২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব ভালবাসা দিবসে-

  • মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালবাসা দিবস। ভালবাসা শব্দটার গভীরতা সমুদ্রের চেয়ে অতল। আকাশের চেয়েও সীমাহীন। মহাভারত হোক বা ট্রয় নগরী হোক ষোলো কলাই কিন্তু পূর্ণ ভালবাসা। এই ভালবাসা শুরুটা নিয়ে রয়েছে অনেক চিত্তাকর্ষক কাহিনী।

কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণা, রোমান সেন্ট ভ্যালেন্টাইন খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ না করায় তাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা থেকেই এর উৎপত্তি। ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার আত্মত্যাগের ওই দিনটি ভালবাসার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়। কিছু বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারাগারে বন্দী থাকার সময় কারারক্ষীর মেয়েকে তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেন, যাতে লেখা ছিল ‘লাভ ফ্রম ইওর- ভ্যালেন্টাইন।’ অপর এক ধারণা, রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন গির্জার ধর্মযাজক ছিলেন। ক্লডিয়াস তার সঙ্গে বিরোধের জন্য প্রথমে তাকে কারাবন্দী করেন। পরে তার মৃত্যুদ- কার্যকর করেন। ৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে পোপ জেলাসিয়াস সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি নির্ধারিত করেন এবং পরবর্তীকালে তার নামানুসারেই পালিত হতে থাকে এই অনুষ্ঠান।

সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত কাহিনী হলো এই ক্লডিয়াসের সেনাবাহিনীকে নিয়ে। তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের শখ হলো বিশাল সেনাবাহিনীর সৃষ্টি করা। তরুণদের বিয়েকে তিনি আইনবহির্ভূত বলে ঘোষণা করলেন তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু জনগণ পরিবার পরিজনের প্রতি দুর্বলতার কারণে যোগ দিতে যেত না সেনাবাহিনীতে। সম্রাট ঘোষণা করলেন নতুন নিয়ম, আইন জারি করলেন বিয়ের ওপর। তরুণ প্রজন্মের কাছে নির্মম হয়ে উঠল এ প্রথা। সেই ন্টভ্যালেন্টাইন রোমে তৃতীয় শতাব্দীর সময় ধর্মযাজক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তখন এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে এগিয়ে এলেন সম্রাটের পাদ্রি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। গোপনে তরুণ-তরুণীদের বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করতে লাগলেন তিনি। সম্রাট খবর পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে ভ্যালেন্টাইনকে গ্রেফতার করে জেলে পুরলেন। অসংখ্য মানুষ জেলের সামনে ভিড় করতে লাগল। জেলের জানালা দিয়ে সবাই ফুল ছুড়ে দিতে লাগল। কারাগারে বন্দী থাকার সময় ভ্যালেন্টাইন এক তরুণীর প্রেমে পড়েন বলে ধারণা করা হয়, তরুণীটি ছিল জেলারের কন্যা। সে কারাভ্যান্তরেই ভ্যালেন্টইনের সঙ্গে দেখা করত। সে মাঝেমধ্যে জেলের ভেতরে বসে গল্প করত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এভাবে তাকে সে আরও উৎসাহিত করতে লাগল। মেয়েটি তাঁকে ভালবাসত। ভালবাসত ভ্যালেন্টাইনও। কিন্তু তাদের এই ভালবাসা বেশি দিন এভাবে চলল না। মৃত্যুর আগে তিনি তরুণীটির কাছে চিঠি লেখেন যার শেষ স্বাক্ষর ছিল ‘ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’ এটি এমন এক অভিব্যক্তি যা এখনও ব্যবহৃত হয়। শাস্তিস্বরূপ এর মধ্যেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়। ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুর দিনটিই ভালবাসা দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়। দিনটি ছিল ইতিহাসের পাতায় ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। মধ্যযুগে ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে সর্বাধিক জন প্রিয় সেইন্টদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

আরেক প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে জানা যায় রোমান বন্দী শালার নির্যাতিত খ্রীস্টানদের মুক্তি পাওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু হয়। অন্য একটি লোক কাহিনীর মতে, ভ্যালেন্টাইন নিজেই মূলত নিজেকে ‘ভ্যালেন্টাইন’ শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। কেউ কেউ মনে করেন ‘ভ্যালেন্টইনস’ উদযাপিত হয় ফেব্রুয়ারির মাঝা মাঝি সময়ে। ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে সম্ভবত সেটা সংঘটিত হয়েছিল ২৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে।

প্রাচীন রোমে বসন্ত কালের শুরু ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। পবিত্রতার সময় হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হতো। ৪৯৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে পোপ জেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ হিসেবে ঘোষণা দেন। মধ্য যুগে ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডে বিশ্বাস জন্মে যে, ১৪ ফেব্রুয়ারি পাখিদের প্রেম-বন্ধনের ঋতু, আর সেখান থেকেই চালু হয় ফেব্রুয়ারির মাঝা মাঝি সময়ে ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে।’ আজও এটি রোমান্সের দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

