২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বরিশালের বিচ্ছিন্ন নলচরবাসী ৪৮ বছর পর পাচ্ছেন বিদ্যুৎ

বরিশালের বিচ্ছিন্ন নলচরবাসী ৪৮ বছর পর পাচ্ছেন বিদ্যুৎ

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ আড়িয়াল খাঁ ও কালাবদর নদী ঘেরা ছোট্ট গ্রামটির নাম নলচর। সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন জনপদের নলচর গ্রামে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষের বসবাস। ওই গ্রামের সাথে ইউনিয়ন ও উপজেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। ইউনিয়ন সদর বা উপজেলা সদরের সাথে গ্রামবাসীর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ঘড়ির কাঁটা দেখে চলা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর পর এই প্রথমবার মুজিববর্ষকে সামনে রেখে বিদ্যুৎ যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন ওই গ্রামে। এরই মাঝে পুরো গ্রামজুড়ে বসেছে বিদ্যুতের খুঁটি। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে বিদ্যুতের তার টানানো ও বাড়ি বাড়ি মিটার সংযোগ দেওয়ার কাজ। তাই আনন্দিত গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ সবাই। ৭০ শতাংশ সোলার বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল নলচর গ্রামের মানুষের সরাসরি বিদ্যুত সংযোগ পাওয়ার আকাঙ্খা ছিল বহুদিনের। এতে করে নলচর গ্রামের ভাগ্য পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাষাবাদ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রে বিপ্লব আসবে বলে আশা করছেন গ্রামবাসী।

ওই গ্রামের বাসিন্দা সিরাজ খান বলেন, নলচরের মানুষ এতোটাই বিচ্ছিন্ন যে, মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা করতে হলে আধাঘন্টা সময় ব্যয় করে আড়িয়াল খাঁ নদী পার হয়ে তাদের ছেলে-মেয়েদের যেতে হয় দূরের বুখাইনগরে। বিদ্যুতের অভাবে এখানে অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। যে কারণে এ গ্রামে কোনো শিক্ষক বা চিকিৎসকও থাকতে চান না। এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও থাকেন না এখানে।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার জন্য মুমূর্ষু রোগীদের ট্রলারে করে যেতে হয় প্রথমে বুখাইনগরে। সেখান থেকে সড়কযোগে বেলতলা খেয়াঘাট, তারপর খেয়া পার হয়ে বরিশাল শহরের কোনো হাসপাতালে নেয়া হয়। এর মাঝে অনেক রোগীই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে।

অপর বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, শুধু শিক্ষা ও চিকিৎসাই নয়, এই গ্রামে কোনো ভালো মানের দোকানপাট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নেই যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাওয়া যায়। সড়কপথের উন্নয়ন না হওয়ায় এখনও গোটা নলচর গ্রামই চষে বেড়াতে হয় পায়ে হেঁটে। বিদ্যুতের অভাবে রাতের অন্ধকারে পথ হাঁটতে হয় হারিকেন বা টর্চ লাইটের আলোয়। সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলেও এ গ্রামের অনেক বাড়িতেই সোলার বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও তাতে যথাযথ প্রয়োজন মেটে না।

নলচর গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ আসলে আর কিছু হোক বা না হোক নলচরের মানুষ প্রযুক্তি ও আধুনিক বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হতে পারবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এই এলাকার মানুষের আর্থিক উন্নয়ন ঘটবে। সোলার বিদ্যুতের কারণে পুরো গ্রামে একটাও টেলিভিশন নেই, বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার না থাকায় তাদের প্রতিনিয়ত নেটওয়ার্ক বিরম্বনায় পরতে হয়। এছাড়াও যানবাহনবিহীন এই গ্রামে কেউ কোনো কাজে কোনো মটর ব্যবহার করতে পারেন না। সরাসরি বিদ্যুত আসলে সবকাজে বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে। মটরের মাধ্যমে যেমন গভীর নলকূপ থেকে পানি তোলা যাবে, তেমনি তা সেচকাজেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। মটরচালিত রিকসা, ভ্যানের ব্যবহারও শুরু হবে। ফলে প্রসার ঘটবে নতুন নতুন ব্যবসার।

বিদ্যুৎ আসার পর নলচর এলাকায় শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে করছে শিক্ষার্থীরা। লাবনী ও মারিয়া আক্তার নামের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়–য়া দুই শিক্ষার্থী বলে, প্রাথমিক ও নিন্ম মাধ্যমিকের কোনো শিক্ষকই গ্রামে থাকেন না। তারা সবাই প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বরিশাল শহরে থাকেন। কিন্তু এ গ্রামে বিদ্যুৎ আসার পর তাদের অনেকেই ফিরে আসতে পারেন। বিদ্যুৎ থাকলে গ্রামই শহরের সব সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে। তারা আরও জানায়, বিদ্যুৎ পেলে যেমন বিনোদনের জন্য টেলিভিশন দেখা যাবে, তেমনি উন্নত বিশ্বের অনেক কিছুই জানা যাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। সোলারের অল্প আলোতে পড়ালেখা করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় বলেও জানায় ওই দুই শিক্ষার্থী।

গ্রামের একমাত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠকর্মী হাবিবুর রহমান জানান, সাড়ে ছয় হাজার মানুষের নলচর গ্রামে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ছয়শ’। বিদ্যুৎ আসছে শোনার পর থেকেই মানুষের মাঝে কৌতূহল বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে গ্রামের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ও সড়কের পাশে খুঁটি বসানো হয়েছে। এখন তার টানানোর কাজ শুরু হবে। প্রতিটি কাজেই গ্রামের মানুষকে সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ আসার পর সদর উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন নলচরের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে বলে সবার বিশ্বাস।

এ ব্যাপারে বরিশাল-৫ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম বলেন, মনে হয় আমিই প্রথম সংসদ সদস্য যে ওই গ্রামটি পরিদর্শন করেছি। উপজেলা চেয়ারম্যানও কখনো ওই বিচ্ছিন্ন গ্রামে যাননি। আমি যখন ওই গ্রামে গিয়েছিলাম তখন ওখানকার লোকজনই এ কথা আমাকে বলেছিল। ওই এলাকা, এলাকার মানুষ এক কথায় বরিশাল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ঘরে ঘরে বিদ্যুত এ প্রতিশ্রুতি শতভাগ সফল করতে ইতোমধ্যে আমরা ওই গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়েছি। কিছু সোলারের সড়ক বাতিও দিয়েছি। আশা করি মুজিববর্ষের মধ্যে সবাই ভিন্ন ধরনের নলচরকে দেখতে পাবো। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নলচর গ্রামের মতো নদীবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ এলাকাতেও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সংযোজনের কাজ শুরু হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।