২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বসন্ত আর ভালবাসার উৎসবে বইয়ের টানে জনারণ্য

বসন্ত আর ভালবাসার  উৎসবে বইয়ের  টানে জনারণ্য
  • গ্রন্থমেলা প্রতিদিন

মনোয়ার হোসেন ॥ সকাল বিকেল সন্ধ্যা- বইয়ের সঙ্গে কেটে গেল সারাবেলা। ছুটির দিনে বইমেলার শরীরে ভর করল বসন্তের উতলা বাতাস। ফাগুনের রংমাখা সেই হাওয়ায় বর্ণিল হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। শুক্রবার ছিল প্রাণের মেলার ত্রয়োদশতম দিন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনটির সমান্তরালে যুক্ত হয়েছিল বসন্ত উৎসব আর ভালবাসা দিবস। সব মিলিয়ে যেন এক দিনে তিন উৎসবের দেখা মিলল এদিনের গ্রন্থমেলায়। সেই তিনে মিলে যাওয়ায় জনারণ্যে পরিণত হয় বইমেলার দুই প্রান্তর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি। বিকেল থেকে রাতঅবধি মেলায় প্রবেশের দুই পথ হাইকোর্ট ও শাহবাগ থেকেই দৃশ্যমান হয়েছে জনস্রোত। মানুষের ভিড়ে সন্ধ্যায় উদ্যানের নান্দনিক বিন্যাসের বিশাল পরিসরের মেলাটিও যেন ক্ষুদ্র মনে হয়েছে। গায়ের সঙ্গে গা ঘেষেছে পাঠক থেকে দর্শনার্থীর। সবচেয়ে বেশি জনসমাগম হওয়া দিনটিতে বিপুুলসংখ্যক বইপ্রেমীদের পদচারণায় উড়েছে ধুলো। তেমনই বইয়ের বিকিকিনিও হয়েছে ব্যাপক। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের সম্মিলনে শুক্রবারই ছিল এবারের গ্রন্থমেলার সবচেয়ে উজ্জ্বলতম দিন।

বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের হাত ধরে আসা খুদে পাঠকের পদচারণায় মুখরিত সকালের শিশুপ্রহর। শিশু চত্বরে সিসিমপুরের হালুম, ইকরি, টুকটুকির সঙ্গে সময় কাটিয়ে ছুটেছে বই কিনতে। সেই তালিকায় ছিল রূপকথা, গল্প, ছড়ার বই থেকে শুরু করে কমিক্স বা ছবি আঁকার বই। ছোটদের সকাল শেষে দুপুর গড়ানো বিকেল থেকে পাল্টে যায় মেলার চেহারা। যে দিকেই চোখ পড়ছে নানা রংকে ফাঁকি দিয়ে ধরা দিয়েছে হলুদ আর বাসন্তী রঙের সমারোহ। সেসব তরুণী কিংবা নারীদের মতো তরুণদের পোশাকেও ছিল বসন্তের আবহ। শুধু তরুণ-তরুণী নয়, মেলায় আসা শিশু কিংবা প্রবীণদের পোশাক ও মননেও ছিল বইনির্ভর উৎসবের ছোঁয়া। বাসন্তীর সঙ্গে অনেকের শরীরে জড়িয়ে ছিল ভালবাসার লাল রং। লাইন ধরে মেলায় প্রবেশ করে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি সংগ্রহ করেছেন পছন্দের বইটি। বই কেনার সঙ্গে ভাললাগার অনুভব ছড়িয়েছে প্রিয় লেখকের সান্নিধ্যপ্রাপ্তি কিংবা তার সদ্য প্রকাশিত বইটিতে অটোগ্রাফ নেয়া। সব মিলিয়ে শুক্রবারের গ্রন্থমেলাটি ছিল নির্মল আনন্দের অনাবিল প্রবাহ।

