২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভালবাসা বসন্তে একাকার

  ভালবাসা বসন্তে একাকার

মোরসালিন মিজান ॥ আজি দখিন-দুয়ার খোলা-/এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো...। এসেছে বসন্ত। বসন্ত এসে গেছে।

নব ফাল্গুনের প্রথম দিনে বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নিয়েছে বাঙালী। প্রতিবারের মতো এবারও বর্ণিল উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রিয় ঋতুকে বরণ করে নেয়া হয়। ঢাকার ছবিটা যথারীতি বর্ণাঢ্য ছিল। রঙিন হয়ে উঠেছিল চারপাশ। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সব বয়সী সব শ্রেণী পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে রাজধানী শহরের বাইরেও কিছু কম ছিল না আয়োজন। এবার অসংখ্য উৎসব অনুষ্ঠানের এমন খবর মিলেছে যে সারাদেশ শুক্রবার মেতেছিল বসন্ত উৎসবে।

এবারই প্রথম পহেলা ফাল্গুন ও ভালবাসা দিবস একই দিনে উদ্যাপিত হয়েছে। বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসাব নিকাশ সামান্য পাল্টে যাওয়ায় এই পরিবর্তন। শীতের ছোঁয়া মিলিয়ে গেল আস্তে/ফাগুন এলো আবার ভালবাসতে...। ভালবাসতে একই দিনে এসেছে ফাগুন। ভালবাসা দিবসের আবেগ এবং পহেলা ফাল্গুনের উত্তাপ যেন হাতধরাধরি করে চলেছে সারাদিন। বাসন্তী রঙের পাশাপাশি তাই ভালবাসার লাল রংও বেশ দেখা গেছে। কেউ বাসন্তী রঙে প্রকাশিত হয়েছেন। কেউ সেজেছিলেন লালে। পোশাকে এ দুটি রঙের সংমিশ্রণও দেখা গেছে এবার।

বাঙালী ঐতিহ্যের বলেই ফাল্গুনের স্বতন্ত্র আবেদন। ষড়ঋতুর বাংলাদেশ প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর রূপ বদলায়। শুরু গ্রীষ্ম দিয়ে, আর শেষ বসন্ত দিয়ে। শেষ ঋতুটি সেরা ঋতুও বটে। শুরুতেই গেল। শূন্য হৃদয় ভরাতে মন রাঙাতে। মনের গহীন কোণে অতি সূক্ষ্ম যে পুলক, বসন্তই জাগাতে পারে জাগিয়ে দিল। প্রকৃতির প্রতি প্রেম, প্রিয়ঋতুর বন্দনা ও মানুষে মানুষে ভালবাসার জয়গান হলো দিনভর।

পছন্দের ঋতুকে স্বাগত জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: নব বসন্তের দানের ডালি/এসেছি তোদেরই দ্বারে/আ য় আ য় আয়/পরিবি গলার হারে...। বসন্তকে গলার হার করেই যেন শহর ঘুরে বেড়িয়েছে মানুষ। প্রেমের কবি নজরুলের উচ্চারণÑ এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে/ খুনেরা ফাগুন...। প্রথম দিন প্রিয় ঋতুকে স্বাগত জানাতে মোটামুটি ঘরের বাইরে কাটিয়েছে বাঙালী তরুণ যুবারা। সকাল বেলায়ই টায়রা পরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে তরুণ তরুণীরা। মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাড়িতে সেজে বের হয়েছিল। খোঁপায় পেঁচিয়ে নেয় হলুদ গাঁদার ফুল। ছোট্ট মেয়েটিও শাড়ি গায়ে বড়দের মতো হেঁটে গেছে। কী যে সুন্দর সে দৃশ্য! ছেলেরা পাঞ্জাবি পরেছিল। বিভিন্ন বয়সী মানুষের হাসি আনন্দ আর দিগি¦দিক ছোটাছুটিতে খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যায় রাজধানী শহরের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, চারুকলার বকুলতলা, ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবরÑ সর্বত্রই ছিল উৎসবপ্রেমীদের ভিড়। বাদ যায়নি উত্তরা, পুরান ঢাকাও। রাজধানীর অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল উৎসব। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চন্দ্রিমা উদ্যানের সবুজের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় বাসন্তী রং। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, রেস্তরাঁ সবখানে পরিলক্ষিত হয় উৎসবের রং। হাত ধরাধরি করে হেঁটে চলা যুগলেরা ফিরিয়ে দেয় শহর ঢাকার যৌবন।

উৎসবের বড় ঢেউটি আছড়ে পড়েছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। বইয়ের মেলা এবার আরও বড়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় পুরোটাজুড়ে মেলা আয়োজন করা হয়েছে। এর পরও ফাগুন ও ভালবাসার দিনে লোকে লোকারণ্য ছিল মেলা প্রঙ্গণ। অগণিত মানুষের উপস্থিতি, বই কেনা, উপহার দেয়া, হাসি গল্প, ছবি তোলাÑ আরও কত কী! বইয়ের সঙ্গে এদিন ভালবাসার গোলাপও যুক্ত করে দিয়েছেন প্রেমিক প্রেমিকারা।

রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে এদিন বসন্তবরণ উৎসবের আয়োজন করা হয়। গত ২৫ বছরের ধারাবাহিকতায় একসঙ্গে চার ভেন্যুতে উৎসব আয়োজন করে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ। বসন্তের প্রকৃতি বর্ণনা ও বন্দনা ছাড়াও এসব মঞ্চ থেকে বাঙালীর জীবনে বসন্তের প্রভাব নানা ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তোলা হয়।

এবারও বসন্ত উৎসবের শুরুটা চারুকলার বকুলতলায়। বৃক্ষশোভিত চত্বরে আয়োজন করা হয় বসন্ত উৎসবের। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নাচগান কবিতাসহ নানা আয়োজনে মুখর ছিল গোটা এলাকা। প্রাণের টানে মানুষ ছুটে এসেছিলেন! এত বড় খোলা প্রাঙ্গণ। তবুও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। এখানে প্রভাতী আয়োজন চলে সকাল সাতটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্বের উৎসব বিকেল সাড়ে তিনটায় শুরু হয়ে চলে রাত প্রায় নয়টা পর্যন্ত। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আবির বিনিময় ও প্রীতিবন্ধনী। উৎসবে আগতরা একে অপরে আবির মেখে নিজেদের আপন করে নেয়।

এর আগে সকালে বসন্তকথন পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। সংগঠনের সহসভাপতি কাজল দেবনাথের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষৎ-এর সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।

একই মঞ্চে সুস্মিতা দেবনাথ ও সহশিল্পীদের ধ্রুপদী সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। একে একে স্বনামধন্য শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এ তালিকায় ছিলেন জনপ্রিয় নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌস আরা, খাইরুল আনাম শাকিল, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা, লুভা নাহিদ চৌধুরী ও অনিমা রায়। বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, খায়রুজ্জামান কাইয়ুম, নাসিমা শাহীন ফেন্সি, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, বুলবুল ইসলাম, দেবলীনা সুর, তানজিনা তমা, সঞ্চারী দত্ত, জান্নাতুল ফেরদৌস লাকি, জিনাত আরা ছবির গানে ছিল বসন্ত বন্দনা। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে সুরতীর্থ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, বহ্নিশিখা, সুরসপ্তক, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস্ (বাফা), সঙ্গীত ভবন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও উত্তরায়ণের শিল্পীরা।

উৎসবে বিশেষ আকর্ষণ ছিল নৃত্যায়োজন। নৃত্যনন্দন, দ্রুপদ কলাকেন্দ্র, ধৃতি নর্তনালয়, নৃত্যাক্ষ, স্পন্দন, নটরাজ, নৃত্যজনসহ ঢাকার নামকরা দলগুলো নাচের মুদ্রায় বসন্তকে ফুটিয়ে তোলে। তবে আলাদা করে নজর কাড়ে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী নাচ। নড়াইল থেকে আসা দলটির পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন শ্রোতা দর্শক।

বসন্ত আয়োজনে ছিল কবিতাও। প্রিয় কবির কবিতা থেকে বসন্তকে আবিষ্কার করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, বেলায়েত হোসেন, আহকামউল্লাহ, নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলিসহ বেশ কয়েকজন।

একই রকম আয়োজন ছিল ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে। এখানে সকাল সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চলে বসন্ত উৎসব। পুরোটা সময় উৎসবপ্রেমীদের ভিড় লেগেছিল। ধানমন্ডি কলাবাগান মোহাম্মদপুর ঝিগাতলা লালমাটিয়াসহ আশপাশের এলাকার মানুষের স্রোত নেমেছিল রবীন্দ্রসরোবরে।

শহরের শেষ প্রান্ত উত্তরা। সেখানেও কম রং ছড়ায়নি বসন্ত। ৩ নম্বর সেক্টরে রবীন্দ্র সরণীর উন্মুক্ত মঞ্চে বিকেল চারটার দিকে শুরু হয় বসন্ত উৎসব। চলে প্রায় নয়টা পর্যন্ত।

বসন্তকে বরণ করে নিতে ভুল করেনি পুরান ঢাকাও। ওয়াইজঘাটে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির (বাফা) মাঠে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়। স্থানীয়রা বিপুল আগ্রহ নিয়ে উৎসবে যোগ দেন। সন্ধ্যায় বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে বাঙালী সংস্কৃতি চর্চার শ্রেষ্ঠতম প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। নিজস্ব মিলনায়তনে আয়োজিত উৎসব ছিল ধ্রুপদী চেহারা পেয়েছিল।

ভালবাসা দিবসের আলাদা অনুষ্ঠানও ছিল। এদিন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ ভালবাসার গান পরিবেশন করা হয়। রবিরাগের এ আয়োজনটি ছিল অন্যান্য আয়োজন থেকে একটু আলাদা। মনে দাগ কেটেছে। এর বাইরে সারাদেশ থেকেই এসেছে বসন্ত ও ভালবাসা দিবস উদ্যাপনের খবর।