২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পিলখানা হত্যা মামলার রায়ের আংশিক পর্যবেক্ষণ

  • বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী

(গতকালের চতুরঙ্গ পাতার পর)

দ-বিধির ১২০-বি ধারার বিধান অনুযায়ী যে ব্যক্তি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করে এবং যে ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য এমন অপরাধ করা যার শাস্তি মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন বা দুই বছর বা ততোধিক সময়ের জন্য সশ্রম কারাদ-। অপরাধ করার পূর্বে এর জন্য ষড়যন্ত্র করাও অপরাধ। এই ষড়যন্ত্রে যারা শরিক তারা এই ধারা অনুযায়ী অপরাধী। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মূল উপাদান হলো অপরাধ করার ব্যাপারে ঐকমত্য, কিভাবে অপরাধ করা হবে সেটা প্রাসঙ্গিক নয়। একই উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করলে তারা সকলেই এই ধারায় অপরাধী। কোন ব্যক্তি শেষ পর্যায়ে যোগদান করলেও তার অপরাধ কমে যায় না। নরহত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত কোন ব্যক্তি যদি প্রথম আক্রমণের সময় অনুপস্থিত থাকে তবে তিনি মুক্তি পান না। অপরাধ সংঘটনকালে প্রত্যক্ষভাবে অনুপস্থিত থেকে যে কাজ করলে অপরাধের সহায়তা করা হয়, অপরাধ সংঘটনকালে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত থাকলে উক্ত কাজ অপরাধের সহায়তা বলে গণ্য না হয়ে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। অপরাধের মূল ধারার সঙ্গে ১১৪ ধারা যোগ করে যদি কোন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয় তবে তার শাস্তি মূল ধারার অপরাধের জন্য হবে, সহায়তার জন্য নয়। এই ধারার সঙ্গে আলোচ্য আইনের ৩৪ ধারার মিল আছে। যে ক্ষেত্রে প্রত্যেক অপরাধীর দোষ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় কিন্তু অপরাধ করতে কে কতটুকু অংশগ্রহণ করেছে তা নির্ণয় করা দুরূহ হয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে এই দুই ধারার প্রয়োগ বিধেয়। তবে ৩৪ ধারার সঙ্গে বর্তমান ধারার পার্থক্য আছে। ৩৪ ধারায় সব অপরাধী অপরাধে প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, ১১৪ ধারায় সহায়তা করে পরে অপরাধের সময় উপস্থিত থাকে। উপস্থিত বলতে এমন অবস্থায় থাকাকে বুঝায় যে অবস্থায় থেকে অপরাধে সহায়তা করা যায়। একই অভিপ্রায় পূরণকল্পে একাধিক ব্যক্তি যখন কোন একটা অপরাধমূলক কার্য করে তখন তাদের প্রত্যক ব্যক্তি সেই অপরাধের জন্য দায়ী হয়। যে সব ক্ষেত্রে একাধিক অপরাধী ব্যক্তি কর্তৃক একটা অপরাধ সংঘটিত হয় এবং এই বিশেষ অপরাধের বিষয়ে অপরাধীদের প্রত্যেকের অংশগ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে, সে সকল ক্ষেত্রে অপরাধীরা যাতে শাস্তি থেকে রক্ষা না পায় তার ব্যবস্থা বর্তমান ধারায় করা হয়েছে। এই ধারার মূল সূত্র হচ্ছে, অপরাধ করার অভিপ্রায়ে অপরাধের কাজে যোগদান করলে তিনি অপরাধী হয়ে পড়েন। দন্ডবিধির ৩৪ ধারা কোন অপরাধ সৃষ্টি করে না। একই অভিপ্রায়ে অপরাধ করার ক্ষেত্রে যৌথ অপরাধীদের দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে। অপরাধের যৌথ-দায়িত্বই বর্তমান ধারার বিষয়বস্তু। যখন একাধিক ব্যক্তি একই অভিপ্রায়ে একটি বিশেষ অপরাধ করার জন্য আত্মনিয়োগ করে, তখনই এই ধারা কার্যকর হয়। এই ধারা প্রয়োগ করতে হলে দেখতে হবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অভিপ্রায় এক ছিল কি না এবং সেই এক অথবা সাধারণ অভিপ্রায়ে তারা কাজ করেছিল কি না। উল্লেখ্য, পূর্ব পরিকল্পনা এমন এক জিনিস যে, তা সব সময় ধরা ছোঁয়ার আয়ত্তে আনা যায় না। অবস্থা দেখে এই সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। আক্রমণ শুরু হওয়ার পরও এই পরিকল্পনা উদ্দীপ্ত হতে পারে।

