২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাম

  • মারুফ রায়হান

দিবাভাগে ঢাকা রোদ্দুরে ভাসছে, যদিও সকালবেলাটায় কুয়াশা তার চাদর বিছিয়ে রাখছে প্রায়শই। রাতে সহনীয় শীত। মৌসুমের শেষতম শৈত্যপ্রবাহ এসে বিদায় নিলেই বইবে ফাল্গুনী হাওয়া। তারই প্রত্যাশা ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত মহানগরবাসীর অনেকেরই অন্তরে।

সিটি নির্বাচনে

শব্দদূষণ পরিবেশ দূষণ

মফস্বল হলে হয়তো অতখানি বিরক্তি ও বিড়ম্বনা বলে মনে হতো না। মহাব্যস্ত মহাভারাক্রান্ত মহানগরী বলেই বিষয়টি দৃষ্টিকটু, অসহনীয় ও দুর্ভোগের বলে মনে হচ্ছে। অলিগলিসহ প্রতিটি সড়কের শীর্ষে দড়ি টাঙিয়ে সারবাঁধা পোস্টার ঝোলানো হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ কয়েকটি মোটরযান মাইকে নির্বাচনী গান কিংবা আহ্বান প্রচার করছে অত্যন্ত উচ্চস্বরেÑ এইসব বিয়েবিয়ে ভাব নিয়ে এলেও বড়ই দৃষ্টিকটু ও শ্রবণযন্ত্র তথা মনের জন্যে অসহ্য পীড়নের। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণার ধরন এমনই। নির্বাচনী আমেজে এখন সরগরম রাজধানী ঢাকা। সব মেয়র প্রার্থীই রাজধানী ঢাকায় বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু লক্ষণীয় হলো- ভোটের প্রচারণায় এবার বেশ জোরেশোরেই যোগ হয়েছে দূষণ সংস্কৃতি! ‘পলিথিন মোড়ানো কাগজের পোস্টারে’ ছেঁয়ে গেছে ঢাকা শহর। বহু জায়গায় আবার বেশ মজবুত করে লেমিনেট করা পোস্টারও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রার্থীর পলিথিন মোড়ানো পোস্টার এমনভাবে তৈরি যার বিনাশ কঠিন। বলাবাহুল্য ভোটের আগে পোস্টার লাগানোর লোকের অভাব হয় না, কিন্তু ভোট শেষে পোস্টার অপসারণ করার লোকের ততই অভাব! তাহলে এসব লাখ লাখ পলিথিন মোড়ানো পোস্টারের শেষ ঠিকানা কী ড্রেন, নালা-নর্দমা, খাল-নদী! ঢাকা শহর নানাবিধ দূষণে জর্জরিত, তার ওপর এই নিষিদ্ধ পলিথিনের ছড়াছড়ি পরিবেশ দূষণকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী পলিথিনের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। সব মেয়র প্রার্থী নতুন ঢাকা গড়ে তোলার কথা বলছেন, দূষণমুক্ত ঢাকা গড়ার কথা বলছেন। তবে নগরের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কাছ থেকে এমন পরিবেশবিনাশী কর্মকা- কি আশা করা যায়? প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত তো বটেই দূষণমুক্ত ঢাকা গড়াই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত ঢাকা গড়ার কথা বলে পলিথিন মোড়ানো পোস্টারে শহর নোংরা করা কতটা সমীচীন। পলিথিন মোড়ানো পোস্টারের ব্যবহার এর আগেও দেখা গেছে, তবে এখনকার মতো এত ব্যাপকমাত্রায় ছিল না। শুধু পলিথিন দূষণ নয়, ভোটে শব্দদূষণও যে হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী প্রচারে মাইক, লাউড স্পিকার বা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে এমন কিছু ব্যবহারে নির্ধারিত সময়ের (দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত) পরও এগুলো বাজিয়ে শব্দদূষণ করা হচ্ছে। কোন কোন নির্বাচনী ক্যাম্পগুলোতে অহরহ মাইকের ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার উচ্চৈঃস্বরে হর্ন বাজিয়ে কোথাও দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে মোটরসাইকেল।

