২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রত্যাবাসনেই সমাধান

মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বিপদসঙ্কুল সমুদ্রপথে ভাগ্যান্বেষণে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রাক্কালে আবারও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে সেন্ট মার্টিন উপকূলে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রীসহ ও হতাহতদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা শরণার্থী। ইতোমধ্যে ১৫ রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ অন্তত ৫১। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৭২ জনকে। আরও যা আশ্চর্যের তা হলো, মৃত ও জীবিত উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই কিশোরী ও তরুণী। এ থেকে যা প্রতীয়মান হয়, প্রধানত নারী ও কিশোরী পাচার, তা সে বিয়ে দেয়া অথবা দেহপজীবী হিসেবে বিক্রিÑ যাই হোক না কেন! বাংলাদেশে আশ্রিত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর মিয়ানমারে সম্মানজনক পুনর্বাসন দীর্ঘায়িত হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা যে আরও ঘটবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। সে অবস্থায় জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা।

এদিকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা পরিচালনায় গাম্বিয়ার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা ওআইসি। আফ্রিকার নাইজারে ৩-৪ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে চলবে এই তহবিল সংগ্রহ। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার সরকার ও সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় দেশটির বিরুদ্ধে ২৩ জানুয়ারি চার দফা নির্দেশনা দিয়েছে আইসিজে। বিশ্বের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। অতঃপর বাংলাদেশের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলা এবং রোহিঙ্গাদের আইনসম্মত মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে ওআইসি। আর সে জন্যই তহবিল সংগ্রহের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওআইসি তথা ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার ১৪তম সম্মেলনে এশীয় গ্রুপের পক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি তুলে ধরেন। বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়প্রাপ্ত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মিয়ানমারে সম্মানজনক পুনর্বাসনে তিনি ওআইসির সহযোগিতা কামনা করেন। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর অমানবিক পরিস্থিতির জন্য নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই জোট। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্তও নিয়েছিল ওআইসি। এই মামলার ফলোআপের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও কারিগরি সহযোগিতার বিষয়টিও প্রশস্ত হয়েছে।

উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সদর দফতরে মহাসচিব এ্যান্তোনিও গুতেরেসের সভাপতিত্বে শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক প্রভাব শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকেও কয়েক বছর ধরে চলমান রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা-সঙ্কট সমাধানে তিন দফা প্রস্তাব ও সুপারিশ উপস্থাপন করেন। প্রথমত, মিয়ানমারকে অবশ্যই বৈষম্যমূলক আইন ও নীতি বিলোপ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করে সে দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত করার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব দেয়ার সঠিক উপায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের প্রতি নৈরাজ্য রোধে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের জবাবদিহি, বিশেষ করে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী মিশনের সুপারিশের আলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আর তাহলেই কেবল সব রোহিঙ্গার নিরাপদে প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে মিয়ানমারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য-সহযোগিতা অবশ্যই কাম্য। রাশিয়া, চীন ও ভারতের সমর্থনও প্রত্যাশিত বৈকি। গত বছরের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানেও প্রধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।