২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা

বিশ্ববিবেক এখনও জাগ্রত। মানবতার মর্যাদা রক্ষা এবং বিশ্বে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আবারও সুপ্রতিষ্ঠিত হলো। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন থামানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক আদালত। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) গণহত্যা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার যে আবেদন গাম্বিয়া করেছে, তা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছে। রায়ে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মিয়ানমারের প্রতি অবশ্য পালনীয় চারটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে আইসিজে। নির্দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ হলো- মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। রাখাইন রাজ্যে এখন যে রোহিঙ্গারা বাস করছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বা কোন পক্ষ এমন কিছু করতে পারবে না, যা গণহত্যা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। রাখাইনে এখন যে রোহিঙ্গারা আছেন তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য মিয়ানমারকে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোন নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেন কোন গণহত্যায় না জড়ায়, উস্কানি না দেয় কিংবা নির্যাতনের চেষ্টা না করে, সেজন্য মিয়ানমার সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাখাইন রাজ্য এক বিভীষিকা হয়ে উঠেছিল। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে যা ঘটেছিল তা গণহত্যা বৈ অন্য কিছু নয়। এই নৃশংসতা-বর্বরতা হিটলারের নাৎসী-গেস্টাপো বাহিনী, মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট বাহিনী আর একাত্তরে বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তুলনীয়। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বাড়ির পর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আগুন থেকে বাঁচতে যখন নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই প্রাণভয়ে ছুটেছে, তখন যুবকদের লক্ষ্য করে গুলি করেছে, কুপিয়ে হত্যা করেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে। এত কিছুর পর তাদের সামনে দেশত্যাগ ছাড়া কোন পথ খোলা ছিল না। তারা নাফ নদী পেরিয়ে, পাহাড় বেয়ে বাংলাদেশে ছুটে এসেছে। আগতদের অনেকে অমানবিক ধর্ষণ ও নির্যাতনের স্বাক্ষর বহন করেছে। একাত্তরে বাংলাদেশে হামলার হোতা ছিল সামরিক জান্তা। এর আগেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা হয়েছিল। তখন ক্ষমতা ছিল সামরিক জান্তার হাতে। সে দেশে ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে। কিন্তু নিপীড়নের অবসান ঘটেনি।

বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলার মানুষ অনেক মানবিক। নিজেরা দুঃখ-কষ্টে থাকলেও অন্যের দুঃখ-কষ্টে তাদের মন কাঁদে। এক এক করে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী স্বদেশ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সত্তায় একজন মমতাময়ী জননী মিশে আছেন বলেই একজন অসহায় রোহিঙ্গার অপমৃত্যু কিংবা অনিশ্চিত বিপদসঙ্কুুল জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি। সীমান্ত এক প্রকার খুলেই রাখা হয়েছিল ২০১৭ সালে, যাতে তাড়া খাওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় পেতে পারে। সরকার প্রধানের এই মানবিক গুণ সম্পর্কে গোটা বিশ্ববাসী জানে। মাদার অব হিউম্যানিটি অভিধা প্রদানের মধ্য দিয়ে এক ধরনের কৃতজ্ঞতাও জানানো হয়েছে তাকে। কিন্তু এরপর? বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের দেশ। তারও রয়েছে অসংখ্য সমস্যা ও সঙ্কট। ভূখ-ের তুলনায় জনসংখ্যা অত্যন্ত বেশি। তাই স্থায়ীভাবে এই নতুন ১১ লাখ (যা প্রতিদিনই বাড়ছে সন্তান জন্মদানের মধ্য দিয়ে) রোহিঙ্গা শরণার্থীকে স্থায়ীভাবে ভরণপোষণ এবং তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পর বাংলাদেশ নিশ্চয়ই আশা করতে পারে যে, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন দ্রুত ও নিরাপদ হবে।