ব্রিটিশ রাজা সপ্তম হেনরি প্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে। এর পর থেকে দিনটি ঘিরে বিশ্বব্যাপী শুরু হয় নানা আয়োজন। ধীরে ধীরে সময়ের ব্যবধানে সেটা এসে শুরু হয় কার্ড আদান-প্রদানের রীতির মাধ্যমে। ভালবাসা দিবস উপলক্ষে এই রীতিটি শুরু হয় ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে।

সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে গ্রেট ব্রিটেনে ‘ভ্যালেন্টইনস ডে’ পালন করা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হাতে তৈরি ‘ভ্যালেন্টাইন’স উপহার প্রদান আমেরিকানদের মধ্যে শুরু হয় সপ্তদশ শতকের শুরুতে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এর প্রচলন ঘটে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে। ইসথার এ হওল্যান্ড নামক এক খ্রীস্টান ব্যক্তি ভ্যালেন্টাইস উপহার বিক্রয় শুরু করেন আমেরিকাতে। গ্রিটিং কার্ড এ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় প্রতি বছর ভালবাসা দিবসে কার্ড বিলি হয় এক বিলিয়নের মতো। ফুল বিক্রি হয় ১১০ মিলিয়ন। সংখ্যাটি আসলেই বিশাল বড়। ভালবাসা হৃদয় থেকে মুছে যাওয়ার নয়। ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ এখন ‘ক্রিসমাস ডে’র পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড বিনিময়ে উৎসবে পরিণত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বর্তমানে উদযাপিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, ম্যাক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়ায়।

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ‘ভ্যালেন্টাইনস’ কার্ডটি সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। নরম্যান্ডির ডিউক চার্লস, টাওয়ার অব লন্ডনে বন্দী থাকা অবস্থায় ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে তার স্ত্রীকে ভ্যালেন্টাইন’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখে পাঠান। ধারনা করা হয় পৃথিবীর মধ্যে এটাই প্রথম ‘ভ্যালেন্টাইনস’ কার্ড।

লোক কাহিনী বা মিথলোজি যা থেকেই সে আমলে ভালবাসা দিবসের পত্তন হয়ে থাকুক না কেন এটা এখন বিশ্বব্যাপী আদৃত একদিন। একে আরও মহিমান্বিত করতে উঠে পড়ে লেগেছেন বণিক শ্রেণী। এদিন উপলক্ষে হরেকরকম উপহার সামগ্রী প্রস্তুত ও বিপণন এখন এক বিশাল বাণিজ্য। প্রতিবছর অন্তত ১ বিলিয়ন কার্ড আদান প্রদান করা হয় এদিনে, যার শতকরা ৮৫ ভাগ মহিলারা কিনে থাকেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনকারীরা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ পোস্ট কার্ড উত্তর আমেরিকায় আমদানি করেছিল। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ড ইন্ডাস্ট্র্রি ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ উপলক্ষে জুয়েলারি উপহার প্রদান শুরু করে। জাপান এবং কোরিয়াতে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে প্রতিবছর পালিত হতে দেখা যায়। মেক্সিকোতে একইভাবে উদযাপিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। ফিনল্যান্ড, রুমানিয়া, নরওয়ে, ভারত বর্ষে প্রেমের দিবস হিসেবে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে দিবসটি প্রবর্তন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও পত্রিকা সম্পাদক শফিক রেহমান।

রোমান ভালবাসার দেবী ভেনাসের প্রিয় ফুল গোলাপ বলেই ভালবাসা দিবসে লাল গোলাপের চল শুরু হয় ইউরোপে। এর পর থেকে ভালবাসা দিবসে গোলাপ দেয়া নেয়ারও প্রচলন হয়। ফলে ভালবাসা দিবসে থাকে গোলাপের বিশেষ চাহিদা। এই দিনে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রিয়জনকে দেয়ার জন্য গোলাপ কিনে থাকে। শুধু ভালবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে ঢাকার রাজধানী সবচেয়ে বড় পাইকারি ফুলের বাজার আগারগাওয়ে গত বছর প্রায় বিশ (২০) কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছিল সেখানকার মালিক সমিতি। শুধু ফুল নয় ভালবাসা দিবস উপলক্ষে ঢাকার রাজধানীসহ সব জেলাতেই রঙ-বেরঙের উপহার সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। রেস্টুরেন্টগুলোয় থাকে এই দিন উপলক্ষে নানা ছাড়ের ব্যবস্থা।

এ যুগের রিচার্ড বাটন- এলিজাবেথ টেলর, এ্যান্টনি- ক্লিওপেট্রা, শাহজাহান- মমতাজ, ভিক্টোরিয়া-আলকট, এ্যাডওয়ার্ড- সিম্পসনের প্রেম কাহিনীর নজির একালে কম। এ্যাডওয়ার্ড- সিম্পসনের জন্য বাকিংহাম প্রাসাদ ছেড়ে দেয়া, শাহজাহানের তাজমহল তৈরি আমাদের আসলেই অবাক করে। অনেকে বলে ভালবাসার অমরত্বে নিদর্শন আছে এখনো ঢের, কিন্তু স্বরূপ বদলে গেছে। হয়ত বা তাই।

লেখক : সাহিত্যিক, গবেষক

[email protected]

নির্বাচিত সংবাদ