২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশের কেউ বেকার থাকুক তা আমরা চাই না : সংসদে প্রধানমন্ত্রী

দেশের কেউ বেকার থাকুক তা আমরা চাই না : সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের কেউ বেকার থাকুক আমরা তা চাই না। সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ-মাদক থেকে যুব সমাজকে মুক্ত করে তাদের সুন্দর জীবন দিতে, বিপথে নয় সঠিক পথে যেন যুব সমাজ চলতে পারে এবং মানুষের মতো মানুষ হয়- সেজন্য সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কারণ যুবসমাজ শক্তি, উদ্যম, উদ্ভাবন আর কর্মপ্রেরণার প্রতীক।

এখন যুবকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কী শুধু চাকুরির পেছনে ঘুরবে নাকি নিজেরা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে অন্যকেও চাকুরি দেবে? ইচ্ছে করে কেউ বেকার থাকতে চাইলে সেখানে করার কিছু নেই। তবে আমরা এতো কর্মসূচি নিয়েছি- সেখানে কারও বেকার থাকার সুযোগ নেই।

স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ত্রিশ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিপুর সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যুবক ভাই-বোনদের শুধু অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে চলবে না, শুধু একটি চাকরির আশায় দ্বারে দ্বারে ধরনা দিলে চলবে না।

আমাদের প্রতিটি কর্মপরিকল্পনাতেই যুব সমাজের ব্যাপক কর্মস্থানের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। দেশের তরুণ প্রজন্মরাই পারে একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। যুবগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল এবং উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তর করা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। আমরা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যুব সমাজকে শিক্ষিত, দক্ষ ও কর্মমুখী হিসেবে গড়ে তুলছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের যুব সমাজ বেকার থাকুক এটা আমর চাই না। যুব সমাজকে শুধু চাকুরির আশায় ধরনা দিলে চলবে না, তারা কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিনা জামানতে ঋণ নিয়ে নিজেরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করছি, সেখানেও বিপুল যুব সমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

স্কুল জীবন থেকে হাতে কলমে যেন ছাত্ররা কোন একটা বিষয়ে প্রশিক্ষিত হতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইচ্ছে করে কেউ যদি বেকার থাকতে চায়, সেখানে করার কিছু নেই। কিন্তু আমরা যে ব্যবস্থা করে দিয়েছি, ইচ্ছা করলেই বেকার যুব সমাজ কিছু না কিছু নিজেরাই করতে পারবে, নিজেরা কাজ করে অন্যকে চাকুরি দিতে পারবে।

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদের সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে প্রটোকল নিয়ে চলতে হয় এটা ঠিক, কিন্তু দেশের কোন কিছুর খবর রাখি না এটা ঠিক নয়। দেশের সবদিকেই নজর রেখেই কাজ করছি বলেই দেশের এতো উন্নয়ন হয়েছে। আর বেশি কাজ করলেই আবার সমালোচনা করা হয়, প্রধানমন্ত্রী একাই সব কাজ করবেন কেন? কিন্তু দেশের জনগণ আমাকে সুযোগ দিয়েছে বলেই তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে কাজ করে যাচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ৭৫ পরবর্তী সময়ে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা যুব সমাজের হাতে অস্ত্র ও মাদক তুলে দিয়ে বিপথে চালিত করেছিল। জিয়াউর রহমানও মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র-মাদক তুলে দিয়ে বিপথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা চাই না যুব সমাজ বিপথে যাক। সন্ত্রাস-মাদক-জঙ্গীবাদ থেকে মুক্ত করে তাদের সুন্দর জীবন দিতে কাজ করে যাচ্ছি। বিপথে নয়, যুব সমাজকে সঠিক পথে এনে মানুষের মতো মানুষ করতেই আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গার সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি (রাঙ্গা) এখনও পেছনে পড়ে আছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আমরা অনেক আগে থেকেই অভিযান শুরু করেছি, এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। কারণ মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, দেশেরও ক্ষতি হয়। তাই অভিযানের পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রত্যেকটি পরিবারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি, যাতে তারা লক্ষ্য রাখেন কোন যুবক সমাজ মাদক থেকে দুরে থাকে।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধারা গর্ব করে মুখ ফুটে বলতে পারতেন না- আমরা মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সেই অবস্থা এখন আর নেই। মুক্তিযোদ্ধা গর্বভরে এখন বলতে পারে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের যে মর্যাদা দিয়েছি, সেখানে আর পদক দেওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বরং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মুজিববর্ষে আমার আহ্বান, আপনারা নিজ নিজ এলাকায় নতুন প্রজন্ম ও যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান, যাতে তারা দৃঢ়চেতা নিয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।

সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ॥ সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশী-বিদেশী নানা চ্যালেঞ্চ মোকাবেলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে আমাদের আজকের বাংলাদেশ। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিগত ১০ বছরে সর্বক্ষেত্রে যে সফলতা অর্জিত হয়েছে তার পথ ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছানোর অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ত্রিশ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছি। টেকসই অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের উন্নয়ন ভাবনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৪২ বছর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিডিসি) তালিকায় থাকার পর ২০১৮ সালের ১৭ মার্চ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ, যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার ইতিহাস।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের দুঃশাসনের কথা তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশের এই অগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। আবার দুর্নীতির চক্রে নিপতিত হয় দেশ। হাওয়া ভবনের নামে তারেক জিয়া চালাতে থাকে লুটপাট। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকের প্রায় সবগুলোতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে থাকে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদে দুই তৃতীয়াংশেরও অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। আমরা আবার দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য মনোনিবেশ করি। ২০০৯ সাল থেকে আমাদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। বিগত ১১ বছর ধরে এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। সহ¯্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজিএস) অর্জনে আমাদের ঈর্ষনীয় সাফল্য দক্ষিণ এশিয়াসহ উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সমাদৃত হয়েছে।

ওড়না পড়া নিষিদ্ধ করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি ॥ জাতীয় পার্টির মশিউর রহমান রাঙ্গার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সবার জন্য মান সম্মত শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নতে গতিশীল ও স্থায়ী করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য উপযুক্ত, সুশিক্ষিত ও আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আমাদের সরকার সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মসূচি গ্রহন ও বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ছাত্রীদেরকে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য আমরা উদ্যোগ গ্রহন করেছি। পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সমায়ানুবর্তিকা এবং সততার অনুশীলন করানো হচ্ছে।

ঢাকাস্থ আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের মেয়েদের ওড়না পড়া নিষিদ্ধ করে দিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করানো হচ্ছে মর্মে সংসদ সদদ্যের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে কোনো সত্যতা খুঁজে পায়নি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেয়েদের ওড়না পরা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের গবর্ণিং বডিও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন করেনি। উল্লেখ্য, আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের গর্ভনিং বডির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের ২০২০ সালের নির্ধারিত ইউনিফর্ম (ড্রেস কোড) হচ্ছে রয়েল ব্লু কামিজ ও সাদা সালোয়ারের সঙ্গে চওড়া ক্রস বেল্ট ওড়না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ও অন্যান্য সকল ধর্মের চেতনা ও মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকার ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধে আঘাত করে এ রকম যে কোন কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বদা সচেতন রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধী সনাক্ত ॥ জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ ও সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। দুর্নীতি, মাদক নির্মূল ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের অভিলক্ষ্য হলো- নিরাপদ জীবন ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গঠন।

তিনি বলেন, সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গীবাদ ও মাদক নির্মূলে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও নাগরিক অধিকার, চোরাচালান দমন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা প্রদান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সাইবারক্রাইম দমনে পুলিশ বাহিনী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধী সনাক্ত ও তাদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

নির্বাচিত সংবাদ