ফাগুনের বিকেল উদ্যান অংশে মাঠে দাঁড়িয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন সময়ের আলোচিত লেখক আনিসুল হক। এবার মেলায় এসেছে এই লেখকের ঊনসত্তর থেকে একাত্তরের ছবি আঁকা রাজনৈতিক উপন্যাস ‘এখানে থেমো না’। সেই বইটি সংগ্রহ করে তাকে ঘিরে ভিড়ভাট্টা ছিল পাঠকের। অনুরাগীদের সঙ্গে অল্পস্বল্প কথার ফাঁকে ফাঁকে বইয়ের সাদা মলাটে লিখে দিচ্ছিলেন শুভেচ্ছা বার্তা। সেই ভিড়ের মাঝেই কথা হয় এই কথাশিল্পীর সঙ্গে। বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয় এই উপমহাদেশে বসন্ত মানেই প্রেমের ঋতু। এবার থেকে সেই বসন্তের সঙ্গে এক হয়ে গেল ভালবাসা দিবস। এটা আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেল। তবে এই সংস্কৃতিবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করতে বইয়ের বিকল্প নেই। পড়ার অভ্যাসটি যত বাড়বে আমরা তত বেশি মানবিক হব। তখন একটি দুর্বাঘাসের প্রতিও মায়া জাগবে মনে।

অনন্যার প্যাভিলিনে দেখা মেলে আরেক জনপ্রিয় কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের। তিনিও তুমুল ব্যস্ত ছিলেন নিজের লেখা বইয়ের অটোগ্রাফ দেয়া এবং পাঠকের সঙ্গে কথোপকথনে। প্রকাশনা সংস্থাটি থেকে এসেছে সমাজের নানা স্তর দশজন নারীকে নিয়ে লেখা লেখকের গল্পগ্রন্থ ‘কয়েকজন মেয়ে’। সেই বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে দিতে বললেন, আজ একসঙ্গে মিলে গেছে তিন উৎসব। এতে প্রচুর লোকসমাগম হয়েছে। সাধারণত ভিড় বেশি হলে বইয়ের বিক্রি কম হয়। তবে আজ ভিড়ের সঙ্গে বইয়ের বিক্রিটাও বেশি হচ্ছে। তার ওপর বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গকৃত এবার মেলার বিন্যাস চমৎকার হওয়ায় পরিবেশটি অনেক সুন্দর। এমন পরিবেশে পাঠকের এই সান্নিধ্য দারুণ উপভোগ করছি। কারণ, সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। পাঠকের সঙ্গে কথা বলে তাদের চাহিদা বোঝার চেষ্টা করি এবং কেউ লেখা নিয়ে সমালোচনা করলে সেটাকেও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে।

বসন্ত বিকেলে বায়ান্ন নামের এক ইউনিটের স্টলে তরুণ কবি মারজুক রাসেলকে ঘিরে দেখা মিলে ভক্তদের ভিড়। প্রকাশনা সংস্থাটি থেকে আসা ‘দেহবণ্টনবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর’ কাব্যগ্রন্থে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন এই কবি।

সন্ধ্যায় দুই উৎসব এবং ছুটির দিনকে সঙ্গী করে মেলায় এসেছিলেন সম্প্রতি গাঁটছড়া বাঁধা মাহমুদ মোরশেদ ও সঞ্চিতা সিথী। উদ্যানের মেলা অংশে মিরপুরে বাসিন্দা এই নবদম্পতির সঙ্গে কথা হয়। বইমেলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুজন মিলে বলে ওঠেন, আমরা উভয়েই চাকরিজীবী। তাই ছুটির দিনের সঙ্গে দুই বসন্ত উৎসব ও ভালবাসা দিবস যুক্ত হওয়ায় ব্যাটে-বলে খুব ভাল সংযোগ ঘটেছে। দুজন মিলে চমৎকার করে সময় কাটালাম। রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত প্রেমের কবিতা, হেলাল হাফিজের ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’সহ বেশ কিছু নতুন পুরনো বই একে অন্যকে উপহার দিলাম। বই বিনিময়ের মাধ্যমে ভালবাসারও বিনিময় হলো।

সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদের কণ্ঠে ছিল কিছুটা আফসোসের সুর। আলাপকালে বলেন, বইয়ের বিকিকিনি বেশ ভাল হচ্ছে। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সঙ্গে বসন্ত ও ভালবাসা দিবস এক হয়ে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষতিও হলো। কারণ, ছুটির দিনের সঙ্গে দুই পৃথক দিবসে আলাদা করে বইয়ের বিক্রি হয়। তবে এবার মেলার পরিসর বৃদ্ধির সুবিধাটা পাঠকরা কাজে লাগাতে পারছে। ভিড় হলেও বই নেড়েচেড়ে দেখার পর সংগ্রহ করতে পারছে।

নতুন বইয়ের খবর

শুক্রবার মেলার ত্রয়োদশতম দিনে নতুন বই এসেছে ৩৬৯টি। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্রন্থের মধ্যে বাংলা একাডেমি এনেছে আসাদ চৌধুরীর গ্রন্থ ‘সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু’। উৎস থেকে এসেছে মিলু শামসের কাব্যগ্রন্থ ‘দীর্ঘায়িত দুঃখগুলো’। গ্রন্থকুটির এনেছে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘আমার পা-ব’। শিশুগ্রন্থ কুটির এনেছে ‘একে চন্দ্র দুয়ে পক্ষ’। অনুপম প্রকাশনী এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ছোট একটা নেংটি ইঁদুর’ ও আনিসুল হকের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। কথাপ্রকাশ এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘বাড়িটায় কে যেন থাকে’ ও সালেক খোকনের ‘দেশে বেড়াই’। আগামী প্রকাশনী এনেছে মোহাম্মদ হান্নানের ‘শতাব্দীর বঙ্গবন্ধু’। দ্বৈত প্রকাশ এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘কাকতাড়ুয়া’, নির্মলেন্দু গুণের ‘নির্বাচিত ছড়া’, আসাদ চৌধুরীর শিশুতোষ গ্রন্থ ‘কেশবতী রাজকন্যা’ ফরিদুর রেজা সাগরের ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’ ও আলী ইমামের ‘বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী’। নোলক প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে রুখসানা পারভীন সুরমার কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘবৃষ্টির পরাগ জল’।

মেলামঞ্চের আয়োজন

শুক্রবার বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আসাদ চৌধুরী রচিত সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শোয়াইব জিবরান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আনিসুর রহমান এবং নূরুন্নাহার মুক্তা। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক খুরশীদা বেগম।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, সাজ্জাদ আরেফিন, তারিক সুজাত এবং সুহিতা সুলতানা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী আহ্কাম উল্লাহ, সায়েরা হাবীব এবং নাজনীন নাজ। সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী খুরশিদ আলম, তানভীর সজীব আলম, তানজিনা করিম স্বরলিপি, মুর্শিদ আনোয়ার, রাজিয়া সুলতানা এবং শরণ বড়ুয়া।

প্রাবন্ধিক বলেন, নিজস্ব একটি ভূমির অর্জন ও রক্ষার দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস পৃথিবীতে অনেক রয়েছে। কিন্তু বাঙালী জাতির নিজস্ব স্বাধীন ভূখ- লাভের ইতিহাস সবচেয়ে বিস্ময়কর। বাঙালী জাতি মাত্র নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধ করে তাদের স্বপ্নের একটি স্বাধীন ভূখ- প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। কিন্তু এ অবিশ্বাস্য অর্জনের পেছনে একজন মানুষ বিনিয়োগ করেছিলেন তাঁর সমগ্রজীবন। তিনি বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসংখ্য সাহিত্য কর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কবি আসাদ চৌধুরীর রচিত সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু গ্রন্থটি অন্যতম। এখানে অত্যন্ত শিল্প দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইতিহাসের একজন মহানায়কের দীর্ঘ অভিযাত্রা।

শুক্রবার লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন ফরিদ কবির, মাহবুব আজীজ, আফরোজা সোমা এবং চৌধুরী শহীদ কাদের।

আজকের মেলা

আজ শনিবার গ্রন্থমেলার ১৪তম দিন। মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। সকালে শিশু-কিশোর সঙ্গীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শাহ্জাহান কিবরিয়া রচিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আনজীর লিটন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন হরিশংকর জলদাস ও খালিদ মারুফ। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।