২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সময় গড়িয়েছে, কাঠামো বদলায়নি

  • মিলু শামস

ইংরেজ কবি ও পার্লামেন্টারিয়ান টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে প্রণীত শিক্ষানীতি সমাজে একটি গোষ্ঠী তৈরি করেছিল, যাঁরা দেশের জনগণের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের উঁচুস্তরের মানুষ মনে করতেন। ম্যাকলের মনের ভাবটিও ছিল তাই। ‘এই শিক্ষা ব্যবস্থা এখানে অনেক কালো সাহেবের জন্ম দেবে। গায়ের রং পাল্টানো না গেলেও এ নতুন শিক্ষিতরা ইংরেজ স্বার্থ উদ্ধারে আত্মনিয়োগ করবে।’ ইংরেজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যাঁদের তৈরি করা হয়েছিল ম্যাকলে প্রণীত শিক্ষানীতি অনুযায়ী সেই বিচ্ছিন্ন এলিটদের হাতেই নিম্নবিত্তের শিক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু এ দায় তারা কখনও নেয়নি। কৃত্রিম সামন্ত শ্রেণী থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্তি ঘটলেও এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জাতীয় বুর্জোয়ার চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারেনি যে নিজেদের উন্নয়নের সঙ্গে গোটা দেশের উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করে ভাবতে পারবে।

ইংরেজের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নে পুরো ভারত একটি একক শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে এলো ঠিকই এবং মুঘল-পাঠান আমলের পাঠশালা টোল-চতুষ্পাঠী-মাদ্রাসার ঘেরাটোপ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা মুক্তিও পেল কিন্তু ভারতবাসীর সার্বিক উন্নতির মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তো তারা শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেনি। সুতরাং শিক্ষার ভিত রয়ে গেল নড়বড়েই। এ দেশীয় সম্পদ লুটপাটে সহায়তা দেয়ার জন্য যতটুকু শিক্ষা বিতরণ করা দরকার ছিল তারা ততটুকুই করেছে। যদিও তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার কথা এক পর্যায়ে তারাই বলে গেছে, ব্রিটিশ সরকারের সার্জেন্ট কমিশন উনিশ শ’ চুয়াল্লিশ সালে। বলেছে চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার কথা। ওই প্রস্তাবের ছেচল্লিশ বছর পর এ দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা সম্ভব হয়েছে। এই একটি উদাহরণই প্রাথমিক শিক্ষার গতিশীলতা বোঝার জন্য যথেষ্ট। মাঝের ঐতিহাসিক পথপরিক্রমায় প্রাথমিক শিক্ষার তেমন অগ্রগতি হয়নি। কেননা, ভারত ছাড়ার আগে যে রাজনৈতিক কূটচাল তারা খেলে গেছে, শিক্ষা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব পলিসিতে; তার প্রভাব এখনও রয়েছে। গত শতকের ত্রিশের দশকে একজন প্রাথমিক শিক্ষক বেতন পেতেন সরকারী অফিসের পিয়নের বেতনের চেয়েও কম। এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন কৃষক পরিবার থেকে আগত এবং কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই প্রথম কি দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে ঝরে যেত। এ চিত্রের খুব বেশি পরিবর্তন এখনও হয়নি। অথচ সেই চুয়ান্ন সাল থেকে শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম কম হয়নি। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার গায়ে এসবের আঁচ প্রায় লাগেইনি। স্বাধীনতার পর প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) পাঁচ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরির কথা বলা হয়েছিল। দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে পুরোপুরি জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত থেকেই ওই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল; যা বাস্তবায়িত হলে সব প্রাথমিক বিদ্যালয় হতো সরকারী প্রতিষ্ঠান। চুয়াত্তর সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রাথমিক শিক্ষাকে পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করার সুপারিশ করে এবং তিরাশি সালের মধ্যে একে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করার প্রস্তাব দেয়। সেই চুয়াল্লিশ সালের প্রস্তাব একাত্তর সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য ফর্মে উপস্থাপিত হয়। এর পর পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পালা বদলে অনেক ওলটপালট হয়। প্রাথমিক শিক্ষাকে পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা এখনও সম্ভব হয়নি। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় শিক্ষানীতিতে আবারও জোরালোভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা জটিলতার আবর্তেই পাক খাচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করার যে প্রস্তাব শিক্ষানীতিতে রাখা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, এটা করতে হলে সরকারী-বেসরকারীসহ প্রায় আশি হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ এবং অবকাঠামো সুবিধা বাড়াতে হবে। এ সংক্রান্ত যেসব প্রস্তাব এসেছে তা বাস্তবায়ন করতে যে টাকা ও অবকাঠামো সুবিধা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করতেই নাকি ছয়-সাত বছর লাগবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির সম্ভাবনাও নাকি এতে রয়েছে। কারণ, ব্যবস্থাটা তখন দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। অর্থাৎ আবারও ঝুলে গেল।

