২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পিলখানা হত্যা মামলার রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণ

  • বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী

(গতকালের পর)

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসনীয় ভূমিকা

২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখের ভয়াবহ ঘটনায় সরকারপ্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত ধৈর্য, সাহসিকতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে উদ্ভূত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। যার প্রেক্ষিতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা রক্ষার মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতিকে ভয়াবহ সঙ্কটের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। মামলার নথি পর্যালোচনায় ও তদন্তের কোন অংশে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অন্তঃকলহ বা পদোন্নতি সংক্রান্ত বিভেদের কোন অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আপীলকারী পক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলিগণের অনুরূপ বক্তব্য আইনসম্মত বা তথ্যনির্ভর নয় বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬/০২/২০০৯ তারিখ দুপুর ২.৩০ মিনিটে বিদ্রোহীদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় দেয়া নির্দেশাত্বক ভাষণের পর পাল্টে যেতে থাকে পিলখানার দৃশ্যপট, মনোবল হারাতে থাকে। বিদ্রোহীরা, ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিদ্রোহীরা বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, খুব সহজে তারা শান্ত হবে না। পিলখানাসহ সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়া বিদ্রোহ ক্রমান্বয়ে স্তিমিত হয়ে আসে। পিলখানায় অবস্থিত বিদ্রোহীরা ধীরে ধীরে অস্ত্র ফেলে পালাতে শুরু করে। কমতে থাকে গুলির শব্দ, আর ফাঁকা হতে থাকে বিডিআরের সদর দফতর পিলখানা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ভাষণের পরেই মূলত বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ শুরু করে। তারা কোয়ার্টার গার্ডসহ সকল বন্দীর মুক্তি দিতে থাকে এবং পুলিশের কাছে লুণ্ঠিত অস্ত্র জমা দেয়। অনেক বিদ্রোহী অস্ত্র, গোলাবারুদ, গ্রেনেড নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঐ ঘটনায় ৭১টি ছোট অস্ত্র, ৫টি রাইফেল, ১টি এসএমজি, ১৯৯টি আর্জেস গ্রেনেড দুর্ধর্ষ বিডিআর বিদ্রোহীরা লুট করে নিয়ে যায় তারা। সেনা অফিসারদের ব্যবহৃত ১৬টি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয় এবং ১৮টি গাড়ি ভাঙচুর করে।

ডিজির কন্যা নিকিতা ও পুত্র রাকিম প্রাণে বেঁচে যায়

মামলার সংরক্ষিত কাগজপত্র পর্যালোচনায় পাওয়া যায়, ২৫/০২/২০০৯ তারিখে বিডিআর বিদ্রোহে বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহম্মেদ ও নাজনীন শাকিল শিপুর ১৬ বছরের কন্যা নিকিতা ও ১২ বছরের পুত্র রাকিম রাজধানীর উত্তরার একটি স্কুলে ক্লাসে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়। বিডিআর বিদ্রোহে পিলখানার অভ্যন্তরে ডিজির বাংলোয় ডিজির স্ত্রী নাজনীন শাকিল শিপু, বেড়াতে আসা ডিজির বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল দেলোয়ার ও তার স্ত্রী রৌশনী ফাতেমা, গৃহপরিচারিকা কল্পনা ও মালী ফিরোজ মিয়াকে অমানবিক নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যায় যে, বিদ্রোহীরা কেবলমাত্র ডিজির বাংলোয় গিয়ে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নৃশংসভাবে হত্যাই করেনি ঐ সময় ডিজির বাসভবনে উপস্থিত মহিলাদের হত্যার পূর্বে উপর্যুপরি পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, যা সভ্য সমাজে শৃঙ্খল বাহিনীর সদস্য দ্বারা তাদের হাইকমান্ডের বাসভবনে গিয়ে অনুরূপ বর্বর ও অমানবিক আচরণের ঘটনা নজিরবিহীন, সমগ্র ভবনটিতে বিদ্রোহীরা লুটপাট ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ভবনটি। দোতলায় অবস্থিত লিভিং রুম থেকে নিহতদের রক্ত সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচতলার মেঝেতে এসে নাজনীন শাকিলের রক্তের সঙ্গে মিশে একাকার হয়েছে।

