২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পল্লী বিদ্যুতের আট হাজার ৮৬৮ কিমি বিতরণ লাইন যাবে ভূগর্ভে ॥ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের উদ্যোগ

  • প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে এক কিমি লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে পাঁচ কোটি টাকা

রশিদ মামুন ॥ দেশের ১১ পল্লী বিদ্যুত সমিতির আট হাজার ৮৬৮ কিলোমিটার বিতরণ লাইন ভূগর্ভে নিয়ে যেতে চায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে এক কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণে প্রয়োজন হবে পাঁচ কোটি টাকা। সেই হিসেবে এই লাইন মাটির নিচে নিতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আরইবি সূত্র জানায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী জেলার পল্লীবিদ্যুত সমিতির লাইন যাবে ভূগর্ভে। এখন দেশে বিদ্যুত চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। এরপরও দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের ঘোষণা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার প্রথমেই বিতরণ লাইন মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার কাজ করতে হবে। ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের সাবস্টেশনও মাটির নিচে নিয়ে যেতে চায় সরকার।

সম্প্রতি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর মাজার শরীফের রাস্তাটি বিদ্যুতের তার মুক্ত করা হয়েছে। এই রাস্তার দুইপাশে কোন বিদ্যুতের খাম্বা ট্রান্সফরমার কিছুই নেই। রাস্তাটি সকলের নজর কেড়েছে। পিডিবি তার বিতরণ এলাকার উন্নয়নে এই কাজ করেছে। পিডিবি নিজস্ব বিতরণ এলাকার আরও কিছু অংশে বিদ্যুতের বিতরণ লাইন মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আবার ঢাকার দুই বিদ্যুত বিতরণকারী কোম্পানি ডিপিডিসি এবং ডেসকোও ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল আরইবি। এবার তারাও বিতরণ লাইন মাটির নিচে নেয়ার বড় প্রকল্প হাতে নিল।

বিদ্যুত বিভাগ বলছে, এখন দেশে মোট বিদ্যুতের উৎপাদন ২৩ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে চাহিদা গ্রীষ্মেই ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয়। শীতে তো দূরের কথা এখন গ্রীষ্মেই অনেক বিদ্যুত কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। বিশেষ করে ডিজেল চালিত বিদ্যুত কেন্দ্রগুলো বছরের বেশিরভাগ দিন বন্ধই থাকে।

বিদ্যুত বিভাগের তরফ থেকে বলা হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেয়া সম্ভব হলে বিদ্যুতের চাহিদা আরও কিছুটা বাড়তে পারে। এজন্য ইতোমধ্যে বিদ্যুত বিভাগ বিতরণ সংস্থাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

আরইবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ওভারহেড মাটির উপরিভাগে এক কিলোমিটার লাইন নির্মাণে ব্যয় হয় এক কোটি টাকার মতো। সেখানে এক কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণের ব্যয় পাঁচ গুণ। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণের কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ঝড় ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভূগর্ভস্থ লাইনের বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ করার প্রয়োজন পড়ে না। তেমনি মাটির নিচে দিয়ে বিদ্যুত লাইন যাওয়াতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহ লাইন বিনষ্ট হয় না। আর একবার বসালে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ থাকে না। ফলে শুরুতে বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হলেও ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণ দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক।

আরইবি সূত্র বলছে, আরইবির অধিকাংশ লাইন উপরিভাগ দিয়ে গেছে। গ্রামীণ এলাকায় গাছপালার মধ্য দিয়ে এ ধরনের লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায়ই এ ধরনের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা সংস্কার করে বিদ্যুত সরবরাহ করাতে গ্রাহক বিড়ম্বনায় পড়ে যায়।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুত সমিতি ৪ এর আওতাধীন কেরানীগঞ্জ এলাকার ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইনের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তারমধ্যে ৫৩৭ কিলোমিটার ওভারহেড বিতরণ লাইনকে ভূ-গর্ভস্থ ক্যাবল দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। এজন্য দুই হাজার ৭৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে আরইবি। প্রস্তাবটি বিদ্যুত বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এছাড়া মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুত সমিতির ৫৯৬ কিলোমিটার, মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুত সমিতির ৩৩৪ কিলোমিটার, নরসিংদী পল্লী বিদ্যুত সমিতি ১ এর ৭২ কিলোমিটার, নরসিংদী পল্লী বিদ্যুত সমিতি ২ এর ৩০০ কিলোমিটার, নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুত সমিতি ১ এর ১৪০ কিলোমিটার, নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুত সমিতি ২ এর ৪৪৫ কিলোমিটার এবং গাজীপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতি ২ এর ৭৩৮ কিলোমিটার ওভারহেড বিতরণ লাইন মাটির নিচে নিয়ে যাওয়া হবে। এজন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ করছে আরইবি। সম্ভাব্যতা জরিপ শেষের পর প্রকল্পগুলোর জন্য কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে তা জানা যাবে।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুত সমিতি ১ এর এক হাজার ২৯৩ কিলোমিটার, ঢাকা পল্লী বিদ্যুত সমিতি ৩ এর এক হাজার ৩৩০ কিলোমিটার এবং গাজীপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতি ১ এর ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার ওভারহেড বিতরণ লাইনকে ভূগর্ভে নিয়ে যাওয়া হবে। এজন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজ শুরু করেছে আরইবি।

দেশে ৬১ জেলায় আরইবি ৮১ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুত বিতরণ করে। দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে আরইবি এলাকায় বসবাস করে ১০ কোটি ৬৮ লাখ ৯৩ হাজার মানুষ। প্রতিদিন এসব মানুষের ঘরে সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত সরবরাহ করে দেশের সব থেকে বড় এই বিতরণ কোম্পানি।