দুটো প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের দু’হাজার এগারো সালের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার উপযোগী সব শিশুকে স্কুলে পাঠানো ও ঝরে যাওয়া রোধ এবং দু’হাজার চৌদ্দ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করা। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে এখনও প্রায় সতেরো হাজার গ্রামে সরকারী-বেসরকারী কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। শিক্ষকদের জীবনমান বা সামাজিক মর্যাদার কোন উন্নতি হয়নি। বছরের শুরুতে ছাত্রছাত্রীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বঞ্চিতদের দেশে জিপিএর বন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে শহুরে শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে প্রায় সব মহলের হাততালি কুড়িয়েছে। কিন্তু এতে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান কতটা বাড়ছে তার খোঁজ কি রাখেন অভিভাবক কিংবা বাহবা দেয়া বুদ্ধিজীবীরা? শিক্ষা প্রতিযোগিতাকে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই বা কতটুকু? পৃথিবীর অনেক দেশে যেখানে পরীক্ষা পদ্ধতি কমিয়ে আনার জন্য নানান নীরিক্ষা চলছে সেখানে আমাদের দেশে পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিয়ে শৈশবকে বিপর্যস্ত করা হচ্ছে। এর মানসিক ক্ষতির দিক নিতান্ত কম নয়। এক সময় প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার পর শিক্ষকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলÑ শতকরা পনেরো নম্বর পেলেও পাস করিয়ে দেয়ার। কোথাও কোথাও নাকি পরীক্ষায় অংশ নিলেই পাস নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এই পাস, এই জিপিএ ফাইভওয়ালা শিশুদের গন্তব্য আসলে কোথায়, তা শিক্ষামন্ত্রীরাই ভাল বলতে পারবেন।

শিক্ষামন্ত্রীর হাসিহাসি মুখ আর অভিভাবকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে এ তথ্যও আসে যে, পলিটিক্যাল পাসের এই রমরমায়ও শতকরা বিশ ভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে। আরেক জরিপে জানা যায়, প্রাথমিক স্তরের শতকরা আশি ভাগ শিক্ষার্থী মানসম্পন্ন শিক্ষা পায় না। অর্থাৎ শিক্ষা যাঁরা দিচ্ছেন সেই শিক্ষকদেরই পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব রয়েছে।

সবচেয়ে অবহেলিত পেশা এ দেশে প্রাথমিক শিক্ষকতা।

টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সৃষ্ট জমিদার শ্রেণী থেকে আসা শিক্ষিত এলিটদের হাতে প্রাথমিক শিক্ষার ভার দিয়েছিলেন জেনেশুনেই যে, এরা কখনও সমাজের মূল স্রোত নিম্নবর্গের মানুষের কাছে আসলে পৌঁছতে পারবে না। ওরা যে অন্ধকারে আছে সেখানেই থাকবে। আজ উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে যে দুর্বৃত্তায়ন চলছে এবং তা থেকে যে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেরিয়ে আসছে তারা অজপাড়াগাঁয়ের কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিকানা জানে না। তাদের জানার প্রয়োজনও নেই। কারণ ওখানে শিক্ষকতার মতো হীন পেশার কথা তারা স্বপ্নেও ভাবে না। ভাবার বাস্তবতাও সত্যি সত্যি নেই। এই বাস্তবতা যেদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে সৃষ্টি হবে অর্থাৎ বৈষম্য দূর হবে আশা করা যায় সেদিন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। আমাদের মতো অনুন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোয় সহসা কোন মৌলিক পরিবর্তন আসা কঠিন কিন্তু পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে থেকেও অপেক্ষাকৃত কম বৈষম্যপূর্ণ এবং মানবিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা সম্ভব।