আলোচিত ভবন অবশেষে ভাঙন

বহু সময় গড়িয়েছে, লাখ কেন, কোটি কথা হয়েছে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। রাজধানীর হাতিরঝিলে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিজিএমইএ ভবন অবশেষে ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। ৬ মাসের মধ্যে শেষ হবে ভবনটির অপসারণ। রাজউক, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ভাঙ্গার কাজ মনিটর করছে। দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলের উপরে অপরিকল্পিত ও বেআইনীভাবে গড়ে উঠেছিল বিজিএমইএ ভবন। হাতিরঝিলের খালের ভেতর গড়ে ওঠা ভবনটিকে অনেকে বলতেন বিষফোঁড়া। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই ভাঙ্গা হচ্ছে এ ভবন। শুরু থেকেই পরিবেশবাদীরা এ ভবনের বিরোধিতা করে আসছিলেন। পরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিবেশবাদীরাসহ সাধারণ মানুষের একটি ইচ্ছার বাস্তবায়ন হলো। আসলে ঢাকা ‘যেমন ইচ্ছে যা খুশি করব’-মার্কা শহরের রূপ নিয়েছে। যে যেভাবে পেরেছে স্থাপনা গড়ে তুলেছে, ভরাট করেছে খাল। পৃথিবীর যে কোন উন্নত শহরে রাস্তার মোট আয়তন হয় শহরটির আয়তনের ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ। অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের কারণে ঢাকায় রাস্তার পরিমাণ হচ্ছে এই শহরের মোট আয়তনের মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ। ঢাকা এখন পৃথিবীর বসবাসঅযোগ্য শহরগুলোর তালিকার শীর্ষসারিতে চলে এসেছে। বিজিএমইএ ভবন ভাঙার ঘটনাটি অবশ্য নিয়ম ও শৃঙ্খলাকে বুড়ো আঙুল দেখানোদের জন্যে একটি সতর্কবার্তা বটে।

সাহিত্য পুরস্কার

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার পরে আমাদের নিস্তরঙ্গ সাহিত্যমহলে একটু তরুঙ্গ ওঠে। এবার বাংলা একাডেমিতে কর্মরত একজন গবেষকও পুরস্কৃত হয়েছেন। এ নিয়ে পশ্ন তোলা হলো সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। বিষয়টি এমন- বাংলা একাডেমিতে কর্মরত কেউ কি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেতে পারেন? ন্যায়নিষ্ঠতার দিক থেকে পাওয়ার কথা নয় এমন কথাও বলছেন বিদ্বৎজনেরা। এমন চর্চা মন্দ উদাহরণ তৈরি করে কি না সে প্রসঙ্গও আলোচিত হচ্ছে। আইন কী বলে? কেউ জানাবেন?

এই প্রশ্নের জবাবে কয়েকজন সুপরিচিত ব্যক্তি কী লিখলেন দেখুন। এ থেকে লেখক-সমাজের হৃৎস্পন্দন সম্পর্কে কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে বৈকি। সঙ্গত কারণেই কারোরই নাম উল্লেখ করলাম না। স্মরণযোগ্য একটি সংবাদপত্র প্রতি বছর সেরা বইয়ের পুরস্কার দিয়ে থাকে। এতে ওই সংবাদপত্রে কর্মরত লেখকেরা পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য বিবেচিত হন না। যদিও পত্রিকাটির সহযোগী প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত বই পুরস্কৃত হয়ে থাকে বটে।

১. বাংলা একাডেমিতে কর্মরত একজন লেখক বাংলা একাডেমি পুরস্কার অবশ্যই পেতে পারেন। এ বছর ফোকলোরে পেয়েছে প্রীতিভাজন সাইমন জাকারিয়া। সে বাংলা একাডেমির একজন মেধাবী কর্মী-কর্মকর্তা। ওর আগে কবি রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সুব্রত বড়ুয়া, সেলিনা হোসেন, রশীদ হায়দার, মুহম্মদ নূরল হুদাসহ আরও কেউ কেউ এই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন যখন, তখন তাঁরাও বাংলা একাডেমির কর্মী ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মী হওয়ার অজুহাতে বা অপরাধে মেধাবী একজন লেখককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা কি ঠিক?

২. তার কোন পরিচয়টা বড়, বাংলা একাডেমিতে কর্মরত নাকি লেখক, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কোন কোন প্রসিদ্ধ লেখকও বাংলা একাডেমির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, আছেন, থাকবেন, বাংলা একাডেমির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তাদের পুরস্কার বঞ্চিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি বাংলা একাডেমির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে বা প্রভাবে সুলেখক নন বা যোগ্যতর কাউকে বঞ্চিত করে একাডেমি সংশ্লিষ্ট কারও পুরস্কার পাওয়াও অনৈতিক।

৩. আমার মনে হয়, বিষয়টি যোগ্যতার নয়, নীতির। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডকটর অব ল ডিগ্রী দিতে চেয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, চ্যান্সেলর হয়ে আমি তো এটা নিতে পারি না। বাংলা একাডেমিতে চাকরিরত কেউ নিজ যোগ্যতায় এটা পেতেই পারেন। এখানে একাডেমির কেউ কমিটিতে না থাকলেই ভাল। একটা কথা। একাডেমির বাইরের যারা এটি পেয়েছেন, তাদের কাউকে কাউকে নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

