২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধেয়ে আসছে মন্দা

২০২০ সাল বিশ্বের জন্য আদৌ কোন সুখবর বয়ে আনেনি। এর অবশ্য নানা যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ সম্ভবত বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিস্থিতি। অস্ট্রেলিয়া সর্বকালের ধ্বংসাত্মক দাবানলে বিপর্যস্ত। বনসম্পদসহ শস্যহানি ঘটায় এর ছাপ পড়েছে বাংলাদেশেও। ইতোমধ্যে প্রায় সবরকম ডাল ও ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। সর্বশেষ স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৫ ব্যর্থ হয়েছে কোন মতৈক্য ছাড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপে হয়েছে ব্যাপক তুষারপাত ও শৈত্যপ্রবাহ। মরুর দেশ সৌদি আরবে পর্যন্ত তুষারপাত ঘটেছেÑ ভাবা যায়! ভারতের রাজস্থানে! ফলে অনিবার্য ফসলহানি ঘটেই চলেছে। যার একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ পেঁয়াজের দাম, যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে সর্বকালের। এর বাইরেও দীর্ঘদিন থেকে চলমান চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, ইউরোপ ও কানাডার ক্ষেত্রে ইস্পাতসহ কয়েকটি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট ইস্যু, ফ্রান্সে পেনশন কর্তন নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভসহ ক্ষতিপয় ইস্যুতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গতিপ্রবাহ। আর্থিক সঙ্কটকবলিত এই কফিনে সর্বশেষ পেরেকে ঠুকেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি কুদ্্স বাহিনীর প্রধান কাশেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলাকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম, যার অনিবার্য প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বোধ করি বাংলাদেশও এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না। কেননা আমাদের সিংহভাগ তেল-গ্যাসের চাহিদা প্রধানত মেটাতে হয় জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করে। তবে আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ অন্তত একদিক থেকে এগিয়ে আছে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায়। অর্থাৎ দেশে কোন খাদ্য সঙ্কটের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এর প্রভাব জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক হবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। কেননা, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভাল। প্রণোদনা দেয়ায় প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণও বেড়েছে। পোশাক শিল্পে আপাতত কিছু সমস্যা দেখা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র চীন বাণিজ্য যুদ্ধের অভিঘাতে তেমন নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তদুপরি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা কয়লা বিদ্যুত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রসহ দশটি মেগা প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। ফলে গড় জাতীয় প্রবৃদ্ধি আট শতাংশের ওপরে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে ভারত ও চীনে কমেছে জাতীয় প্রবৃদ্ধি। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াও নেই স্বস্তিতে। এই অবস্থায় আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিভা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা এবং চরম আয়সম্পদ বৈষম্যের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় যুদ্ধাবস্থার পাশাপাশি আয় ও ধনবৈষম্য বাড়ছে। বিশ্বে গুটিকতক মানুষের কাছে ধনসম্পদ ব্যাপকভাবে কুক্ষিগত হয়েছে। ফলে দারিদ্র্য বাড়ছে। এক্ষেত্রে যদিও বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। সরকারের নানা গণমুখী উদ্যোগ ও সামাজিক কর্মসূচীর ফলে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে ২০ শতাংশে। উল্লেখ্য, অর্থনীতিতে এবার যে তিনজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের কাজ প্রধানত দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপর। বাংলাদেশে এক্ষেত্রে ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংক সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিশ্বের অন্যত্র দৃশ্যটা আদৌ সুখকর ও সুলভ নয়। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে রীতিমতো দুর্ভিক্ষ ও মঙ্গা দৃশ্যমানÑ যেমন সুদান, সোমালিয়া, ইয়েমেন। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থাও আদৌ ভাল নয়। ফলে জনরোষ ও গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। এ থেকেই বেরিয়ে আসার পথ ও পদ্ধতি বের করতে হবে বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দসহ অর্থনীতিবিদদের। সময় থাকতে সাবধান হওয়া বাঞ্ছনীয় অবশ্যই।