের হত্যা, নির্যাতন, তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের ওপর পাশবিক অত্যাচার, বাড়ি/গাড়ি ভাংচুর, অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ করেছে। ওরা রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ন্যায় ঘৃণ্য অপকর্মে লিপ্ত হয়ে মানবতাকে ধিক্কার দিয়েছে। বিচারপতি সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণে বলেছে, বিদ্রোহীরা এতই নিষ্ঠুর ও নির্মম ছিল যে, পুত্র বিদ্রোহীদের হাতে-পায়ে ধরে মায়ের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য অসুস্থতার কথা জানিয়ে আকুতিমিনতি করেছে, তার পরও ওদের নির্যাতন থেকে জন্মদাত্রী জননীকে রক্ষা করতে পারেনি। বিদ্রোহীরা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে যে, নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘটনার ২ বছর পরেও একাধিক ভিকটিম নির্বাক ছিল। তারা পরিবার-পরিজন, এমনকি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা বলেনি। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে একটি শৃঙ্খল বাহিনী তাদের কমান্ডিং অফিসারদের প্রতি এরূপ বর্বর ও অসভ্য আচরণ সভ্য সমাজের ইতিহাসে বিরল। এ যেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ন্যায় বাংলাদেশের বুকে বুলেট চালিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে লাল। সবুজের পতাকা, আঘাত করেছে ষোলো কোটি মানুষের হৃদয়ে, স্তম্ভিত হয়েছে বিশ্ব বিবেক, যারা এই ঘৃণ্য, পৈশাচিক ও নির্মম অপরাধ করেছে তারা কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য?

বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণে বলেছেন, বিদ্রোহীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য পিলখানার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ওই সময় পিলখানার অভ্যন্তরে জীবিত পালিয়ে থাকা সেনা কর্মকর্তা, তাদের পরিবার-পরিজন এবং কোয়ার্টার গার্ডে আটককৃত বন্দীরা এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি অতিবাহিত করতে থাকে। ২৫.০২.২০০৯ তারিখ দিবাগত রাতে পিলখানার অধিকাংশ এলাকার বিদ্যুত সংযোগ বন্ধ করে বিদ্রোহীরা সেনা কর্মকর্তাদের বাসভবনে গিয়ে তল্লাশির নামে পরিবারের সদস্যদের প্রতি নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক আচরণসহ পাশবিক নির্যাতন চালায়, তারা সেনা অফিসারদের বাসাবাড়ি থেকে নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান মালামাল লুণ্ঠন করে। নিহত সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী শাহীনুর পারভীন জবার জবানবন্দীতে ওই রাতের ভয়াবহ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি বিদ্রোহীদের আচরণ সম্পর্কে বলেছে, ‘ওরা মানুষ ছিল না, ওদের বিচার না হলে কারো আত্মা শান্তি পাবে না।’ বিদ্রোহীরা একে অপরের সঙ্গে যোগসাজশে একই উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রাইফেলসের নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেধাবী কর্মকর্তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে নৃশংসভাবে হত্যার পর অত্যন্ত ঠা-া মাথায় হত্যাকা-সহ সব অপকর্ম গোপন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের দাবি উত্থাপনসহ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং এটা তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে পাস করার জন্যে চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে তাদের সহকর্মী বিদ্রোহীরা সামরিক কর্মকর্তাদের লাশ গুম করে হত্যাকা-ের আলামত গোপনের কাজে নিয়োজিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র সমর্পণের অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দল পিলখানায় ভেতরে এসে বিভিন্ন অজুহাতে অস্ত্র সমর্পণ না করে কালক্ষেপণ করতে থাকে এবং রাতে বিডিআর প্রতিনিধিদের বর্ধিত দল হোটেল আম্বালায় অবস্থিত মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ পুলিশ ও র‌্যাবের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে তাদের পরিকল্পনা মতে পিলখানার অভ্যন্তরে বাবর গ্রাউন্ডে মধ্যরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন প্রতিমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানের উপস্থিতিতে অস্ত্র সমর্পণের একটি মহড়া অনুষ্ঠান করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিনিধি দল অস্ত্র সমর্পণের মহড়া শেষে সেনা অফিসারদের পরিবারের নামমাত্র কয়েকজন সদস্যকে উদ্ধার করে পিলখানা ত্যাগের পর বিদ্রোহীরা পুনরায় তাদের সমর্পিত অস্ত্র হাতে নিয়ে পূর্বের ন্যায় নিজেদের অবস্থান গ্রহণ করে।