বিডিআর বিদ্রোহ ও ঘটনার পিছনে ঘটনা

বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী ঘটনার পিছনের ঘটনার পর্যবেক্ষণে বলেছে, অপরাধের কারণ উদঘাটনে অপরাধ বিজ্ঞান গবেষণা করে থাকে, অপরাধ বিজ্ঞানে অপরাধ সংঘটনে অভিপ্রায় (গড়ঃরাব) নির্ণয়ে বিদ্যমান অন্যান্য উপাদানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে অপরাধীর লাভ/ক্ষতির হিসাব অনুসন্ধান করা হয়। এই মামলায় ‘ঘটনার পিছনের ঘটনা অনুসন্ধানে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। ঘটনার পিছনে স্বার্থান্বেষী মহলের অন্য কোন অভিপ্রায় ছিল কিনা? যা তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তে স্থান পায়নি বলে আপীলকারী পক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলিগণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। আপীলকারী পক্ষের বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলিগণের অনুরূপ বক্তব্যে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠে যে, পিলখানায় সংঘটিত সামরিক কর্মকর্তাদের নির্মম হত্যাকা- দ্বারা বিডিআরের দ-িত সদস্যদের বাইরে কোন গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের সুবিধা বা লাভের সুযোগ ছিল কিনা? যদি থাকে তবে ঐ স্বার্থান্বেষী মহল কারা? যদিও স্পর্শকাতর বিষয়টি এই মামলার বিচারের ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়, তথাপি আপীলকারী পক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলিগণের উত্থাপিত প্রশ্নের মীমাংসার জন্য বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত ও অপরাধ বিজ্ঞানের আলোকে পর্যালোচনার দাবি রাখে। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষসহ জনমনে ধূম্রজাল সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এরূপ অবস্থায় স্বার্থান্বেষী মহল চিহ্নিত করার পূর্বে সঙ্গত কারণেই ঘটনার পিছনের ঘটনাসহ পারিপার্শ্বিক অবস্থা ফিরে দেখা প্রাসঙ্গিক। ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় রাষ্ট্র, জনগণ, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তরক্ষা বাহিনীর সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি নির্মম আঘাতসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৪৮ দিনের নবগঠিত সরকার উৎখাতের জন্য প্রকাশ্য হুমকি ছিল কিনা?

বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্রে ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখের উদ্ভূত ঘটনা এবং পিলখানাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিদ্রোহের সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থায় পরিষ্কার একটি চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। আরও পিছনে ফিরে দেখা যায় ঐ সময়ের ক্ষমতাসীন সরকার। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ঘোষিত নির্বাচনী ইস্তেহারে উল্লিখিত অন্যান্য কর্মসূচীর মধ্যে (১) ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যা মামলার অসমাপ্ত বিচারকাজ শেষ করা, (২) ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতাকারী ও প্রতিপক্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য শুরু করা, (৩) ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার সম্পন্ন করা, (৪) দুর্নীতির মামলাসমূহের বিচার করায় (৫) মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনাসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার, (৬) দেশ থেকে জঙ্গীবাদ নির্মূল করা, (৭) ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয় এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তর করার ওয়াদা করে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিডিআর বিদ্রোহের ৪৮ দিন পূর্বে সরকার গঠন করেছিলেন। সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হলে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হলে স্বাভাবিক কারণেই লাভ/ক্ষতির হিসাব সর্বাগ্রে দৃশ্যমান হয়। ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা কেবল পিলখানার অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিদ্রোহীরা সামরিক বাহিনীর ৫৭ জন পদস্থ অফিসারসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা করে ক্ষান্ত থাকেনি তারা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণসহ পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, যা সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। বিদ্রোহের সময় পিলখানার বাইরে বেসামরিক ব্যক্তিরা বিদ্রোহের সমর্থনে দিনব্যাপী মিছিল করেছে, তারা স্লোগান দিয়েছে- ‘বিডিআর জনতা ভাই ভাই সেনাবাহিনীর বিচার চাই।’ এরূপ অবস্থায় বিদ্রোহীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলে, জনগণ তাদের পাশে আছে, এই যুদ্ধে তারাই বিজয়ী হবে। ইন্ধনদাতা গোষ্ঠী ২ দিনব্যাপী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহীদের উৎসাহ যুগিয়েছে, তারা বিদ্রোহীদের খাবার সরবরাহ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এরা কারা? এরা কি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুরূপ কাজ করেছে? না ওরা সরকার পতনের জন্য স্বার্থান্বেষী কোন মহলের পক্ষে কাজ করেছে? ওরা কি ঘটনার পিছনে ছিল? দেশে নির্বাচিত কোন সরকার আছে তা কি বিদ্রোহীরা মনে করেছে? না প্রকারান্তে তারা স্বার্থান্বেষী কোন মহলের ইন্ধনে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার মধ্য দিয়ে সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল? এ সকল বহুবিধ প্রশ্ন কি অযৌক্তিক?

বিচারপতি সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ঘটনার আকস্মিকতায় সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে পিলখানার চারদিকে সশস্ত্র অবস্থায় মোতায়েন করেন। বিমান বাহিনী হেলিকপ্টারে করে বিদ্রোহ বন্ধের জন্য আকাশ থেকে লিফলেট বিতরণ করতে থাকে। পিলখানার ভিতর সশস্ত্র বিদ্রোহীরা ভূমি থেকে বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়ে হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার চেষ্টা করে, হেলিকপ্টার গুলিবিদ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফুয়েল ট্যাঙ্ক ছিদ্র হয়ে যায়। এরূপ ভয়াবহ অবস্থায় পিলখানাসহ সমগ্র দেশে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের জন্য সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে নিহত সামরিক অফিসারদের জীবিত পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা ছিল কি? নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় সশস্ত্র বিদ্রোহের শুরুতেই অধিকাংশ সেনা অফিসার হত্যাকান্ডের শিকার হন। অনুরূপ অবস্থায় হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পূর্বে সেনা অভিযানের বাস্তব কোন সুযোগ ছিল এরূপ কোন তথ্য বা বাস্তবতা নথি দৃষ্টে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সরকার সেনা অভিযানের ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে অবর্ণনীয় রক্তক্ষয়ের সম্ভাবনা ছিল, যা নবগঠিত সরকারসহ দেশের সার্বভৌমত্ব এক ভয়াবহ সঙ্কটে নিপতিত হতো। (চলবে)

লেখক : হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি