২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ মাতা সালেমা বেগম

  • ডাঃ এম এ হাসান

(গতকালের পর)

সেলিম দ্রুত এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা আমি ফিরে এসেছি। আবার বলল, মাগো আমি তোমার কোলে ফিরে এসেছি’। বলেই আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল। আনন্দের অশ্রুতে ওর বড় বড় চোখ দুটি ভরে গেল। আজ আমি কত খুশি, দীর্ঘ ন’মাস পর আমার নিখোঁজ ছেলেদের ফিরে পেয়েছি। আমি আনন্দে উচ্ছ্বাসে ভরপুর হয়ে গেলাম। আমার এই সুখ ও আনন্দ দেখে বিধাতা বুঝি অলক্ষ্যে হেসেছিলেন।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সেই দিন আমার জন্য পৃথিবীর সব চেয়ে জঘন্যতম বিভীষিকাময় দিন। পরিষ্কার দিনের আলোতে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয়, তার একটি উদাহরণ। ৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সকালটা মনে হয় সুন্দর ছিল। কে জানতো সেই দিনটা এমন কারবালার প্রান্তর হবে। বেলা ১১টা পর্যন্ত সাদামাটা দিনের মতো শুরু হলেও তারপর কি হলো মিরপুরের ঐ বধ্যভূমিতে? কেন তা ২৮ বছর চাপা পড়ে ছিল কালো আবরণে? ২৮ বছরে ওটি কি বাংলাদেশের কোন অংশ ছিল না? কেন স্বজনহারাদের অন্ধকারে রেখে বীরের ইতিহাস, ত্যাগের ইতিহাস আড়াল করা হয়েছে! কি ব্যর্থতা ঢাকতে কাদের অপরাধটি আড়াল করতে তা করা হয়েছিল, তা ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেদিন ৩০ জানুয়ারি কী ঘটেছিল মিরপুর ১২ নম্বরে? কার কাছে এর উত্তর পাব? কার কাছে আমি আমার সন্তানের খবর পাব? কেন আমার সন্তান এক অসম অঘোষিত যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল! জবাব চাই। তখনকার সেনাবাহিনী প্রধানের কাছে প্রত্যেক স্বজনহারার মতই আমার প্রশ্নÑ কেন এতদিন চাপা দেয়া ছিল শহীদদের অস্থিকরোটি?

কী প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার ৪৬ দিন পর ৩০ জানুয়ারি অবরুদ্ধ মিরপর মুক্তকরণে এক অপরিকল্পিত যুদ্ধে প্রস্তুতিহীন একদল সেনাকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, সেটাও আমার প্রশ্ন। আর যারা জেনে বুঝে দেশের স্বার্থে, সেনাবাহিনীর গর্বের জন্য, দেশমাতৃকার সম্মান ও স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিল, তাদের যথাযথ সম্মানিত করতে জাতি কেন ব্যর্থ হলো, সেটাও আমার প্রশ্ন। সেলিম ও সুবেদার মোমেনসহ ৪১ সেনাসদস্য ও পুলিশ বাহিনীর যারা আত্মদান করল, তাদের কিভাবে জাতি ও সেনাবাহিনী সম্মানিত করেছে, তা জানবার অধিকার রয়েছে সমগ্র জাতির।

‘আমার প্রিয় সন্তান সেলিম যে সাহসী যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম সাহসী ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়ার অঙ্গীকার করে বঙ্গবন্ধু রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের একটি হলের নামকরণ করেছিলেন তার নামে। অথচ তাকে সরকারী তালিকায় শহীদ থেকে মরহুম বানিয়ে দেয়া হলো! তিন তিন বার সেনাবাহিনী থেকে তার নামে একটি রাস্তার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নিয়েও ব্যর্থ হলো তারা। আর আমি দক্ষিণাঞ্চলের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান হয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য। দুর্ভাগ্যক্রমে সাক্ষাত হলো না। আমি আজ ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুপথযাত্রী। আমার সম্মুখে ধু ধু প্রান্তর। যে মা নিজে জীবিত থেকে তিন তিনটি সন্তানকে কবরে ঠেলে দেয়, তার কানে কেবলই মৃত্যুর ঘণ্টা, সন্তানের আসা-যাওয়া, আর অন্তহীন প্রতীক্ষা। মনে হয় হয়ত এই আমার সন্তান এলো- মধ্যরাতের অশ্বারোহী হয়ে, নক্ষত্রলোক থেকে নেমে কড়া নাড়ল কুটিরে। যে প্রিয় সন্তান পড়ার টেবিলে বইয়ের পাতায় উপুড় হয়ে একদিন কেঁদেছে আর বলেছে, ‘যদি পরকালে তোমার সঙ্গে দেখা না হয় মা’! কেমন আছে সেই আমার প্রাণের ধন।

একদা বেলোলিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে সেলিম লিখেছিল-

‘১৮/১০/৭১

মাগো,

অনেক দিন পর তোমার কাছে কিছু লিখার সময় হলো। মা তিন মাস ফ্রন্টে থাকার পর ট্রেনিং-এ গিয়েছিলাম আবার সেই একই ফ্রন্টে ফিরে এলাম। ট্রেনিং-এ থাকার সময় প্রত্যেকটি রাতে তোমার কথা ভাবতাম, বিশেষভাবে সেই তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। মনে হতো সেই একই আকাশ, কিন্তু মা তোমার সঙ্গে কত দূরত্ব! মাগো ছয় মাসের বেশি তোমার মুখ দেখি না। যখন তুমি আমাদের বিদায় দিলেÑ আমার শুধু সেই ক্ষণটার কথাই মনে পড়ে যখন তোমার কথা ভাবি। তোমাকে ও বাবাকে ছেড়ে আসতে আমারও কষ্ট হচ্ছিল। তাই গেট থেকে বেরিয়ে আর পিছন ফিরে তাকাইনি।

আজকের এই দিনে নতুন সেক্টরে ফিরে আসার দিনে, আমার নতুন দায়িত্ব নিতে আসার দিনে, তোমার আশীর্বাদ চাই। মা সে সময় তুমি বলেছিলে শীঘ্রই তোদের সঙ্গে দেখা হবে। সেই স্বাধীন দেশে সেই দিনটা যেন কাছে আসে, সেই আশীর্বাদ কর। আমার প্রাণ দিয়েও যেন আমার দায়িত্ব পালন করতে পারি। আশীর্বাদ কর। - সেলিম, ৩০/১১/৭১

মা,

পহেলা নবেম্বর নোয়াখালীতে যাবার হুকুম হলো, ফেনীর বেলোনিয়া ও পরশুরাম মুক্ত করার জন্য। ৬ রাতে চুপচুপ করে শত্রু এলাকার অনন্তপুরে ঢুকলাম। পরদিন সকালে ওরা দেখল ওদেরকে আমরা ঘিরে ফেলেছি। ৮ রাতে ঐ জায়গা সম্পূর্ণ মুক্ত হলো। শত্রুরা ভয়ে আরও কিছু ঘাঁটি ফেলে পালিয়ে গেল। পরদিন চিতোলিয়া আমরা বিনাযুদ্ধে শত্রু মুক্ত করলাম। আস্তে আস্তে আরও এগিয়ে গেলাম। ২৭ যখন আমরা ঐ এলাকা থেকে ফিরে এলাম তখন আমরা ফেনী মহকুমা শহর থেকে দেড় মাইল দূরে ছিলাম। পাঠান নগর ছিল আমাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি। শীঘ্রই মাগো আবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারব ভেবে মনটা আনন্দে ভরে গেল।

জান মা, এই যুদ্ধে আমরা ৬০ জন শত্রু ধরেছি। আমাদের কোম্পানির ৩জন শহীদ হয়েছে ও একজনের পা মাইনে উড়ে গেছে। দোয়া কর মা। - সেলিম’

‘ও কেমন করে এতদিন আমাকে ছেড়ে তারার মাঝে ছুটে বেড়াচ্ছে, আলো ছায়া হয়ে, অলক্ষ্য শরীর নিয়ে!

‘আমার সঙ্গে দেখা হলে একসময়ের সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন- আমি নাকি এক বিরল মা, যে মা তার দুটি সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাতে পারে। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমি অসাধারণ নির্ভীক এক মৃত্যুঞ্জয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধার মা। সেই বিরল সন্তানের মা হবার গৌরব লাভ করেছি, যে সন্তান অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু সামনে জেনেও জয়ের জন্য এগিয়ে যেতে পারে এবং শান্ত চিত্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে। সে এমন বীর, যে নিজেকে বিপন্ন করে সাহসী কণ্ঠে সহযোদ্ধাদের বলতে পারে ‘আমার শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকতে তোমাদের ফেলে কাপুরুষের মতো পিছু হটে যাব না।’ সেই বিরল সাহসী সন্তানের মা আমি। আমি আমার সন্তানের গর্বে গৌরাবান্বিত মা। যদি সত্যই কেউ বীরশ্রেষ্ঠ হয়, তাহলে সে আমার সন্তান সেলিমের মতো মৃত্যুকে ভৃত্য করে, মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে ও বিজয় আনতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়ার সাহস রাখবেÑ এটা ভাবা নিশ্চয় অন্যায় হবে না।

‘সব কথা মনের মধ্যে গুমরে গুমরে কেঁদে বেদনার মেঘ যেন জমে। কলমের মুখ দিয়ে আর যেন কালি ঝরে না। আর কোথা থেকে শুরু করব তাও গুছিয়ে ভাবতে পারি না। দীর্ঘ তিন দশক আগের কথা! স্মৃতি বড় দুর্বল হয়ে গেছে। আমি নিজেও দুর্বল হয়ে পড়েছি। সেলিমের নামটা মনে পড়লেই আমার দু’চোখ জলে ভরে যায়। কিছুই চোখে দেখতে পাই না। শুধু মনের মাঝে গুমরে বেড়ায় সেলিমের সব স্মৃতি। এসব কথা কি ভাষায় প্রকাশ করা কোন মায়ের পক্ষে সম্ভব? শুধু সন্তানহারা মা বুঝবে আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। আর কেউ তা বুঝবে না।

(সমাপ্ত)

লেখক : চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, বাংলাদেশ