সেনা কর্মকর্তাদের লাশ গুম ও দেশব্যাপী বিদ্রোহ ছড়িয়ে সীমান্ত অরক্ষিত করা

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সরকারী প্রতিনিধি দল পিলখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী সুবেদার ইউসুফ আলী ও সুবেদার মনোরঞ্জনের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের একটি অংশ মরচুয়ারি, ট্রাক ও পিকাপে রক্ষিত ডিজিসহ সেনা কর্মকর্তাদের লাশ ক্রাসিং মেশিনে ধ্বংস করে ফেলার চেষ্ট করে। মেশিন অকেজো হওয়ায় পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে বিদ্রোহীরা গভীর রাতে মরচুয়ারি ও এমটি গ্যারেজের পাশে নিহত সেনা অফিসারদের লাশ গণকবর দেয়। বিদ্রোহীরা এতই চতুর যে, গণকবর দেয়ার পর কবরের ওপর ইট, কাঠ, ডাল, শুকনা পাতা ইত্যাদি এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়ে ছদ্মাবরণ সৃষ্টি করে, যাতে ঐ স্থানে গণকবর আছে তা কোনভাবেই বোঝা না যায়। ২৬/০২/২০০৯ তারিখে সরকারী প্রতিনিধি দল বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণ এবং নিখোঁজ ও বন্দী সামরিক অফিসারসহ তাদের পরিবার-পরিজনকে মুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করলে বিদ্রোহীরা পূর্বের ন্যায় কালক্ষেপণ এবং টালবাহানা করতে শুরু করে এবং বিদ্রোহীরা সশস্ত্র অবস্থায় নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে। অনুরূপ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহের ঘটনা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান, রামগড়, সিলেটের আখালিয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ রাইফেলসের সেক্টর ও বিওপিতে বিডিআর সদস্যরা পিলখানার ঘটনার সমর্থনে ২৯টি জেলায় একযোগে বিদ্রোহ শুরু করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এমনকি কিছু কিছু অঞ্চলের। রাস্তাঘাটে গাছের গুঁড়ি, ইট, কাঠ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে সামগ্র দেশে যুদ্ধের অবস্থা তৈরি করে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে।

বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বিডিআরের সদস্যগণ সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন না করে বিদ্রোহের সমর্থনে সাতক্ষীরার কৈখালী সীমান্ত থেকে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর হয়ে কুষ্টিয়া জেলার চিলমারী পর্যন্ত ৬১২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় তাদের টহল প্রত্যাহার করে নেয়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বিডিআর বিদ্রোহের কারণে ভারত সরকার বিয়ানীবাজার সুতারকান্দি শুল্ক বন্দর দিয়ে কয়লা রফতানি বন্ধ করে দেয়। কুড়িগ্রামে ৩৪১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় টহল না থাকায় ভারতের কোচবিহার সীমান্ত এলাকা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সীমান্তজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করায় বিএসএফ ভারতীয় সীমান্তে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে টহল জোরদার করে। বিডিআর সদস্যরা সীমান্ত এলাকা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহের সমর্থনে গোলাগুলি শুরু করে। বিডিআরে কর্মরত সেনা অফিসার ও তাদের পরিবার-পরিজনের জীবন ও মানসম্ভ্রম নিয়ে দেশবাসী যখন দারুণ উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় অতিবাহিত করেছে তখন একই উদ্দেশ্যে সমগ্র দেশের সীমান্ত এলাকাসহ সেক্টর ও বিওপিতে নতুন করে বিদ্রোহ দেখা দিলে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে দেশবাসী সীমাহীন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও এক অজানা আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ২৬/০২/২০০৯ তারিখ সকাল ৯.৩০ মিনিটে পিলখানার ৩নং গেটে জনতার উপস্থিতি বাড়তে থাকে, ১০টার সময় উপস্থিত জনতার মধ্যে ২/৩ শত লোক বিদ্রোহীদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য স্লোগান দিয়ে বলে, ‘বিডিআর-পাবলিক ভাই ভাই, সেনাবাহিনীর বিচার চাই’। বিদ্রোহীরা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বলে, যদি সেনাবাহিনী একজন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করে তাহলে তারা পুরো ঢাকা শহর গুলি করে উড়িয়ে দেবে।

(চলবে)

লেখক : হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি