২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ দুর্নীতিগ্রস্ত মেয়র চাই না

  • কবীর চৌধুরী তন্ময়

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কলম্বীয় সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকাশক ও রাজনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষের তিনটি জীবন থাকে : একটি জনসমক্ষের জীবন, একটি ব্যক্তিগত জীবন, আরেকটি গোপন জীবন।’ আমার এই লেখায় আমি ‘জনসমক্ষের জীবন’কে গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ, জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করবে বা জনগণকে যিনি স্বপ্ন দেখাবেন, তার ‘জনসমক্ষের জীবন’টি অন্য জীবনগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে। অথবা ব্যক্তিগত-গোপন জীবন বলে কিছু থাকবে না। জীবন ও জীবিকার বিষয়টি হতে হবে স্বচ্ছ, যা জনগণ পরিষ্কারভাবে পড়তে পারবে, পারবে ভালভাবে বুঝতে ও জানতে।

স্থানীয় নির্বাচন হলেও ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-২০২০ এখন আর স্থানীয় নির্বাচন বলে মনে করার কোন অবকাশ নেই। এখানে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। আর দলীয়ভাবেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে অন্যান্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের নিয়েই হৈচৈ কিংবা আলোচনা-সমালোচনা দৃশ্যয়মান। নির্বাচনী প্রচারের বিধিনিষেধ নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছে সবাই। নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষও মৌখিকভাবে সতর্ক করা ছাড়া কাউকে কোন ধরনের নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে নির্বাচনী আইন প্রয়োগ করতে দেখিনি। এমনকি, সরস্বতী পূজার অধিকার আন্দোলনের কাছে স্বয়ং নির্বাচন কমিশনও আইনকে পাশ কাটিয়ে ভোটের দিন-তারিখ পিছিয়ে দিয়েছে!

শুধু তাই নয়, বিএনপির মনোনীত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রার্থী ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, দুর্নীতির বিচারকাজ চলমান হলেও সে তার বাবার মতোই মেয়র হতে চায়! তার বাবা কী ধরনের তহবিল তসরুফ করেছে- এটি রাজধানীর সিনিয়র সাংবাদিক কিংবা ঢাকাবাসী অবগত। সাদেক হোসেন খোকা মেয়র থাকাকালে কী ধরনের দুর্নীতি করেছেন, নগরবাসীর জীবনমান কীভাবে অসুস্থকর করে তুলেছেন- এটি ঢাকায় বসবাস করা মানুষজন ভুলে যায়নি। কিন্তু অবাক হলেও সত্য, ইশরাক এক প্রকার তার বাবার মতোই মেয়র হব বলে তার দুর্নীতি করার স্বপ্নকেই যেন ঢাকাবাসীর সামনে তুলে ধরেছে!

জানা যায়, ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ইশরাক হোসেন এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সম্পদের বিবরণী দুদকে দাখিলের নোটিস দেয়া হয়। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর দুদকের কনস্টেবল তালেব কমিশনের নোটিসটি জারি করতে তাদের বাস ভবনে যান। কিন্তু ইশরাক হোসেন সেখানে উপস্থিত না থাকায় উপস্থিত চারজনের (সাক্ষী) সামনে বাস ভবনের নিচতলায় প্রবেশ পথের বাঁ পাশের দেয়ালে স্কচটেপ দিয়ে ঝুলিয়ে নোটিসটি জারি করেন। দুদকের দেয়া ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ইশরাক হোসেন সম্পদের হিসাব নির্ধারিত ফরমে দাখিল করেননি। এ ঘটনায় ২০১০ সালের ২৯ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক সামছুল আলম। ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন। ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ইশরাক আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে (১৫ জানুয়ারি) অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। অভিযোগ গঠনের ফলে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজও শুরু হয়েছে। সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ও চলমান বিচারকাজের পরেও একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে এটা অবাক করার বিষয় বৈকি।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনীত উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনের প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের অর্থ পাচারের রেকর্ড এখন আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত-সমালোচিত। শুধু তাই নয়, প্যারাডাইস পেপার্সে নাম আসা ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তাবিথ আউয়ালকে ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে নির্বাচনী হলফনামায় সিঙ্গাপুরে থাকা মিলিয়ন ডলারের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এই প্রার্থী। এ বিষয়ে আমিও ব্যক্তিগতভাবে আপীল বিভাগের (অব) বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের সঙ্গে (২৩ জানুয়ারি, ২০২০) নির্বাচন কমিশনার মোঃ রফিকুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ ও তাবিথের নির্বাচনী হলফনামায় তথ্য গোপন করার প্রমাণাদি প্রদান করেছি। ‘তাবিথের বিরুদ্ধে হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ নিয়ে ইসিতে বিচারপতি মানিক’ গণমাধ্যমের শিরোনাম সংবাদে রিপোর্টার তাবিথের মন্তব্য জানতে চাইলে উত্তরের বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ কৌশলে এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেন।

এখন দেখা যাচ্ছে, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন নৈতিকভাবেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অযোগ্য হয়েছেন। ইশরাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচারকাজ চলমান এবং তাবিথের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি নির্বাচনী হলফনামায় তথ্য গোপন করার তথ্য-প্রমাণ, যা আইনগত দিক থেকেও সে নির্বাচনের অযোগ্য।

পাঠক বন্ধুর স্মরণার্থে, পদ্মা সেতুর তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শুরু হয় অপপ্রচার! টেনে হিঁচড়ে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করার নানা কূটকৌশলও গ্রহণ করা হয়। হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে দুর্নীতি দমন কমিশন! পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বার বার তথাকথিত অভিযোগ, যুক্তিতর্ক আর তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অস্বীকার করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, হয় কানাডার আদালতেও! দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশ ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কলঙ্ক লেপন করতে চেষ্টা করে। দুর্নীতির তথাকথিত অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু থেকে তখন ঋণ চুক্তিও বাতিল করে! কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও মতামতগুলো নিশ্চয় ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ভুলে থাকার কথা নয় তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের টকশোর কথোপকথন! শুধু পদ্মা সেতুর তথাকথিত ওই অভিযোগের পর একাধিক পদস্থ সরকারী কর্মকর্তাকে তখন গ্রেফতারের পাশাপাশি সরিয়ে দেয়া হয় একজন মন্ত্রীকেও!

তাহলে ইশরাক হোসেনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চলমান বিচারকাজ আর অস্বীকার না করা দুর্নীতি ও অবৈধভাবে দেশের টাকা বিদেশে পাচারকারী তাবিথ আউয়াল ঢাকা দক্ষিণ-উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কীভাবে যোগ্য হয়Ñ এটি নিশ্চয়ই ভোটাররা চিন্তা-ভাবনা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

প্রশ্ন হলো, এত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের পরেও বিএনপি কেন ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য ইশরাক ও তাবিথকে বেছে নিয়েছে?

খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, বিএনপির বর্তমান হাইকমান্ড তারেক রহমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও জনপ্রিয়তার চেয়ে অর্থের বিষয়টি বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। কারণ, প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার জীবদ্দশায় খালেদা জিয়ার বিলাসী জীবনযাপনের পাশাপাশি ‘হাওয়া ভবন’ ও ‘লন্ডন জীবন’-এর অর্থের অন্যতম যোগানদাতা ছিলেন। সেই সঙ্গে ধনকুবের মালিক আব্দুল আউয়াল মিন্টুও তারেক রহমানের অন্যতম অর্থ যোগানদাতা। আর সে কারণেই মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসসহ অনেক সিনিয়র, অভিজ্ঞ, যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা নির্বাচনে আগ্রহী হলেও অবশেষে অনভিজ্ঞ, দুর্নীতিগ্রস্ত ইশরাক হোসেন এবং বিদেশে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থ পাচারকারী তাবিথ আউয়ালকে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী করেছে।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের গতানুগতিক নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচনী বিধিনিষেধ, আইনে ফাঁকফোকর থাকায় এই ধরনের অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে যোগ্য নেতৃত্ব ও নেতা। অবৈধ অর্থ দিয়ে নির্বাচনী মহড়া দিয়ে নিজেদের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের কেলেঙ্কারি ঢাকার চেষ্টা করছে, করবে। তাই বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে সময় উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। পাশের দেশ ভারত বা বিশ্বের সঙ্গে আমাদেরও প্রতিযোগিতা করতে হবে, অভিজ্ঞতা নিতে হবে। নির্বাচনী প্রার্থীকে বড় করে নয়, বরং তাদের নির্বাচনী বিধিনিষেধ ভঙ্গকে বড় করে দেখে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ, আইনের কঠোরতা প্রয়োগ করার মানসিক শক্তি ও নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

অবশেষে বলব, ‘জনসমক্ষের জীবন’ যদি স্বচ্ছ আর গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে যতই অবৈধ অর্থবিত্ত আর প্রভাব প্রতিপত্তি কিংবা মিথ্যা আশ্বাস আর স্বপ্ন দেখানো হোক না কেন; জনগণ ঠিকই তার সঠিক মূল্যায়ন করতে ভুল করবে না।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)