২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গবেষণায় সাফল্য

  • চারটি নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেছেন ড. বেলাল হোসেন। তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। তার শিক্ষকতা ও গবেষণা-জীবন নিয়ে লিখেছেন- হাসিব আল আমিন

স্কুল জীবনে হতে চেয়েছিলেন পাইলট, কলেজ জীবনে হতে চেয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই স্বপ্ন হয় শিক্ষক ও গবেষক হওয়ার। ড. বেলাল হোসেনের আরও একটি পরিচয়– তিনি একজন কৃতী গবেষক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি মৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। গবেষক হিসেবে তার অর্জন হলো প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে যিনি প্রাণী জগতের চারটি নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেছেন। ফলে তার সুনাম ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে।

জন্ম তার কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায়। বাবা আবদুস সোবাহান ভুঁইয়া বন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের সবার বড় বেলাল। তার সহধর্মিণী ড. শারমিন রহমান অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি সম্পন্ন করেছেন। গ্রামেই কেটেছে তার শৈশব। তিনি বলতে ভালবাসেন, ‘আমি গ্রামের ছেলে।’ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স এ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের ছাত্র তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি সেখানেই তার গবেষণা-জীবনের শুরু। এরপর মাস্টার্স করেন কমনওয়েলথ স্কলার্শিপের অধীনে ইংল্যান্ডের হাল ইউনিভার্সিটিতে। যোগ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায়। ২০০৮ সালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ এ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দুই বছর পর শিক্ষা ছুটিতে চলে যান পিএইচডি করতে ব্রুনাইয়ের বিখ্যাত দারুস সালাম ইউনিভার্সিটিতে। অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেছেন। বললেন, ‘২০০২ সাল থেকে গবেষণা শুরু করে আজ অব্দি চালিয়ে যাচ্ছি।’ ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ‘ন্যাফটাইস বাংলাদেশী’ নামের একটি অমেরুদণ্ডী পলিকীটের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। ব্রুনাইয়ে থাকাকালীন সেদেশের সাগর উপকূল চষে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে ‘ভিক্টোরিওপিসা ব্রুনেইয়েনসিস’ নামের আরেকটি অমেরুদণ্ডী এ্যাম্পিপোডের নতুন দুটি প্রজাতি আবিষ্কার করেন। সেগুলো নিয়ে গবেষণাও করছেন ড. বেলাল হোসেন।

২০১৮ সালে এই কৃতী অধ্যাপক নোয়াখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে আরও দুটি ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ ও ‘এ্যারেনুরাস স্মিটি’ নামের নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেন। প্রথমটির নাম দিয়েছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ( নোবিপ্রবি) নামে। দ্বিতীয় প্রাণীটির নাম দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত একারোলজিস্ট হ্যারি স্মিথের নামে। এগুলো সম্পর্কে বললেন, ‘আমার এ আবিষ্কার দুটি প্রাণী জগতের আর্থোপোডা পর্বের একারিয়া বর্গের; খুবই ছোট, দেখতে কিছুটা মাকড়সার মতো। ‘মাইটস’ নামে তারা পরিচিত। আকারে দুটি প্রাণিই দুই থেকে তিন মিলিমিটার মাত্র। একেবারে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হয়। বর্ণ হালকা লাল ও হলুদের মিশেল। দুটি শুঁড় ছাড়া চার জোড়া সন্তরণ পা থাকে। সাধারণত পুকুর, নদী বা খালের পানির ওপরের স্তরে ভাসমান উদ্ভিদের সঙ্গে ঝুলে ভেসে বেঁচে থাকে। খাবার হিসেবে উদ্ভিদকণা খায়। তবে লার্ভা অবস্থায় অন্য জলজ প্রাণীর দেহে পরজীবী হিসেবে বাস করে, তাদের কাছ থেকে খাবার জোগাড় করে। একেবারে ছোট এই প্রাণগুলোই জীবজগতের খাদ্যচক্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ’