নথিতে সংরক্ষিত প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র, সাক্ষ্য ও প্রয়োজনীয় দলিলাদি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে দেখা যায় ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখ বাংলাদেশ রাইফেলস সদর দফতর পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিরস্ত্র ব্যক্তি নিহত হওয়ার পিছনে বিডিআরে কর্মরত জুনিয়র অফিসার জেসিও ও সৈনিকদের সাধারণ স্বার্থ জড়িত ছিল। তারা নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য ঘটনার বহু পূর্ব থেকে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বিডিআরে প্রেষণে নিয়োজিত সেনা অফিসারদের তাড়িয়ে পুলিশ বাহিনীর ন্যায় বিসিএস ক্যাডারের মাধ্যমে বিভাগীয় অফিসার নিয়োগ দিয়ে তাদের নেতৃত্বে বাহিনী পরিচালিত হবে। আর সে লক্ষ্যে নেতৃস্থানীয় বিডিআরের জুনিয়র অফিসার ও সদস্যগণ ঘটনার পূর্বে তাদের দাবি সংবলিত লিফলেট প্রস্তুত করে মন্ত্রী, এমপি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিডিআরের সদর দফতর পিলখানা ও ঢাকা শহরে বিতরণ করে। প্রচারিত লিফলেট ও অন্যান্য দাবিসমূহের মধ্যে নিজেদের বিভাগীয় অফিসারদের বাহিনীর মূল নেতৃত্বে নিয়ে আসার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। অনুরূপ অবস্থার প্রেক্ষিতে ঘটনার পূর্ব রাতে পিলখানার বাইরে সিএস ১৩নং আসামি জাকারিয়া মোল্লার ভাড়া বাসায় রাতের অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে হাতে হাত রেখে ওরা শপথ গ্রহণ করে, যে কোন মূল্যেই তাদের দাবি আদায় করা হবে এবং প্রয়োজনে বিডিআরে নিয়োজিত সকল সেনা কর্মকর্তাকে তারা হত্যা করবে। যাতে ভবিষ্যতে আর কোন সেনা অফিসার বিডিআরে প্রেষণে আসতে সাহস না পায়। অন্যদিকে ২৪/০২/২০০৯ তারিখ রাত দশটায় পিলখানার অভ্যন্তরে জুনিয়র অফিসার জেসিও গোফরান মল্লিকের অফিসে আরও একটি মিটিং হয়। ঐ মিটিংয়ে সেনা অফিসারদের হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেয়া হয়। সাক্ষ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় ডিএডি তৌহিদুল আলম বিডিআর সৈনিকদের অস্ত্র নিয়ে সেনা অফিসারদের খতম করার নির্দেশ দেয়। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে সদর ব্যাটালিয়নের সিও এর অফিস কক্ষে মেজর আসাদকে ফিনিশ করার নির্দেশ দিলে হাবিলদার বেলায়েত, নায়েক আছাদ ও সিপাহী আমিনার মেজর আসাদকে গুলি করে হত্যা করে। যা ২৮নং সাক্ষী স্বচক্ষে দেখেছে, ৪৪৬নং সাক্ষী টেলিভিশনে ডিএডি তৌহিদকে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে দেখেছে। আলোচিত অন্য সাক্ষীদের বক্তব্য এবং ডিএডি তৌহিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দী মতে তিনি ২৫/০২/২০০৯ তারিখে পিলখানার অভ্যন্তরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পরে বিদ্রোহীদের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবন যমুনায় গিয়ে আলোচনাকালে পিলখানার অভ্যন্তরে সংঘটিত হত্যাকান্ডসহ সকল নৃশংস ঘটনা গোপন করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চাপ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি কোন সেনা অফিসার নিহত না হয় বা তাদের পরিবার পরিজনের কোন ক্ষতি করা না হলে সাধারণ ক্ষমা করা হবে। তিনি বিদ্রোহীদের অস্ত্রসমর্পণ ও সেনা অফিসারসহ পরিবারের সদস্যদের মুক্ত করে দেয়ার নির্দেশ দেয়ার পর ডিএডি তৌহিদ যমুনার মূল ফটকের সামনে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের সামনে প্রেসব্রিফিং কালে জানায়, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি মেনে নিয়েছেন এবং তিনি আমাদের সাধারণ ক্ষমা করেছেন।’ যা সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। এ আদালতে ভিডিও প্রদর্শনকালে উপরোক্ত বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর বিদ্রোহী প্রতিনিধি দল পিলখানায় এসে ডিএডি তৌহিদ নিজেকে বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালক ঘোষণা দিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়, যা ৪নং সাক্ষী কর্নেল মোঃ সামছুল আলম চৌধুরীর সাক্ষ্য থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র সমর্পণে কালক্ষেপণের মাধ্যমে নিহত সেনা অফিসারদের মৃতদেহ গণকবর দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেন। পর্যালোচনায় দেখা যায় ২৫/০২/২০০৯ তারিখের বিডিআর বিদ্রোহে তাৎক্ষণিকভাবে ডিএডি তৌহিদ লাভবান হয়েছেন। কারণ তিনি কিছু সময়ের জন্য কাল্পনিকভাবে নিজেকে বাহিনীর মহাপরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

চলবে...

লেখক : হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি