১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ টেল অব টু রয়্যালস

  • মু. আব্দুল্লাহ আল আমিন

দুটি সিংহাসন ত্যাগের কাহিনী। দু’জনই প্লেবয় থেকে হন বীর যোদ্ধা অবশেষে সিংহাসন ত্যাগ। প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে অষ্টম এডওয়ার্ডের কাহিনী চমৎকারভাবে মিলে যায়। তবে দু’জনের সময়কাল এব বিশ্ব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। দু’জনই বিয়ে করেন দুই তালাকপ্রাপ্তা মার্কিন নারীকে।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী প্রিন্স হ্যারি ও স্ত্রী মেগান মার্কেল ব্রিটেনের রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের পাট চুকিয়েছেন। তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান আর্চিকে নিয়ে তারা আলাদা জীবন শুরু করেছেন। ঠিক হয়েছে তারা আর রয়েল হাইনেস পদবী আর ধরে রাখবেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে রানীর প্রতিনিধিনধিত্বও করবেন না, নেবেন না রাজ-কোষাগারের কোন আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। এ নিয়ে কয়েকদিন গুঞ্জরণ চলার পর ১৮ জানুয়ারি বাকিংহাম প্যালেসের সঙ্গে তাদের একটি চুক্তি হয়েছে। রানী এলিজাবেথ একটি বিবৃতি ইস্যু করেছেন।

হ্যারির মধ্যে প্রথাবিরোধী মানসিকতা কৈশোরের শুরু থেকে দেখা যায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার গাঁজায় টান দিতে এবং মদপান করার ছবি প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে রাজপরিবার। আইনত তার তখন মদপানের বয়স হয়নি। এর দশ বছর পর তাকে দেখা গেল লাসভেগাসে তীব্র কোলাহলপূর্ণ মদপানের আসরে। অন্যদিকে এডওয়ার্ড ছিলেন চেইন স্মোকার। তিনি মায়ের সামনেই ধূমপান করতেন। তখনকার সময়ের ফ্যাশন দুরস্ত কেতাদুরস্ত মানুষ ছিলেন তিনি। কর্ম জীবনের প্রারম্ভে এডওয়ার্ড সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। হ্যারিও তাই করেন। হ্যারি আফগানিস্তানে দুটি ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালন করেন। সেনাবাহিনীর জীবন কঠিন নিয়মে পরিচালিত হলেও হ্যারি মূলত এ সময়ই রাজপরিবারের কঠিন প্রথাসিদ্ধ জীবন থেকে কিছুটা মুক্তির আস্বাদ পান। সেনাবাহিনীর কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফুপু প্রিন্সেস এ্যানের কাছ থেকে পেয়েছেন অপারেশনাল সার্ভিস মেডেল। অন্যদিকে এডওয়ার্ড পেয়েছিলেন মিলিটারি ক্রস পদক। দ’ুজনেরই রয়েছে ঘোড়ায় চড়ার বাতিক।

হ্যারি ও মেগান আগেই জানিয়েছিলেন, তারা আর রাজপরিবারের দায়-দায়িত্ব পালন করবেন না। নিজেদের সন্তান নিয়ে নিয়ে ব্রিটেন এবং উত্তর আমেরিকায় ভাগাভাগি করে বাকি জীবন কাটাতে চান। প্রিন্স হ্যারি এবং মেগানের রাজকীয় উপাধি ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স। তাদের বিয়ের সময় প্রথা অনুযায়ী রানী তাদের এই রাজকীয় উপাধি দিয়েছিলেন। তারা এরই মধ্যে একটি চ্যারিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন যেটি উত্তর আমেরিকা এবং আফ্রিকায় নারী উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে। রাজপরিবারকে তাদের বিদায় জানানোর বিষয়টি আকস্মিক। এ নিয়ে তারা পরিবারের আর কারও সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করেননি। এমনকি রানীও বিষয়টি জানতেন না। এ থেকেই বোঝা যায় রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের তাদের সম্পর্কে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল।

ঘটা করে বিয়ে করেছিলেন হ্যারি ও মেগান। ২০১৮ সালের ১৯ মে লন্ডনের উইন্ডসর প্রাসাদে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল গির্জায় রানী এলিজাবেথ এবং ৬শ’ নিমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিতিতে তারা বিয়ের শপথবাক্য পাঠ করেন এবং আংটি বদল করেন। ডিজাইনার ক্লেয়ার ওয়েইট কেলারের তৈরি বিয়ের পোশাক পরে মেগান মার্কল যখন গির্জায় এসে হাজির হন তখন শ্বশুর প্রিন্স চার্লস তার হাত ধরে তাকে বিয়ের অনুষ্ঠান স্থলে নিয়ে যান। লক্ষাধিক মানুষ হাজির হয়েছিল উইন্ডসরে। সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে এই বিয়ের অনুষ্ঠান সরাসরি উপভোগ করে। এটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক রাজকীয় অনুষ্ঠান। উইন্ডসর প্রাসাদে প্রথমবারের মতো সাধারণের মধ্য থেকে ১২শ’ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

৮ জানুযারি হ্যারি ও মেগান মার্কেল রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে কানাডায় চলে যাওয়ার ঘোষণা দিলে রাজপরিবার বড় সঙ্কটে পড়ে। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এই সঙ্কট নিয়ে কথা বলার জন্য ১৩ জানুয়ারি সান্ড্রিংহাম প্রাসাদে রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যদের ডাকেন। রানী সরাসরি কথা বলেন হ্যারির সঙ্গে। মেগান কানাডা থেকে টেলিফোনে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। হ্যারি, প্রিন্স উইলিয়াম এবং তাদের বাবা প্রিন্স চার্লস রানী এলিজাবেথের সঙ্গে ওই আলোচনায় যোগ দেন। রান শেষ পর্য তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

হ্যারি ও মেগানের এহেন কা-ে রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যরা একটা বড় ধাক্কা খেয়েছেন। হ্যারির সিদ্ধান্তকে অনেকে তুলনা করছেন ১৯৩৬ সালে অষ্টম এডওয়ার্ডের রাজসিংহাসন ত্যাগের সঙ্গে। এডওয়ার্ড বিয়ে করেন যুক্তরাষ্ট্রেন ওয়ালিস সিম্পসনকে। তবে রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচেছদের এর মাঝখানে আরও ঘটনা আছে। এই তালিকায় হ্যারির স্থান আট নম্বরে। মার্কিন নাগরিক ও বিয়ে বিচ্ছেদপ্রাপ্ত ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করার জন্য রাজকর্তব্য থেকে সরে আসেন অষ্টম এডওয়ার্ড। ১৯৩৬ সালে এডওয়ার্ড মাত্র কয়েক মাসের জন্য রাজা ছিলেন। এরপর লাইন সাকসেশনে পরিবর্তন এনে ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জকে রাজা করা হয়। এডওয়ার্ড-ওয়ালিসের বিয়ে এখনও প্রেমের জন্য সিংহাসনের ত্যাগের একটি কিংবদন্তি হয়ে আছে।

প্রেম ও বিয়ের ঘটনায় এর আগেও একাধিকবার বিব্রত হতে হয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবারকে। এক্ষেত্রে চার্লস ও ডায়ানার কথা না বললেই নয়। বিয়ের ১৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে তাদের বিয়ে ভেঙ্গে যায়। এই বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ ছিলেন চার্লসের সাবেক প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বোলস। রাজপরিবারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ২০০৫ সালে ক্যামিলাকে বিয়ে করেন চার্লস। এই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন না চার্লসের মা রানী এলিজাবেথ ও তার বাবা উিউক অব এডিনবরা প্রিন্স ফিলিপও।

চার্লসের সঙ্গে বিবাহিত থাকাকালীন এবং বিচ্ছেদের পরেও একাধিক পুরুষের সঙ্গে জুড়তে থাকে ডায়ানার নাম। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল মিসরের চলচ্চিত্র প্রযোজক দোদি আল ফায়েদের সঙ্গে তার সম্পর্ক। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তারা মারা যান। ডায়ানার খামখেয়ালিপূর্ণ জীবন বেছে নেয়ার পেছন ব্রিটেনের মিডিয়া বিশেষ করে ট্যাবলয়েডগুলোর ভূমিকা ছিল। পাপারাজ্জি নামের চোরা ফটোগ্রাফাররা তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল।

রানী এলিজাবেথের ছোট বোন রাজকুমারী মার্গারেট। মার্গারেট প্রথম শিরোনামে আসেন পিটার টাউনসেন্ডের সঙ্গে তার প্রেমের কারণে। সেই সময় বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে এমন কারও সঙ্গে রাজপরিবারের সদস্যের বিয়ে হওয়া ছিল অসম্ভব। পরিবারের চাপে টাউনসেন্ডকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন মার্গারেট, কিন্তু পরবর্তীতে চিত্রগ্রাহক এ্যান্টোনি আর্মস্ট্রং জোনসের সঙ্গে তার বিয়েও সৃষ্টি করে বহু বিতর্ক।

চার্লসের ছোট ভাই এ্যান্ড্রুরও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক। মার্কিন অভিনেত্রী কুস্টার্কের সঙ্গে তিনি একবার সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সারা ফার্গুসনকে বিয়ে করলেও কুস্টার্কের কন্যার গডফাদার হন এ্যান্ড্রু, যা নতুন করে খবরের শিরোনামে নিয়ে আসে তাকে। মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলের সঙ্গে রাজপুত্র হ্যারির বিয়ের পর থেকেই চলছিল নানা রকমের জল্পনা। হ্যারি ও এডওয়ার্ডের কথা দিয়ে আলোচনা শেষ করা যাক। ১৯৩৭ সালে এডওয়ার্ড যখন ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করেন রাজপরিবার সেই অনুষ্ঠান বর্জন করেছিল। হ্যারির ক্ষেত্রে কিন্তু সেটি হয়নি। বরং এই যুগলের বিয়ে বিশ্বের ১৯০ কোটি মানুষ টিভিতে তাদের বিয়ে দেখেছে।

নির্বাচিত সংবাদ