২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পথশিশুদের সেবা

সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পথশিশু সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশ। তাদের যেখানে আহার সেখানেই শয়ন আর আশপাশের পরিত্যক্ত জায়গায় বসতি। নিজস্ব একটি ছোট্ট ঘরের অভাবে প্রতিদিনের জীবন অতিবাহিত হয় ভাসমান খড়কুটোর মতো পথে-প্রান্তরে, ফুটপাথে, রেল স্টেশনের অব্যবহৃত অস্বাস্থ্যকর স্থানে। এরা মূলত শিশু এবং অবোধ বালক-বালিকা। দিনভর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে স্বল্প আহার যোগাড় করা, শেষ অবধি রাতযাপনও অনাদরে, অবহেলায় গৃহহীন অবস্থায় আকাশ কিংবা কোন ছাতার নিচে। তবে তাদের জন্যও সমাজের কিছু সচেতন দায়িত্বসম্পন্ন মানবিক মানুষ স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় নেমে এসব পথশিশুর পাশে সহমর্মিতার আঁচল বিছিয়ে দেয়। সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর সিংহভাগই অভিভাবকহীন। পিতৃমাতৃহীন অবস্থায় ঘর থেকে রাস্তায় পা রাখাই যাদের নিয়তি। সেখানে কিছু দয়ালু মানুষের স্পর্শকাতর অনুভূতি আর সেবায় ভবঘুরে এই গৃহহীনদের প্রতিদিনের জীবনে এক স্বস্তিদায়ক অবস্থার বাতাবরণ তৈরি করে দেয়। সমাজ, সভ্যতা আর সংস্কার যাদের কাছ থেকে অনেক দূরে, তাদের অসচ্ছল আর ক্রান্তিকাল জীবনের রক্ষক হয়ে ওঠে। তাদের পাশে মমতার পরশ বুলিয়ে দেয় সে হিতজনেরা সত্যিই এই ঘুরে বেড়ানো অসহায় শিশুদের যথার্থ অভিভাবক। ২০ বছর ধরে ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান উদ্দেশ্যহীনভাবে ভাসমান রাস্তার এই শিশুদের সব ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনে আছে প্রায় ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে আরম্ভ করে ব্যবসায়ীসহ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সমাজের কিছু হৃদয়বান মানুষ, যারা খুদে হতদরিদ্রদের পাশে এসে দাঁড়ান। যাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্যসেবার বিন্দুমাত্র কোন নিশ্চয়তা নেই, তাদের অতি আবশ্যিক চাহিদাকে আমলে নিয়ে শুধু অন্নজলের ব্যবস্থাই নয়, নিরাপদ আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারও এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা লুসিও বেনিনাতি একজন ইতালিয়ান। পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী হয়েও সচেতন দায়বদ্ধতায় নজর দেন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ও আশ্রয় খোঁজা শিশুদের প্রতি। ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে তার এই মহৎ কর্মযোগ শুরু হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব গৃহহীনের যাপিত জীবন তাকে মানবিক দৃষ্টি দিতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই থেকে যে শুরু করলেন, প্রায় ২৭ বছর ধরে নির্ধারিত সেবা প্রকল্পের আওতায় ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় অভিভাবকহীন শিশুদের পরম ভালবাসা আর মমতাঘন আবেদনে তাদের সঙ্গে একাত্ম হন। শুধু তাই নয়, এমন সেবাদানকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে ভাবেন। আশ্রয়ণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাদের জায়গা করে দিতে পেরে এই বিদেশী নাগরিক আপন কর্তব্যনিষ্ঠায় নিজেকে উজাড় করে দেন। এ পর্যন্ত কোন বিদেশী অনুদানও নেয়া হয়নি বলে তিনি জানান। এই মহানুভব ব্যক্তি মনে করেন, দেশের সচেতন মানুষকে এসব পিছিয়ে পড়া, অসহায় শিশুর পাশে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। লুসিও জানান, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায়ও এসব শিশুর অস্তিত্ব বিদ্যমান। তিনি এই মহৎ কর্মযোগের দীক্ষা নিয়েছেন ব্রাজিলে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের দিনাজপুর, ময়মনসিংহ হয়ে এখন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পথশিশুদের সেবা প্রকল্পে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তার মতে দেশের উদীয়মান ও ভাবী প্রজন্মই তারুণ্যের দীপ্ত মহিমায় সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে তাদের পাশে দাঁড়াবে। খুদে প্রজন্মের ভাবী জীবন গড়ার লক্ষ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাবে। সেভাবেই ‘এই পথশিশু সেবা সংগঠনে’ দেশের অনেক উদ্দীপ্ত তরুণ এবং সময়ের প্রজন্মের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠানটির এক অভাবনীয় কর্মদ্যোতনা। এসব পথশিশু নিয়ে ফেসবুকেও একটি গ্রুপ সচল আছে বলে এক স্বেচ্ছাসেবক জানান। সপ্তাহে চার স্থানে এসব স্বেচ্ছাসেবক তাদের সেবা প্রকল্প পরিচালনা করেন। লক্ষ্যহীন এই শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবাকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় তাদের প্রতি যথার্থ কর্তব্য পালন করে এই সংগঠনটি। এমন হিতকর সেবা প্রকল্পটি সারা বাংলাদেশে সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরী। কারণ, শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, গ্রামেগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভবঘুরে শিশুদের সংখ্যাও কম নয়। সবাইকে এই মহৎ প্রকল্পের আওতায় আনতে পারলে দেশের খুদে প্রজন্মের একটি অংশ তাদের জীবন গড়ার পথনির্দেশনা খুঁজে পাবে।