তার এই দুটি প্রাণের আবিষ্কারে সহ-গবেষক ছিলেন মন্টেনিগ্রোর বিখ্যাত একারোলজিস্ট ড. ভøাদিমির, ভারতের ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যাপক তাপস চ্যাটার্জি, পোল্যান্ডের শেচিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রজেল জয়েল ও তার ছাত্র সাইফুল ইসলাম। চার দেশের পাঁচ গবেষকের একত্রে টানা গবেষণায় দুটি প্রজাতি আবিষ্কার করা গেছে। এরপর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের আন্তর্জাতিক জার্নাল বায়োটাক্সা. অর্গ-এ পাঠান তারা। পরের বছরে ১৪ মে ‘ঋরৎংঃ ৎবপড়ৎবফং ধিঃবৎ হঁঃবৎং ভৎড়স ইধহমষধফবংয (অপধৎর, ঐুফৎধপযহরফরধ) রিঃয ঃযব ফবংপৎরঢ়ঃরড়হ ড়ভ ঃড়ি হবি ংঢ়বপরবং’ শিরোনামে গবেষণাটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সেই দিনই সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও নামকরা ডাটাবেজ ুড়ড়নধহশ (জুব্যাংক)-এ সেগুলো যুক্ত হয়। ফলে প্রজাতি দুটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ‘স্থলজ মাইটস’ নামের প্রাণ যেমন– ছারপোকা, মাকড়সা ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা হলেও জলজ মাইটস নিয়ে তাদের আগে বাংলাদেশে কোন গবেষণাই হয়নি। গবেষণার অপ্রতুলতায় বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলসহ অন্যান্য জায়গার জীববৈচিত্র্যের পূর্ণ তালিকা তৈরি করা যায়নি। তবে আশাবাদী গবেষক বেলাল বলেন, ‘এখন থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজে এগিয়ে আসবে। আমাদের আবিষ্কার দুটির মধ্যে নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়ার নাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ‘নোবিপ্রবি’র সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছি।’ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য নিয়ে ব্যাপক গবেষণা সম্ভব হবে বলে এই প্রাণী বিজ্ঞানী জানিয়েছেন। নতুন পাওয়া এই প্রাণীগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? তার উত্তরটি হলো, ‘বাস্তুসংস্থানে যে খাদ্য শৃঙ্খল আছে, তাতে নানা স্তরের খাদক আছে। প্রতিটি স্তরের খাদক অন্য স্তরের খাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে আছে। যে প্রাণীগুলো আবিষ্কার করেছি এগুলো প্রথম স্তরের খাদক। তাদের খেয়েই খাদ্য শৃঙ্খল শুরু হয়।’ গবেষক বেলাল বর্তমানে আবিষ্কৃত প্রজাতিগুলোর ডিএন এ নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া ইমারজেন্ট পলুটেন্ট যেমন এ্যান্টিবায়োটিক, হেভি মেটাল, মাইক্রোপ্লাস্টিক ইত্যাদি নিয়েও গবেষণা করছেন। খুব তাড়াতাড়িই ফলাফল পাবেন বলে আশাবাদী। গবেষণা কর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকরা যথেষ্ট সাহায্য করেন। তিান বলেন, ‘অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হয়। সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড থাকে না। এ গবেষণার পুরো টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়েছি। এর আগে যে দুটি আবিষ্কার করেছি, সেগুলোও বিদেশের গবেষণা ফান্ড– অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের। বর্তমানে এ ধরনের গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যথেষ্ট অনুদান রয়েছে।’ নিজেকে আপাদমস্তক শিক্ষক বলতে ভালোবাসেন। এই পেশা বেছে নিয়েছি কারণ ‘আমার শিক্ষকতার প্রতি ছোটবেলা থেকে দুর্বলতা আছে। যখন ইংল্যান্ডে পড়তে গিয়েছিলাম, সেখানে থাকা অনেকের কাজ স্বপ্নের মতো দেখেছি। আমার সেই দেশে থাকার সুযোগ পেয়েও চলে এসেছি। কারণ বাংলাদেশে থেকে নিজে শিখব ও ছাত্রছাত্রীদের শেখাব। সব সময় চেয়েছি, এমন এক পেশা হবে আমার যেখানে সৎ থাকা যাবে, শেখা ও শেখানো যাবে। ’

নতুন যারা গবেষণা করতে চান, তাদের জন্য বাংলাদেশের এই অধ্যাপকের অনুরোধ, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান বাড়ানোর বিরাট ক্ষেত্র, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য সেরা। ছাত্রছাত্রীরা যদি প্রথম বর্ষ থেকেই গবেষণামুখী হন, তাহলে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবেন।’