এসে গেল বইমেলা

মাঝখানে কদিন, এরপর রবিবারে শুরু হচ্ছে একুশের বইমেলা। কাজের দিনে, মানে কর্মদিবসে বইমেলার শুরু। ওই দিন আবার কবিতা উৎসবেরও সূচনা। এবার ১ ফেব্রুয়ারি সিটি নির্বাচন বলে বইমেলা ও কবিতা উৎসব ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে শুরু হচ্ছে ২ তারিখে। ব্যতিক্রমী ঘটনা বটে।

চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে লেখক-প্রকাশকদের। পাঠকদেরও কি নয়? ধরা যাক লেখক-প্রকাশক মিলিয়ে সংখ্যাটা যদি হয় এক হাজার, তবে পাঠকের সংখ্যা কত? প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যান বইমেলায়, একুশে ফেব্রুয়ারিতে লাখো মানুষ। শুক্রবারেও লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। এদের সবাই অবশ্য বই কেনেন না। পড়েন কি? বইয়ের ক্রেতা ও পাঠক লক্ষ্যযোগ্যভাবে বাড়ছে না। অথচ প্রতিবছরই নতুন প্রকাশক আসছেন, নতুন লেখকেরও জন্ম হচ্ছে। বই নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় মেলা একুশের বইমেলায় বইয়ের বিক্রয়লব্ধ অর্থ আগের বছরের হিসাবকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে নানা সীমাবদ্ধতা, আক্ষেপ ও অভিযোগ সত্ত্বেও বইমেলা বাণিজ্য-বিচারে তার সাফল্য বজায় রেখেছে। আগে বাংলা একাডেমির মাঠে মেলাটি হতো। প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে গেল যে গাদাগাদি- ঠাসাঠাসি একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে বইমেলাটি চলে এল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তবে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিল বইমেলাটি বড় কোন জায়গায় অনুষ্ঠিত হোক। অবশ্য এখনও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ বইমেলার অংশ বটে। এ কথা আমাদের বার বার বলতে হবে যে, বই হলো অনন্য পণ্য, যা নিবেদিত হয় মহাকালের উদ্দেশে। তাই কালের মহার্ঘ্য হতে হলে তাকে হতে হয় যোগ্য, সম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ এবং সূচাররূপে প্রকাশিত। সে কারণেই পাণ্ডুলিপি উত্তমরূপে সম্পাদনা ও গ্রন্থ মুদ্রণ প্রমাদমুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু কয়জন গ্রন্থ উৎপাদক বা প্রকাশক এই শর্তগুলো পূরণ করেন? সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সফল বইমেলা করতে হলে মুক্ত মত গ্রহণের বিকল্প নেই।

আমরা বলতেই পারি ‘বইপ্রিয় বাঙালীর অনন্য এক মেলা’ আমাদের একুশের চেতনাকে প্রতিবছর সমুন্নত করছে। এটা সত্যি যে নানা দিক দিয়ে একুশের বইমেলাটি অনন্যই বটে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, বাংলা ভাষার প্রতি ভালবাসা এ সবই কোন না কোনভাবে প্রকাশিত হয়ে চলে পুরোটা মাস। লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মিলন মেলাই বটে এই বইমেলা। ভুলে গেলে চলবে না শুধু একুশের বইমেলাকে উপলক্ষ করেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশের লেখক-পাঠকরা মাতৃভূমিতে ফেরেন। বিশ্বের আর কোন দেশে এতগুলো দিন, মানে মাসজুড়ে বইমেলা হয় না। কোন মেলায় হুড়মুড় করে হাজারও দর্শক এবং পাঠক-ক্রেতা মেলায় প্রবেশের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে না। প্রত্যেক মেলায় কয়েক হাজার করে বই প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু ভাল বই বা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ নির্বাচন করতে গেলে হতাশা এসে ভর করে। তার পরও মানসম্পন্ন না হলেও লেখকদের, বিশেষ করে নবীন-তরুণ লেখকদের বই প্রকাশ বা লেখালেখির সঙ্গে সংযুক্ত থাকা ইতিবাচক একটি কাজ। সাহিত্য বা সংস্কৃতিচর্চায় যতক্ষণ নিয়োজিত থাকেন তরুণরা ততক্ষণ মাদকের মতো নেশার হাতছানি বা অন্যান্য অপকর্ম থেকে তারা মুক্ত থাকেন- এই সামাজিক বাস্তবতাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। তাই যার যা খুশি লিখুন, বই বের করুন, বন্ধুদের বই উপহার দিন। এই কর্মকাণ্ড থেকেই আগামীতে বেরিয়ে আসবে নতুন পথরেখা। তাই নিয়ন্ত্রণ নয়। তবে এটা ভুললে চলবে না যে কোন লেখকের পা-ুলিপি অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ সম্পাদক দ্বারা সম্পাদিত হওয়ার পর প্রকাশ করাই বাঞ্ছনীয়; আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও সেটা। শত শত প্রকাশকের মধ্যে ক’জন এটা জানেন? জানলেও মানেন?

২৬ জানুয়ারি ২০২০

[email protected]